দৈনিক ইত্তেফাকে কলাম লিখতেন- ‘মোসাফির’ নামে। অসাধারণ শব্দনৈপুণ্যে বিদ্ধ করতেন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা আইয়ুব খানকে। সেইসময় অসংখ্যবার তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন, কারাবরণ করেছেন। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে আজ ছাপা হলো সেই উপসম্পাদকীয়
পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী কাম পশ্চিম পাকিস্তানের কনভেনশন লীগের মনোনীত প্রেসিডেন্ট মাসুদ সাদিকের তুলনা মাসুদ সাদিক সাহেবই। গৃহের কোণে বসিয়া এ যাবৎ তিনি মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচনে ৮০ পার্সেন্ট আসন দখলের কথা প্রকাশ করিয়াছেন। এক্ষণে তিনি নবনির্বাচিত মৌলিক গণতন্ত্রীদের সভা আহ্বান করিয়া বক্তৃতাও ঝাড়িতেছেন। এই ‘সভায়’ শতকরা ৮০ জন মৌলিক গণতন্ত্রী যোগদান করেন কি-না, তার কোন উল্লেখ থাকে না কিংবা নবনির্বাচিত মৌলিক গণতন্ত্রীরা কে কি বক্তৃতা দেন, তারও উল্লেখ থাকে না। তবে মাসুদ সাদিকের বক্তৃতা হইতে বোঝা যায় যে, এই ‘সভায়’ আইয়ুব-শাসনামলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির এবং শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের প্রভাব প্রতিপত্তি-দৌরাত্ম্যের অভিযোগ ওঠে।
মি. মাসুদ সাদিক এ ধরনের একটি সভায় হুঙ্কার দিয়ে বলিয়াছেন যে, কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান যদি কখনো মুনাফা শিকারে প্রবৃত্ত হয়, তাহা হইলে সরকার সর্বশক্তিতে তাদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িবেন এবং দোষী সাব্যস্ত হইলে ঐ সব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করিবেন না। অতঃপর তিনি দাবী করিয়াছেন যে, আইয়ুব সরকার জনগণের কল্যাণেই নিবেদিত এবং ইহা শিল্পপতিদের সরকার নহে।
কনভেনশনপন্থীরা ধাপ্পাবাজি সম্বল করিয়াই নির্বাচনী বৈতরণী পার হইতে চায়। মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচনে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলে চরমভাবে বিপর্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁদেরকে কেহ শতকরা আশির নিচে নামাইতেও পারিতেছে না। এহেন ব্যক্তিদের পক্ষে প্রয়োজন-বোধে যে কোন উক্তি করা সম্ভব, সত্য-মিথ্যার কোন বালাই তাঁদের নাই। জনাব মাসুদ সাদিক শিল্পপতিদের উদ্দেশে যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করিয়াছেন, তাহা তাঁদের প্রয়োজনেই করিয়াছেন; কেননা উভয় অঞ্চলের মানুষ আজ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির চাপে যেভাবে নিষ্পেষিত হইতেছে, তাতে ঐ ধরনের উক্তি না করিয়া তাঁদের উপায় নাই। কিন্তু এই উক্তি যে সম্পূর্ণ অসার ও ধোঁকামূলক, কার্যক্ষেত্রেই তার প্রমাণ রহিয়াছে।
প্রথমত, বর্তমান শাসনামলে সকল জিনিসপত্রের উপর হইতে কন্ট্রোল তুলিয়া লওয়া হইয়াছে। ইহার ফলে দ্রব্যমূল্য শোঁ শোঁ করিয়া বৃদ্ধি পাইয়াছে; শিল্পপতি-ব্যবসায়ীরা দ্বিগুণ-তিনগুণ মুনাফা অর্জন করিতেছে; কিন্তু যেহেতু দ্রব্যমূল্য নির্ধারিত হয় নাই, সেই হেতু তারা যে হারে মুনাফা হাঁকুন না কেন, আইনের চক্ষে তাঁরা অপরাধী নন।
অতএব, শিল্পপতিরা মুনাফা অর্জনে প্রবৃত্ত হইলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে বলিয়া মি. মাসুদ সাদিক যে হুমকি প্রদান করিয়াছেন, তাহা কেবল অসারই নয়, ধাপ্পাবাজিও বটে। গত ৬ বছরে অতি মুনাফা অর্জনের ‘অপরাধে’ একজন শিল্পপতির বিরুদ্ধেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নাই। বস্তুতপক্ষে, প্রচলিত আইনে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের কোন বিধানও নাই। অবাধ অর্থনীতির নামে অবাধ লুণ্ঠনের ব্যবস্থাই প্রচলন করা হইয়াছে।
