বিএনপি ক্ষমতার বাইরে রয়েছে অনেক দিন। তাদের ‘ভ্যানগার্ড’ সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল অনেকটাই কোণঠাসা। ছাত্ররাজনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিএনপির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রদলের সংহত অবস্থান নেই। আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্র বলে পরিচিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের অবস্থা ভালো নয়। সরকারসংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনের নির্যাতন-নিপীড়ন এবং নিজেদের কোন্দলে তাদের শোচনীয় অবস্থা। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা ও সমর্থন হারাতে বসেছে সংগঠনটি।
গত বছর ১১ সেপ্টেম্বর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে খোরশেদ আলম সোহেলকে সভাপতি ও আরিফুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। নির্ধারিত মেয়াদের এক বছর পার করলেও ক্যাম্পাসে এ কমিটি এখন পর্যন্ত সংহত কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। বিভিন্ন ইস্যুতে ক্যাম্পাসের আশপাশে ঝটিকা মিছিলেই সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা গেছে তাদের।
৭১ সদস্যবিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি এবং বিভিন্ন হল কমিটিতে ছাত্রদলের দুই শতাধিক পদধারী নেতা থাকলেও বেশিরভাগ কর্মসূচিতে ৫০ জনকেও দেখা যায় না। তাদের রাজনীতি ক্যাম্পাস ছেড়ে নয়াপল্টনে কেন্দ্রীভূত হয়েছে; তবে সেখানেও নেতাকর্মীদের উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক নয়। নতুন হল কমিটিও ঘোষণা করতে পারেনি ঢাবি ছাত্রদলের বর্তমান নেতৃত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ ছাত্রদল। শীর্ষ নেতাদেরও চেনে না অনেকেই।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলে নারী নেতৃত্ব এখন শূন্যের কোঠায়। বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির ৭১ সদস্যের মধ্যে একজনও ছাত্রী নেই। জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে জড়িত পরিবারগুলো থেকে উঠে আসাদের ছাড়া নতুন কোনো ছাত্রী/নারী যুক্ত হচ্ছে না এ সংগঠনে। শিক্ষার্থীসংশ্লিষ্ট কর্মসূচি না থাকাকেই এর জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ছাত্রদল নেতারা অবশ্য ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের ভাষ্য ভয়ের সংস্কৃতির কারণে সেভাবে শিক্ষার্থীরা যুক্ত হচ্ছে না, তবে গোপনে অনেকেই যোগাযোগ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হলের শিক্ষার্থী রাকিব উদ্দিন বলেন, ‘ছাত্রদল নেতারা মাঝেমধ্যে মারধরের শিকার হয় এটা শুনি। ক্যাম্পাসে তাদের তেমন কার্যক্রম দেখি না। হাতেগোনা দুয়েকজন ছাড়া কাউকে চিনি না।’
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের এমন অবস্থার জন্য নেতৃত্ব বাছাইয়ে অদূরদর্শিতা এবং সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অদক্ষতাকে দায়ী করেন অনেক নেতাকর্মী। সংগঠনকে সংহত ও শক্তিশালী করতে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ কমিটি চান তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাবি ছাত্রদলের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রদলের শীর্ষ নেতারা পকেট কমিটি করতে গিয়ে ঢাবি ছাত্রদলকে প্রায় নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে। ক্যাম্পাসে প্রভাব রাখতে পারেনি এ কমিটি। ছাত্রদলকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারলে ক্যাম্পাসে আমাদের আন্দোলন-সংগ্রাম করার সুযোগ ছিল। তরুণ শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার মতো কাজ আমরা করতে পারছি না। আমরা চাই, যোগ্য নেতৃত্বের হাত ধরে এ ক্যাম্পাসে আবারও ছাত্রদলের ঐতিহ্য ফিরে আসুক।’
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারহান আরিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাফল্য, ব্যর্থতা মিলিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের বর্তমান কমিটি এক বছর পার করেছে। বিতর্ক, আলোচনা পাশ কাটিয়ে ঢাবি ছাত্রদলের নতুন করে ভাবার সময় হয়েছে। রাজনীতির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া, রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সক্রিয় হওয়া, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বাড়ানো এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী দর্শনের প্রতি অনুগত হয়ে ঢাবি ছাত্রদলকে ঢেলে সাজানো উচিত।’
কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের শীর্ষনেতারা বলছেন, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের একক আধিপত্য, প্রশাসনের সহযোগিতায় বারবার হামলায় ঢাবি ছাত্রদলের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আপাতত হামলা-মামলা এড়িয়ে চলার নির্দেশনাও রয়েছে। শিগগির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সরব হবে ছাত্রদল।
ঢাবি ছাত্রদলের সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল বলেন, ‘সংকটময় মুহূর্তে আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করে কাজ করছি। যেকোনো কর্মসূচিতে ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলা চালায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও আমাদের প্রতিকূলে। আমরা যাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ না করতে পারি তার জন্য যতভাবে বাধা দেওয়া যায়, ততভাবেই তারা বাধা দিচ্ছে। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও আমাদের নেতাকর্মীরা থেমে নেই। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব দেওয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৩ সদস্যের একটি আংশিক কমিটি অনুমোদন করা হয়। আমরা সেটিকে ৭১ সদস্যের করেছি। বিভিন্ন হলে ছাত্রদলের যে কমিটি রয়েছে, সেগুলো আগে যারা দায়িত্বে ছিল তাদের করা। আমরা দায়িত্ব নিয়ে শতাধিকেরও বেশি ছাত্রনেতাকে বিভিন্ন হল কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের কার্যক্রম শক্তিশালী করেছি। সাংগঠনিক কাজের গতি বাড়াতে আমরা এখন কেন্দ্রীয় সংসদের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।’
সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ক্যাম্পাসে দৃশ্যমান কার্যক্রম না থাকলেও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের এক দফা দাবিতে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং তাদের অংশগ্রহণও বাড়ছে। জাতীয় রাজনীতিতে আমরা একটু বেশি সময় দিচ্ছি। এক দফা দাবি বাস্তবায়নে ক্যাম্পাস ও রাজপথে কর্মসূচি সক্রিয়ভাবে পালন করছে ছাত্রদল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে অচিরেই ক্যাম্পাস থেকে আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দিয়ে বিজয় নিয়েই ঘরে ফিরব ইনশাআল্লাহ।’
ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রাশেদ ইকবাল খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাবি ক্যাম্পাসকে কলুষিত করেছে সরকার ও তাদের ছাত্র সংগঠন। আমরা চাই তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। ছাত্রদল সংগ্রাম জারি রেখেছে, তারা ছাত্রদের পাশে আছে। অচিরেই শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নৈরাজ্য রুখে দেওয়া হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব আমরা।’
