ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে টাকা ফেরত না দেওয়ার রেওয়াজ এ দেশে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে এবং দিনে দিনে এর পরিমাণ বেড়েই চলেছে। বর্তমানে ব্যাংকঋণ ফেরত দিচ্ছেন না এমন গ্রাহকের সংখ্যা দুই লাখেরও বেশি। এসব গ্রাহকের কাছে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা আটকে আছে। মামলা করেও ঋণের অর্থ আদায় করতে পারছে না ব্যাংক। এমনকি মামলা নিষ্পত্তির পর আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ঋণের অর্থ আদায় হয়নি। মূলত ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় ব্যাংকগুলো ঋণের পুরো অর্থ আদায় করতে পারছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে করা মামলার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২৮ হাজার ৪২৮টি। এর বিপরীতে দেশের বিভিন্ন ঋণখেলাপি থেকে ব্যাংগুলোর পাওনা টাকার পরিমাণ ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৮৯ কোটি। এসব মামলার মধ্যে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮৮টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যেগুলোর বিপরীতে ব্যাংকগুলোর দাবি আদায়ের পরিমাণ ছিল ৯২ হাজার ২১১ কোটি টাকা। কিন্তু নিষ্পত্তিকৃত মামলাগুলো থেকে প্রকৃত আদায় হয়েছে ২৩ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। এর ফলে মামলা নিষ্পত্তির পরও ৬৮ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা ফেরত দেননি গ্রাহকরা।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীরা যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছেন, এর বিপরীতে প্রকৃত জামানত অনেক কম ছিল। অনেক ক্ষেত্রে জামানতই পাওয়া যায়নি। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই সম্পত্তি বিভিন্ন ব্যাংকে জামানত হিসেবে রাখা হয়েছে। এসব কারণেই মামলা নিষ্পত্তির পরও প্রকৃত আদায় কম হয়।
নিষ্পত্তিকৃত মামলায় সবচেয়ে বেশি টাকা আটকে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ৮৪ হাজার ১১৯টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৯ হাজার ৬৩৯টির, যেগুলোর বিপরীতে দাবি আদায়ের পরিমাণ ছিল ৫৮ হাজার ১৪ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকৃত আদায় হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো ৩৭ হাজার ৭২৭টি মামলার মধ্যে ৩২ হাজার ৭৯৪টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। এতে আদায়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা, কিন্তু প্রকৃত আদায় হয়েছে ২ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। উল্লিখিত সময়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ৯৬ হাজার ৩৮৭টি মামলায় ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা আটকে ছিল। এর মধ্যে ৫১ হাজার ৭৮২টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, যেগুলোর বিপরীতে দাবি আদায়ের পরিমাণ ছিল ৩১ হাজার ৩১ কোটি টাকা। কিন্তু প্রকৃত আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ দাবির প্রায় ৭০ শতাংশ অর্থই আদায় হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুন শেষে অর্থঋণ আদালতে ৭২ হাজার ৫৪০টি বিচারাধীন মামলার বিপরীতে আটকে আছে ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে ৪৪ হাজার ৬০৫টি বিচারাধীন মামলায় আটকে আছে ৯৫ হাজার ৯৩৭ কোটি। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে ১১ হাজার ১৬৬টি মামলায় ঝুলছে ৭৫ হাজার ৯৭৩ কোটি, বিদেশি ব্যাংকে ৮ হাজার ৫২২টি মামলায় আটকে আছে ৩ হাজার ৯১৯ কোটি এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে ৪ হাজার ৯৩৩টি মামলায় আটকে আছে ২ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা।
২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে অর্থঋণ আদালতে ৭২ হাজার ১৮৯টি বিচারাধীন মামলার বিপরীতে আটকে ছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে বিচারাধীন মামলা বেড়েছে ৩৭১টি। এর বিপরীতে নতুন করে ১১ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা আটকা পড়েছে। আর ২০২২ সালের জুন শেষে ৬৯ হাজার ৩৬৯টি বিচারাধীন মামলায় ঝুলে ছিল ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা।
২০২২ সাল শেষে মামলার স্থিতি ছিল ২ লাখ ২২ হাজার ৩৪৮টি। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলোর পাওনা টাকার পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪৯ হাজার ১৮৪ কোটি। সে সময় আদায়ের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে নতুন করে মামলা বেড়েছে ৬ হাজার ৮০টি, দাবিকৃত টাকার পরিমাণ বেড়েছে ২১ হাজার ৩০৫ কোটি এবং তার বিপরীতে আদায় বেড়েছে মাত্র ২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা।
ব্যাংকারদের মতে, গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই-বাছাই করে ঋণ দেয় বেসরকারি ব্যাংক। ফলে তাদের ঋণ আদায়ের হার বেশি। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে সেটা কম দেখা যায়। কারণ সরকারি ব্যাংকগুলোতে অনেক সময় ঋণ দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়। এসব ঋণ একসময় আদায় না হওয়ায় কুঋণে পরিণত হয়। তবে সম্প্রতি উল্টো চিত্র লক্ষ করা যাচ্ছে। কারণ এখন বেসরকারি ব্যাংকেরই মামলা দাবির পরিমাণ বেশি। ব্যাংকাররা আরও জানান, কুঋণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক পর্যায়ে আদায় হয় না। আদালতে গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ঋণ আদায় কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো তাই অর্থঋণ আদালতসহ অন্যান্য আদালতে মামলা করে থাকে। কিন্তু আদালত পর্যাপ্ত না থাকায় মামলার নিষ্পত্তিতে ধীরগতি তৈরি হয়। এভাবেই খেলাপি ঋণ-সংক্রান্ত মামলার পাহাড় জমতে থাকে।
এর কারণ হিসেবে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বারবার ঋণখেলাপিদের সুযোগ দেওয়ায় যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন তারাও এখন নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও কুঋণ বেড়ে যাচ্ছে। আর ঋণ আদায়ের জন্য শেষ পর্যন্ত আদালতে মামলা করতে হচ্ছে। এতে একদিকে ব্যাংকের মামলা পরিচালনায় ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সময়মতো মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় ব্যাংকের টাকা আটকে যাচ্ছে। ফলে কমে যাচ্ছে ব্যাংকের ঋণ বিতরণের সক্ষমতা।
অর্থঋণ আদালতের এক কর্মকর্তা জানান, কিছু কিছু ব্যাংক মামলা করার পর আর কোনো খোঁজখবর রাখে না। বাদী ও আসামি উপস্থিত না থাকায় বছরের পর বছর ঘুরতে থাকে মামলা। পরিবর্তন হতেই থাকে শুনানির তারিখ। ২০ বছর ধরে মামলার খবর না রাখার নজিরও পাওয়া গেছে এ বছর। এমন কাজ করেছে একাধিক বেসরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। এ ঘটনার পেছনে ব্যাংক ও গ্রাহকের যোগসাজশে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থঋণ আদালতে ব্যাংকগুলোর অর্থ কেন দিন দিন বাড়ছে এমন প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুজাহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, খেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করার পর তারা এই মামলায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরির চেষ্টা করে। এজন্য আসামি কোর্টে উপস্থিত হওয়া থেকে বিরত থাকে। কোনো কোনো সময় তারা কোর্টের স্থগিতাদেশ নিয়ে দেশের বাইরে চলে যায়। এতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকে মামলা।
