এদেশে সংখ্যালঘু সংখ্যাগুরু বলতে কিছু নেই : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৪:৪৬ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের মাতৃভূমিকে এগিয়ে নিতে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করব। আমরা আমাদের জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা ও ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ব।’ এ সময় হিন্দুদের সংখ্যালঘু না মনে করারও আহ্বান জানান সরকারপ্রধান।

জন্মাষ্টমী উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার গণভবনে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি দেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের যেকোনো পদক্ষেপ এবং জাতির অগ্রগতির বিরুদ্ধে অপপ্রচার সম্পর্কে সবাইকে সর্বদা সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

হিন্দুদের সংখ্যালঘু না মনে করার আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আপনারা কেন নিজেদের সংখ্যালঘু বলেন? এদেশে সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু বলতে কিছু নেই। বরং বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার ভোগ করে। নিজেদের সংখ্যালঘু বা দুর্বল মনে করবেন না। তাছাড়া আপনারা কেনই এমনটা মনে করেন, যেখানে আপনারা এদেশেরই মানুষ?’

তিনি বলেন, যারা এই মাটিতে জন্মেছে, তারা এই মাটিরই সন্তান এবং এ দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের সব ধরনের অধিকার রয়েছে।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘তাই, আপনারা (হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ) সব অধিকার নিয়েই এ দেশে বাস করবেন।’

এ সময় তিনি দেশে ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের যেকোনো পদক্ষেপ এবং জাতির অগ্রগতির বিরুদ্ধে অপপ্রচার সম্পর্কে সবাইকে সর্বদা সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। স্মার্ট সরকার, স্মার্ট দক্ষ জনশক্তি, স্মার্ট অর্থনীতি ও স্মার্ট সোসাইটি নিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে আরও এগিয়ে যাবে। কারণ তার সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইতিমধ্যে দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তর করেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার ক্ষমতায় আসার পর সংবিধান সংশোধন করে সব জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনগণের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও অধিকার পুনরুদ্ধার করেছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সামরিক স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান সংবিধান সংশোধন করে সব ধর্মের অধিকার রক্ষা ও ধর্মীয় উৎসব পালনের স্বাধীনতা সংক্রান্ত সব অনুচ্ছেদ বাতিল করেছিলেন। তিনি বলেন, জিয়া সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদ বাতিল করে দেন, যা আমাদের ধর্মীয় নিরপেক্ষতাকে নিশ্চিত করেছিল।

শেখ হাসিনা বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে প্রতিটি ধর্মের মানুষ তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব স্বাধীনভাবে পালন করবে।

প্রধানমন্ত্রী হিন্দু সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, দেশটি সবার। কারণ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ৯ মাস যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছিল।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, এলজিআরডি ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য এবং ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মো. ফরিদুল হক খানও বক্তব্য রাখেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার সর্বদা বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার এবং এমন একটি সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে, যেখানে একজন আরেকজনের অধিকার ক্ষুণœ করবে না এবং সব মানুষ সমান অধিকার উপভোগ করে জীবনযাপন করবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জানি সব জায়গায় কিছু স্বার্থান্বেষী লোক আছে, যারা কিছু সমস্যা তৈরি করতে চায়। কেউ যেন কোনো সমস্যা তৈরি করতে না পারে, সবাইকে সেদিকে নজর দিতে হবে।’

দেশ-বিদেশে অপপ্রচার চালাচ্ছে এমন কিছু মানুষের বিরুদ্ধেও শেখ হাসিনা সবাইকে সতর্ক করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধ্বংস হয়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বারবার অমানবিক নির্যাতন ও দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে। আমরা আবারও সংবিধান সংশোধন করে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের জন্য সমান অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছি।’

শেখ হাসিনা তার দলকে ভোট দিয়ে বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনা পুনরুদ্ধার করার সুযোগ দেওয়ার জন্য দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানান।

তিনি বলেন, ‘যেহেতু তারা আমাদের ভোট দিয়ে দেশের সেবা করার সুযোগ দিয়েছেন, তাই আমরা সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে আবারও অসাম্প্রদায়িক চেতনা পুনরুদ্ধার করতে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে সক্ষম হয়েছি। আমরা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি চাই আপনারা সবাই নিজ নিজ ধর্ম যথাযথভাবে পালন করুন। একসময় (সরকারি) চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল, কিন্তু এখন এই বৈষম্য এখানে আর নেই। সরকারি চাকরিতে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও সরকার যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করে।’

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভিন্ন খাতে কাজ করার সুযোগ রয়েছে : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পারস্পরিক স্বার্থে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বিভিন্ন খাত বিশেষত কৃষিতে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। পাকিস্তানের বিদায়ী হাইকমিশনার ইমরান আহমেদ সিদ্দিকী গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন। তিনি বলেন, ‘এখন নতুন প্রজন্মের যুগ, তাই দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ হতে পারে।’

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে এবং এ লক্ষ্যে কৃষি খাতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘উৎপাদন বাড়াতে কৃষি গবেষণায় প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে কৃষি গবেষণা অত্যন্ত ইতিবাচক ফলাফল দেয়।’ তিনি আরও বলেন, কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে দুই দেশের কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা হতে পারে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে সফল মেয়াদের জন্য পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে ধন্যবাদ জানান।

বৈঠকে পাকিস্তানের হাইকমিশনার আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অসাধারণ সাফল্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেন, ‘বাংলাদেশে উন্নয়ন দৃশ্যমান।’ তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ খুবই উদ্যোগী এবং পাকিস্তানের মানুষেরও এ ব্যাপারে যথেষ্ট সুনাম আছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আরও জানান, আলোচনায় ক্রিকেট ইস্যুও স্থান পেয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এ সময় উপস্থিত ছিলেন। বাসস

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত