ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিজয় একাত্তর হলের সাততলা থেকে পড়ে এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। মারা যাওয়া কাজী ফিরোজ ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড কালচার বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি গোপালগঞ্জে।
এদিকে ফিরোজ কাজীর মৃত্যুর ঘটনায় একটি চিরকুট ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছে। এই শিক্ষার্থীর মৃত্যু দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা, তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার রাত পৌনে ২টায় ফিরোজের টেবিলে রাখা একটি চিরকুট ও তার বন্ধুর প্রেমঘটিত কারণ নিয়ে ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে রহস্য। চিরকুটের লেখাটি ফিরোজের হাতের লেখার মতোই বলে জানিয়েছেন তার বন্ধুরা। তবে ফিরোজের মৃত্যুর খবর শুনে হাসপাতালে আসা বড় ভাই জানিয়েছেন, প্যাডে থাকা চিরকুটটি ফিরোজের হাতের লেখা নয়। এরপর তারা ফিরোজের মরদেহের ময়নাতদন্ত করার সিদ্ধান্ত নেন।
মঙ্গলবার রাতে বিজয় একাত্তর হলের যমুনা ব্লকের সাততলা থেকে পড়ে যান ফিরোজ। তাৎক্ষণিক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ফিরোজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জিয়াউর রহমান হলের ২০৩ নম্বর কক্ষে থাকতেন। তার মৃত্যুর পর ওই কক্ষে গিয়ে টেবিলে রাখা একটি প্যাডে কিছু লেখা দেখতে পান বন্ধুরা। টেবিলটিতে মুরগির মাংস ও ভাত রাখা ছিল। বন্ধুরা তার জন্য খাবার রুমে এনে রেখেছিলেন। ফিরোজ তা না খেয়েই হঠাৎ রুম থেকে বেরিয়ে যান। কিছুক্ষণ পরই বিজয় ৭১ হলের ভবন থেকে তার পড়ে যাওয়ার খবর পান বন্ধুরা। তবে তিনি বিজয় ৭১ হলে কার কাছে গিয়েছিলেন তা জানা নেই বলে জানিয়েছেন তার বন্ধুরা।
ফিরোজের টেবিলে রাখা প্যাডে একটি পৃষ্ঠার ওপরে লেখা ছিল, ‘মানুষ বাঁচে তার সম্মানে। আজ মানুষের সামনে আমার যেহেতু সম্মান নাই। এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার আমার কোনো অধিকার নাই। আমার মৃত্যুর দায়ভার একান্ত আমার। স্যরি মা! বাড়ি থেকে তোমাকে দিয়ে আসা কথা রাখতে পারলাম না। আমার জীবন নিয়ে হতাশ। আমার ওয়ালেটের কার্ডে কিছু টাকা আছে। বন্ধুদের কাছে অনুরোধ রইল মায়ের হাতে দিতে। আমার লাশের পোস্টমর্টেম না করে যেন বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কোনোরূপ আইনি ঝামেলায় কাউকে যেন জড়ানো না হয়। সবাই বাঁচুক, শুধু শুধু পৃথিবীর অক্সিজেন আর নষ্ট করতে চাই না।’
ফিরোজের মৃত্যুর বর্ণনা দিয়ে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আতাউর রহমান অপু লেখেন, ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়ার অংশ হিসেবে গত শুক্রবার বেলা ১১টায় ফোন দেই। জানতে পারি ওদের সম্পর্ক ঠিক করার জন্য ফিরোজের মা, বড় ভাই, ছোট ভাই ক্যাম্পাসে আসছে। মেয়েটা সবার নম্বর ব্লক লিস্টে রেখেছে। আমি ওদের কাছে যেয়ে আমার ফোন থেকে ফোন দেই। কথা না বলেই আমাকে ব্লক করে দিল! মা ও পরিবার সুদূর গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকা এসেও ব্যর্থ হয়ে বাসায় চলে যায়। ফিরোজকেসহ আমি গাড়িতে তুলে দেই। রবিবার ফিরোজ আবার ক্যাম্পাসে আসে। আমরা সারা দিন একসাথে ছিলাম, রাত ২টা পর্যন্ত মুহসীন হলের ছাদে আড্ডা দিয়েছি। অনেক আলাপ করেছি। অনেক বুঝিয়েছি। ফিরোজের কষ্টের জায়গাটা হলো, বাসায় যেয়ে ফিরোজের মা মেয়েকে ফোন দিয়েছিল অন্য নম্বর দিয়ে। রিসিভ করার পর ফিরোজের মায়ের পরিচয় জানার সাথে সাথেই ফোন কেটে ব্লক দেয়। অথচ অনেক আগের ভিডিওতে দেখেছি ওর মার সাথে কত মুহাব্বতের সাথে কথা বলেছে।’
অপু আরও লিখেছেন, ‘সেই মেয়ে কীভাবে এত অপমান করতে পারল! ফিরোজ ওর মাকে কথা দিয়ে এসেছিল মেয়ের জন্য নিজের ক্ষতি করবে না। সেই কথা রাখতে পারেনি। কতভাবে, কতজনের মাধ্যমে মেয়ের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে। একটু দেখা করার জন্য সারা রাত বঙ্গমাতা হলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত। মেয়ের সাথেও আমাদের পরিচয় ছিল, ওদের প্রেম ভালোবাসা দেখে বেস্ট কাপল মনে হতো। আহা ওদের প্রেম, বিয়ে...। ফিরোজের মা আমাকে ওদের বাড়ি যেতে বলত, আজ যাচ্ছি। তবে ফিরোজের লাশ নিয়ে।’
ফিরোজ সব সময় তার প্রেমিকার পাশে থাকতে চেয়েছিল উল্লেখ করে অপু লিখেছেন, ‘মেয়ে তার ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে সম্পর্ক সাময়িক ছেদ করতে চেয়েছিল। ফিরোজ মেয়ের সুসময় এবং দুঃসময়ে পাশে থাকতে চেয়েছিল। এ জন্য ফিরোজের নাম্বার ব্লক দেওয়ার পরও অন্য জনের মাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিল। অন্য কারও মাধ্যমে যোগাযোগ করা মেয়ের আত্মসম্মানে লাগে এবং তার এক্স বিএফ এর স্বভাবের সাথে মিলে যায়। এতে ওদের দূরত্ব আরও বেড়ে যায়।’
ফিরোজের মৃত্যুর বিষয়ে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিল্লাল বলেন, ‘পোস্টমর্টেম করা হয়েছে। তবে রিপোর্ট পেতে অপেক্ষা করতে হবে। তাহলেই জানা যাবে এটা আত্মহত্যা নাকি দুর্ঘটনা। তার পরিবারের সাথে আমার কথা হয়েছে। তারা এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন আমাকে। পরবর্তীতে তার বড় ভাই শাহবাগ থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেছে।’
