সম্পত্তি ও অফিস সংক্রান্ত মামলায় আদালতের বাইরে গিয়ে উভয়পক্ষ বসে স্বল্পতম সময়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করে মীমাংসার জন্য যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, সেটি হচ্ছে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা অলটারনেটিভ ডিসপুট রেজল্যুশন (এডিআর)। এটি একটি আইনগত প্রক্রিয়া। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি আইন ঠিকভাবে প্রয়োগ হলে, আদালতে বিচারাধীন পাহাড়সম মামলাজট কমে আসবে বলে আইনজ্ঞদের ধারণা। এডিআরের মাধ্যমে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে সময় লাগে ৯০ দিন। উকিলের খরচ লাগে না বললেই চলে। এতে উভয়পক্ষই লাভবান হয়। যদি কোনো মামলা এডিআরের মাধ্যমে নিষ্পত্তি না হয়, তাহলে মামলাটি আদালতে চলে যায়। অন্যদিকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় একটি মামলা শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগে। ফলে প্রচুর অর্থেরও অপচয় হয়। যে কারণে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশ্বব্যাপী এডিআর পদ্ধতির গুরুত্ব বাড়ছে। বিশে^র সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারও এডিআর পদ্ধতির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। কিন্তু, এর সাফল্য কি সত্যিই দুরস্ত!
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মূল লক্ষ্য, মামলায় জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করা। আমাদের দেশে রয়েছে, তিন ধরনের বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। সেগুলো হচ্ছে আলাপ-আলোচনা বা নেগোসিয়েশন, মধ্যস্থতা বা মিডিয়েশন এবং সালিশ বা আরবিট্রেশন। কিন্তু বাস্তবে বিরোধ নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এর কারণ কী? এ বিষয়ে শনিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘বিকল্প হতে পারছে না বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে কোনোরকম ভোগান্তি ও হয়রানি ছাড়া নিখরচার এই সমাধানেও অনেকের উৎসাহ নেই। ফলে মামলা বাড়ছে, পক্ষদের বিরোধে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ভুক্তভোগীর ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে চরমভাবে।
গত দুই দশকে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যার সঙ্গে আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি হওয়া বিরোধপূর্ণ ঘটনার সংখ্যা মেলালে সেই চিত্রই দেখা যায়। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত উচ্চ আদালতে বিচারাধীন দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা ৪২ লাখের বেশি।
অন্যদিকে, জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার হিসাবে ২০০৯ সাল থেকে প্রায় ১৫ বছরে সাড়ে ৮৬ হাজার বিরোধ (মামলাপূর্ব ও পরবর্তী) নিষ্পত্তি করেছে ৬৪ জেলার লিগ্যাল এইড অফিস। লাখ লাখ মামলা ও বিরোধের বিপরীতে এ পরিসংখ্যানকে হতাশাজনক বলছেন আইনবিদরা। আসলে এডিআর নিয়ে ধারণা ও প্রচারের ঘাটতি, বিরোধীয় পক্ষদের আস্থাহীনতা, মামলার প্রবণতা ও ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা, কিছু ক্ষেত্রে আইনজীবীদের আন্তরিকতার ঘাটতি, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আদালতকে নির্ভরযোগ্য মনে করা, পক্ষদের এডিআর মানার বাধ্যবাধকতা না থাকায় অনেক সম্ভাবনার পরেও বিকল্প হয়ে উঠতে পারছে না বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা।
এ ব্যাপারে অ্যাটর্নি জেনারেল একটি বাস্তবসম্মত কথা বলেছেন। তিনি জানাচ্ছেন এ বিষয়ে মানুষের ধারণা কম। অন্যদিকে, মানুষকে বোঝাতে না পারা। আমরা হয়তো মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হচ্ছি না যে, এটার লাভ-ক্ষতি কী? মামলা করলে কী হবে আর এডিআর করলে কী হবে এগুলো বোঝানো গেলে, মানুষের আগ্রহ আরও বাড়বে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বোঝানোর দায়িত্ব আসলে কার? এই প্রশ্নের উত্তরও অ্যাটর্নি জেনারেল দিয়েছেন। বলেছেন আদালত আইনজীবীদের ডেকে নিয়ে দুপক্ষকে সমঝোতায় আসতে তাগিদ দিলে, আপসের মানসিকতা নিয়ে বসলেই সমাধান হবে। যদি তাই-ই হয়, তাহলে আদালতকেই এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আইনের বিধান অনুযায়ী, এ পদ্ধতি বাস্তবায়নে আদালত নিজে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিতে পারে। আইনজীবী বা আইনজীবীর নিযুক্ত অন্য আইনজীবী, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, জেলা জজের তৈরি প্যানেলও মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিতে পারে।
যে উপায়েই হোক, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির পথেই হাঁটতে হবে। এক্ষেত্রে কোন পক্ষ দায়িত্ব নিয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন সেই বিষয়ও নির্ভর করে আদালতের ওপর। মুখ্যত, অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা কমিয়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় সুফল আনতে হবে যাতে দুর্বিষহ মামলাজটের হাত থেকে সাধারণ মানুষ দ্রুত মুক্তি পায়।