দ্বিতীয়ত, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প, মায় ব্যাংক ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানীগুলি যে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি পরিবারের কুক্ষিগত হইয়াছে, এই বাস্তব অবস্থা শাসন কর্তৃপক্ষ এমনকি ‘অর্থের যাদুকর’ অর্থমন্ত্রী মি. শোয়েবও অস্বীকার করিতে পারেন নাই। বিগত বাজেট অধিবেশনে তিনি এই একচেটিয়া পুঁজিবাদ তথা কার্টেলের বিরুদ্ধে সতর্কবাণীও উচ্চারণ করিয়াছিলেন। তৎপূর্বেও তিনি মাঝে মাঝে এ ধরনের সতর্কবাণী উচ্চারণ করিয়াছেন নিছক জনমতের চাপে। অবশ্য এই কার্টেল ব্যবস্থা রোধের কোন কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নাই।
তৃতীয়ত, শুধু বুনিয়াদী ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরাই বর্তমান শাসনামলে শিল্পে-বাণিজ্যে একচেটিয়া প্রভুত্ব কায়েম করে নাই; কর্তাব্যক্তিদের কোন কোন আত্মীয়-স্বজনও এই কয়েক বৎসরের মধ্যে বিরাট শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী বনিয়াছেন। সুতরাং এই একচেটিয়া ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের গায়ে হাত দেওয়া মি. মাসুদ সাদিক কিংবা অন্য কোন অনুগ্রহভোগীর পক্ষে সম্ভব নয়।
চতুর্থত, এই সকল বৃহৎ শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের নিকট হইতে দেড় কোটির অধিক টাকা সংগ্রহ করিয়া ‘জাতীয় প্রেসট্রাক্ট’ গঠন করা হইয়াছে; এ খবর দেশের প্রত্যেকটি মানুষ রাখে। পুঁজিপতিদের নিকট হইতে সংগৃহীত অর্থে পরিচালিত পত্রিকাগুলি জনাব আইয়ুবকে ক্ষমতায় বহাল রাখিবার জন্য কীভাবে দিনকে রাত ও রাতকে দিন করিয়া প্রচার করিতেছে, দেশবাসী তাহাও লক্ষ করিতেছে।
তাই বর্তমান ক্ষমতাসীন মহল এবং একচেটিয়া পুঁজিপতি-শিল্পপতিদের মধ্যকার এই আঁতাত সত্ত্বেও যাঁরা দাবী করিতে পারেন যে, ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের উপর ক্ষমতাসীনরা ‘ঝাঁপাইয়া পড়িবেন, ধাপ্পাবাজিই যে তাঁদের একমাত্র সম্বল তাহা না বলিলেও চলে।
তদুপরি শুধু প্রেস ট্রাস্টের অর্থ সংকুলানই নয়, ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচন পরিচালনার জন্যও শিল্পপতিদের নিকট হইতে কি বিপুল পরিমাণ টাকা সংগ্রহ করা হইয়াছে ও হইতেছে, তার খবরাখবর অনেকেরই আছে এবং প্রয়োজনবোধে তার মোটামুটি হিসাবও প্রকাশ করা যাইতে পারে। অবশ্য এদেশে অর্থ বিলাইয়া এখানে-ওখানে কিছুটা অনর্থ অর্থাৎ গুন্ডা-শুন্ডার উৎপাত সৃষ্টি করা যাইতে পারে; কিন্তু ভোটারদের প্রভাবিত করা চলে না।
গ্রামাঞ্চল হইতে বহু খবর আসিয়াছে যেখানে একশ্রেণির প্রার্থীরা ভোটারদের খানাপিনার জন্য বহু অর্থ ব্যয় করিয়াছে। ভোটাররা খানাপিনার অংশও গ্রহণ করিয়াছে, কিন্তু সময়কালে কুপোকাৎ। আমরা জানি, অসৎ পথে উপার্জিত অর্থের এভাবেই অপচয় ঘটে। সেই জন্য কে কোথায় টাকা উড়াইল, তাহা নিয়া কেহ মাথা ঘামায় না। কিন্তু যাঁরা পুঁজিপতি-শিল্পপতিদের অবাধ মুনাফা অর্জনের পোয়াবারো করিয়া দিয়াছেন, যাঁরা পুঁজিপতিদের অর্থে নিজেকে প্রচারের জন্য সংবাদপত্র পরিচালনা করিয়েছেন, যাঁরা পুঁজিপতিদের চাঁদায় নির্বাচনী অভিযান চালাইতেছেন, তাঁদের মুখে শিল্পপতিদের উপর ‘ঝাঁপাইয়া’ পড়িবার কিংবা তাদেরকে ‘শায়েস্তা’ করিবার লম্বা লম্বা বুলি শুনিলে মানুষকে ‘লা-হাওলা-অলা’ বলিতে হয় বৈ কি। মনে হয়, লজ্জাও ইহাদের নিকট হইতে লজ্জায় পলায়ন করিয়াছে।
লেখক: তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া
প্রতিষ্ঠাতা, দৈনিক ইত্তেফাক
১৯ নভেম্বর, ১৯৬৪
