সৌদি যুবরাজের সহযোগিতা বাড়ানোর আশ্বাস

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৩:০১ এএম

সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান গতকাল রবিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রিয়াদ ও ঢাকার মধ্যে সম্ভাব্য সব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সকালে নয়াদিল্লিতে জি-২০ নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ এক বৈঠকে সৌদি যুবরাজ এই আশ্বাস দেন।

বৈঠকে যুবরাজ সালমান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য আর্থসামাজিক উন্নয়ন অর্জনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অনুপ্রেরণামূলক নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। যুবরাজ সালমান পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে এসিডব্লিউএ পাওয়ারসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে সৌদি বিনিয়োগকারীদের চলমান বিনিয়োগ- সংক্রান্ত বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেন, প্রায় ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন বাংলাদেশি তাদের কঠোর পরিশ্রম দিয়ে তার দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। যুবরাজ সালমান ‘রিয়াদ এক্সপো-২০৩০’ আয়োজনের জন্য সৌদি আরবের উদ্যোগকে সমর্থন করার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৌদি আরবে বেশ কিছু সামাজিক সংস্কার শুরু ও অর্জন এবং সাম্প্রতিক সময়ের উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্যের জন্য সৌদি যুবরাজকে অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। জবাবে যুবরাজ সালমান তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং শিগগিরই বাংলাদেশ সফর করতে তার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

বাইডেনের বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার ইচ্ছা রয়েছে : মোমেন

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অত্যন্ত উষ্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ চ্যাট (আলাপচারিতা) ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে গভীর সুসম্পর্ককে চিহ্নিত করেছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত শনিবার রাতে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দৈনন্দিন ব্যস্ততার বিষয়ে মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বলেছেন, তার (বাইডেন) বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার সব ইচ্ছা রয়েছে।

মোমেন বলেন, বাইডেন এর আগে মন্তব্য করেছিলেন যে ‘৫০ বছর ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার একটি খুব সুন্দর সম্পর্ক রয়েছে এবং আগামী ৫০ বছরে এটি আরও শক্তিশালী ও দৃঢ় হবে। তিনি আরও বলেন, ‘আজ আমরা এর নমুনা দেখেছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে মোমেন বলেন, ‘এটি (অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে নৈশভোজসহ দুটি পৃথক অনুষ্ঠানে বাইডেন, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এবং সায়মা ওয়াজেদের মধ্যে আলোচনা) প্রমাণ করে যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আমাদের গভীর ও দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। আমরা ভবিষ্যতে এটি আরও শক্তিশালী করব।’

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুসংহত করতে খুবই আগ্রহী এবং এজন্য তারা তাদের লোক পাঠাচ্ছে এবং আলোচনা করছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তারা (আমেরিকান সরকার) আমাদের ওপর কোনো চাপ দিচ্ছে না বরং মিডিয়া অতিরঞ্জিত করছে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জি-টোয়েন্টি সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের রাজধানীর প্রগতি ময়দানে ভারত মণ্ডপম আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী কেন্দ্রে জো বাইডেন, শেখ হাসিনা এবং প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ ১৫ মিনিট কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী যখন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন তিনি খুব খুশি এবং সম্পূর্ণ উৎসাহী ছিলেন এবং আলোচনাটি অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং উষ্ণ পরিবেশে হয়েছিল।’

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং তার মেয়ে যখন বাইডেনের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রীর অ্যাম্বাসাডর-অ্যাট-লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন সেই মুহূর্তের ছবি তোলার জন্য তার সেলফোনটি বের করেন। মোমেন বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার সেলফোনে একটি সেলফিও তুলেছিলেন।’

মোমেন বলেন, বাইডেনের সঙ্গে বৈঠককালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণকে একটি সুন্দর ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন দিতে তার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অবহিত করেন। বাইডেন বলেন, বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে তার গৃহীত প্রচেষ্টা সম্পর্কে তিনি জানেন। এ সময় তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।

মোমেন জানান, আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তার সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বাংলাদেশ সফরের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কন্যা অটিজম বিশেষজ্ঞ সায়মা ওয়াজেদ এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ্যে আলোচনার কথাও তুলে ধরেন। সায়মা ওয়াজেদ বাইডেনকে বলেছেন, তিনি অটিজম নিয়ে কাজ করছেন এবং ফ্লোরিডায় কাজ করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট সায়মা ওয়াজেদের কাজের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং তার কাজ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। মোমেন বলেন, ‘সায়মা বাইডেনকে তার বিজনেস কার্ড দিয়েছেন।’ বাইডেন সায়মা ওয়াজেদকে যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণ জানান।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানার সঙ্গেও সৌহার্দ্যপূর্ণ কথা বলেছেন।

মোমেন আরও জানান, শেখ হাসিনা জি-২০ সম্মেলনে বাইডেনের বক্তৃতার প্রশংসা করেন।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে মোমেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাপান ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী, জার্মান চ্যান্সেলর ও মিসরের প্রেসিডেন্টসহ বিশ্বের অন্য নেতাদের সঙ্গেও সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন।

মোমেন আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের শেখ হাসিনাকে নিয়ে গর্ব করা উচিত।’

শেখ হাসিনা ও তার মেয়ের সঙ্গে বাইডেনের এক্সক্লুসিভ ছবি নিয়ে কিছু লোকের বিরূপ মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে মোমেন বলেন, এটা খুবই দুঃখজনক।

তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কেউ প্রশ্ন তুললে তা খুবই দুঃখজনক হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এর আগেও এক শ্রেণির লোক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সম্মান জানানোর বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। বাসস

শেখ হাসিনা ও মোদির সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক আলাপ হয়েছে কি না এমন এক প্রশ্নের জবাবে মোমেন বলেন, ‘আমরা যখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম, তখন কোনো রাজনৈতিক আলোচনা হয়নি। তবে দুই প্রধানমন্ত্রী পরস্পরকে জানান, ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশে আগামী বছর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী : ভারতে জি-২০ সম্মেলনে যোগদান শেষে গতকাল রবিবার বিকেলে নয়াদিল্লি থেকে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট বিকেল ৩টা ৩৮ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

এর আগে নয়াদিল্লির স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ০৮ মিনিটে ফ্লাইটটি নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দর ত্যাগ করে।

গত ৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে নয়াদিল্লি যান। সেদিন বিকেলে শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে যোগ দেন। দুই প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে তিনটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।

তিনটি সমঝোতা স্মারক হলো: ‘কৃষি গবেষণায় সহযোগিতা’, ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ এবং ‘দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে আর্থিক লেনদেন সহজীকরণ’।

জি-২০ সম্মেলনে ৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন অধিবেশনে যোগ দেন এবং শীর্ষ সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ‘এক পৃথিবী, একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ’ বিষয়ে আলাদা দুটি ভাষণ দেন। ‘এক পৃথিবী’ এবং ‘এক পরিবার’ অধিবেশন চলাকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তন, কভিড মহামারীর পরে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, ইউরোপে যুদ্ধের ফলে জ্বালানি, খাদ্য ও সারের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর বৈশ্বিক সরবরাহের মারাত্মক ব্যাঘাতের মতো চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা যায় তা তুলে ধরেন।

এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সরকারের মেয়াদে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্যের অভিজ্ঞতা অংশগ্রহণকারী বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন।

গতকাল জি-২০ সম্মেলনের দ্বিতীয় ও শেষ দিনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অন্যান্য দেশের নেতাদের সঙ্গে রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর তিনি সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে যোগ দেন। সম্মেলনের শেষ দিনে ‘জি-২০ নয়াদিল্লি নেতাদের ঘোষণা’ গৃহীত হয়।

এ সফরকালে প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদ, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট আলবার্তো অ্যাঞ্জেল ফার্নান্দেজ, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।

ভারতের জি-২০ সভাপতিত্ব ২০২২ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয়েছিল এবং এ সভাপতিত্বের মেয়াদে ভারত বাংলাদেশসহ ৯টি দেশকে জি-২০ সম্মেলনে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। দেশগুলো হলোÑ বাংলাদেশ, মিসর, মরিশাস, নেদারল্যান্ডস, নাইজেরিয়া, ওমান, সিঙ্গাপুর, স্পেন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাসস

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত