চট্টগ্রাম বন্দরের কাঁধেই সাড়ে ৯ হাজার কোটি!

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০২:২০ এএম

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের চ্যানেল নির্মাণের প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে বহন করতে হবে। আর এ শর্তেই তা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।

আজ বুধবার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়ার উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মাতারবাড়ী চ্যানেল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর হতে পারে। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। এ বৈঠকে নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোস্তফা কামাল ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সচিব হাবিবুর রহমানেরও উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি কয়লা বিদ্যুৎ (কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পনি বাংলাদেশ লিমিটেড-সিপিজিসিবিএল) প্রকল্পের পরিচালক আবুল কালাম আজাদ গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিশ্চিত করেছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চ্যানেল তো চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষই ব্যবহার করছে। জেটিতে জাহাজ ভেড়ানোর কাজ বন্দর কর্তৃপক্ষই করছে। তবে কাগজে-কলমে চ্যানেলটি আমাদের আওতায় রয়েছে। এখন তা আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে।’

কিন্তু এ চ্যানেল নির্মাণের সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার ঋণ কে পরিশোধ করবে? এ প্রশ্নের উত্তরে আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘চ্যানেল নির্মাণে খরচ দিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। এখন শুধু নির্ধারিত সময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। চ্যানেলে যেহেতু জাহাজ ভেড়ানোর রাজস্ব পাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং ব্যবহারও করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ, স্বভাবতই ঋণও পরিশোধ করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ।’

কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালকের এমন বক্তব্যের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ সরাসরি উত্তর দিতে নারাজ। একপর্যায়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার) কমোডর এম ফজলার রহমান বলেন, ‘চ্যানেল হস্তান্তরের বিষয়ে কথা চলছে। আমাদের পক্ষ থেকে প্রস্তুতিও রয়েছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মুখ্য সচিবের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও নৌ সচিবও উপস্থিত থাকবেন। দেখা যাক হস্তান্তর হয় কি না।’

কিন্তু চ্যানেল নির্মাণের টাকা কে বহন করবে তা নিয়ে গত এক বছরের বেশি সময় ধরে চিঠি চালাচালি ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত বৈঠক হয়েছিল। এখন চ্যানেল নির্মাণের এ টাকা কি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বহন করবে? এমন প্রশ্নের জবাবে কমোডর এম ফজলার রহমান বলেন, ‘কয়লা বিদ্যুৎও সরকারের প্রকল্প এবং মাতারবাড়ী বন্দরও সরকারের। তাই সরকারের পক্ষ থেকে যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে, তাই হবে।’

১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ, ২৫০ মিটার চওড়া ও ১৮ মিটার গভীরতার চ্যানেলটি নির্মাণের কাজ ২০২০ সালে শেষ হয়। পরবর্তীকালে প্রস্থ আরও ১০০ মিটার বাড়ানো হয় চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য। একই সঙ্গে গভীরতাও বাড়ানো হয়। আর এতেই গভীর সমুদ্রবন্দরের উপযোগী জাহাজ ভেড়ানোর পর্যায়ে পৌঁছে মাতারবাড়ী। গত ২৫ এপ্রিল ৬৩ হাজার টন কয়লা নিয়ে ২২৯ মিটার দীর্ঘ ও ১২ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের (পানির নিচের গভীরতা) জাহাজ প্রথম ভিড়েছে এই বন্দরে। যদিও এর আগে কয়লা বিদ্যুতের উপকরণ নিয়ে ১১২টি জাহাজ ভিড়েছিল মাতারবাড়ীতে। গত এপ্রিলের পর এ পর্যন্ত আরও সাতটি জাহাজ কয়লা নিয়ে ভিড়েছে। এসব জাহাজ কয়লা বিদ্যুতের জেটিতে ভিড়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি নির্মাণের কাজ শুরু হবে এখন। আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের জেটি নির্মাণের কাজ উদ্বোধন করার পরিকল্পনা রয়েছে। আর এরই অংশ হিসেবে পুরো চ্যানেলটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

চ্যানেল নিয়ে বিপত্তি কী ছিল : সাগর থেকে ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ খনন করে চ্যানেলটি নির্মাণ করা হয়েছিল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায়। কয়লা বিদ্যুতের জন্য কাঁচামাল কয়লা আনতে বড় জাহাজ ভেড়াতে হবে। সেই জাহাজ ভেড়ানোর জন্য ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ, ২৫০ মিটার চওড়া ও ১৬ মিটার গভীর চ্যানেল নির্মাণ করা হয় প্রকল্পের আওতায়। পরে এ চ্যানেলকে ব্যবহার করে গভীর সমুদ্রবন্দরের স্বপ্ন দেখে দেশ। এ নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইও করে জাইকা। জাইকার সুপারিশের ভিত্তিতেই এখানে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে অগ্রগতি আসে। এ চ্যানেলের চওড়া আরও ১০০ মিটার এবং গভীরতা ২ মিটার বাড়ালেই গভীর সমুদ্রবন্দরের উপযোগী একটি চ্যানেল পেয়ে যাবে দেশ। আর জাইকার এ সুপারিশের ভিত্তিতেই ‘মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়। এরই আওতায় চ্যানেলের চওড়া ১০০ মিটার বাড়ানোর পাশাপাশি গভীরতাও ১৮ মিটারে উন্নীত করা হয়। এজন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি ১৬ লাখ ১৩ হাজার টাকার বাজেট একনেক থেকে অনুমোদন করে। এর মধ্যে জাইকার ঋণ ১২ হাজার ৮৯২ কোটি ৭৬ লাখ ৫ হাজার, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (নিজস্ব তহবিল) ২ হাজার ২১৩ কোটি ২৪ লাখ ৯৪ হাজার এবং সরকারের ২ হাজার ৬৭১ কোটি ১৫ লাখ ১৪ হাজার টাকা। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

কিন্তু চ্যানেল নির্মাণের খরচ কে বহন করবে তা নিয়ে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রশ্ন ছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য চ্যানেল নির্মাণে খরচ হয়েছিল ৯ হাজার ৩৫০ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) ঋণ হিসেবে রয়েছে ৭ হাজার ৯২২ কোটি ১৬ লাখ এবং সরকারের ১ হাজার ৪২৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এ টাকা কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায় খরচ করা হয়েছিল। এখন যেহেতু এ চ্যানেল ব্যবহার করে গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে উঠছে, তাই তা নির্মাণের সব খরচ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে পরিশোধ করতে হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। গত ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিবকে প্রধান করে একটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছিল। যে কমিটি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে কীভাবে তা হস্তান্তর করা হবে, তা ঠিক করবে।

কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে ১২০০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৫ সালে। গত ২৫ জুন থেকে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করে কেন্দ্রটি। এখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাচ্ছে কেন্দ্রটি। দিনে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা পুড়বে ১০ হাজার টন। কেন্দ্রটিতে প্রতিনিয়ত ৬০ দিনের ছয় লাখ টন কয়লা মজুদ থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত