নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষার সুযোগ নেই

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১১:২৫ পিএম

সম্ভবত ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনীতির মঞ্চ আকস্মিকই গরম হয়ে উঠেছে। এই উত্তাপ সৃষ্টি করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাদানকারীদের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ কার্যকর করার ঘোষণা দেয়। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানোর পর রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়। অনেকেই এই সিদ্ধান্তের প্রশংসা করছেন। আবার কেউ কেউ এর সমালোচনা করছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, আমাদের আজকের পদক্ষেপগুলো শান্তিপূর্ণভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাংলাদেশের লক্ষ্যকে সমর্থন করার জন্য এবং বিশ্বব্যাপী যারা গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে চায় তাদের সমর্থন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।

যে উদ্দেশ্যের কথা বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিসানীতি কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে, এটাকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার কোনো সুযোগ নেই। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্রকামী যেকোনো নাগরিকেরই আকাক্সক্ষার বিষয়। ভোটাধিকার মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার প্রয়োগ করেই নাগরিকরা কোন রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করবে, তা নির্ধারণ করে। যেকোনো বিবেচনাতেই সুষ্ঠু নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি প্রয়োগের ঘোষণা তাই গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকার ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার করে চলেছেন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি কার্যকরের ঘোষণা এদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে বেগবান করতে এবং বাংলাদেশের জনগণকে সাহায্য করার জন্য প্রণীত হয়েছে, যাতে তারা তাদের নেতা বেছে নেওয়ার জন্য ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে।

ভিসানীতি কার্যকরের ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ বলছে, ভিসানীতি নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও আমাদের চাওয়া একই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। বরং নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টায় যারা সহিংসতা করবে তারাও এ নিষেধাজ্ঞায় পড়বেন। অপরদিকে, মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলছে, সরকারের একগুঁয়েমির কারণেই ভিসানীতি এসেছে। এতে নির্বাচন ইস্যুতে সরকারের ওপর চাপ বাড়বে। এজন্য সরকারই দায়ী। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি বলছে, ভিসানীতি তারা ইতিবাচকভাবে দেখছে। গত ১৫ বছর ধরে বিরোধী দলসহ সাধারণ জনগণ কথা বলতে পারেনি। এই ভিসানীতি আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।

সুশাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র ইস্যুতে ক্রমাগত সমালোচনার শিকার ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেশ খানিকটা প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছে। এর আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে দেশটি র‌্যাবের জনাসাতেক কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। এই নিষেধাজ্ঞার পর দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অনেক কমে যায়। এমন অভিজ্ঞতার আলোকেই কি যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের জন্য এ নতুন ভিসানীতি চালু করল? এ প্রশ্নও জনমনে দেখা দিয়েছে। আবার নৈরাজ্যপ্রিয় বিএনপিকে নির্বাচনের মাঠে আনতে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আঁতাত করে ভিসানীতি কার্যকর করেছে, এমন গুজবও বাজারে আছে।

তবে পেছনের কারণ যাই থাক না কেন, যে ভাষায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের ঘোষণা দিয়েছে, এর তাৎপর্য ও পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। ভিসানীতি সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করে এক অব্যর্থ চাল চালা হয়েছে। এ নীতির আওতায় যেকোনো বাংলাদেশি যদি সে দেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে দায়ী হন বা এরকম চেষ্টা করেছেন বলে প্রতীয়মান হয় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাকে ভিসা দেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে। আওতায় পড়বেন বর্তমান ও সাবেক বাংলাদেশি কর্মকর্তা, সরকার-সমর্থক ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সদস্য। গণতান্ত্রিক নির্বাচনপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে, এমন কাজের সংজ্ঞার মধ্যে রয়েছে চারটি স্তর এক. ভোটারদের ভয় দেখানো; দুই. ভোট কারচুপি; তিন. সহিংসতার মাধ্যমে জনগণকে সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার প্রয়োগ করতে বাধা দেওয়া এবং চার. বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল, ভোটার, সুশীল সমাজ বা গণমাধ্যমকে তাদের মতামত প্রচার করা থেকে বিরত রাখা।

মার্কিন এই নীতি বা নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। কেননা, এটাকে কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত মনে করলে ভুল হবে। মনে রাখা দরকার যে- সাধারণত ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, ব্রিটেন, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াসহ পশ্চিমা দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকেই অনুসরণ করে থাকে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আগামী দিনে এই পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে অনুরূপ সিদ্ধান্ত এলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কাজেই বাংলাদেশের সামনে সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প পথ খোলা আছে বলে মনে হয় না।

সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন যেকোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের জন্যই আদর্শ হওয়া উচিত। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ভিসা বিধিনিষেধকে আলাদা কোনো ব্যাপার হিসেবে দেখা যায় না। বাংলাদেশে যেন গণতন্ত্রের উত্তরণ ঘটে সে জায়গা থেকে ভিসানীতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা উচিত। এর জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করা, অপরের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া বা দোষারোপ করার কিছু  নেই। বিএনপি যদি বলে আমরা নির্বাচন করতে দেব না, তাহলে ভিসা বিধিনিষেধে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

একইভাবে আওয়ামী লীগ যদি গায়ের জোরে ইচ্ছেমতো নির্বাচন করে সেক্ষেত্রে তাদের ওপর ভিসা বিধিনিষেধ আরোপ হবে। ভিসানীতি অনুযায়ী, নির্বাচনে শুধু বাধা দিলে মার্কিন ভিসা পাওয়া যাবে না যেমন ঠিক, তেমনি নির্বাচনকে প্রভাবিত করলেও একই নিষেধাজ্ঞায় পড়তে হবে। দলীয় সরকারের অধীন এ নির্বাচনকে যদি প্রভাবিত করা হয়, সে ক্ষেত্রে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিরুদ্ধেও যদি একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কাজেই ভিসানীতির খড়গ থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো, সবাই মিলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে হাঁটা।

আমাদের দেশে রাজনীতি ও প্রশাসনকে যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, সেই ‘এলিট শ্রেণি’র বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি এক বিষাক্ত তীর হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমাদের দেশের উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক সরকারে থাকা ও বিরোধীদলীয় নেতা, আমলা, বিচারক, সেনা কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন সদস্যের যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি রয়েছে। অনেকের ছেলেমেয়ে সেখানে চাকরি, ব্যবসা বা পড়ালেখা করছেন। অনেকের সন্তান উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গমনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশাপাশি অনেকেই আবার বেশ অর্থকড়ির মালিক হয়েছেন। তাদের বেশির ভাগ যুক্তরাষ্ট্রে গাড়িবাড়ি ক্রয়ে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। এদের অনেকেই আগামী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবেন। তারাও চাইবেন না যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে। সেদিক থেকেও ভিসানীতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে হয়।  তবে বিদেশিদের চাওয়ায় সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। সুষ্ঠু নির্বাচন হতে হলে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বোঝাপড়া দরকার। এক্ষেত্রে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে ভূমিকা রাখতে হবে। সমঝোতায় আসতে হবে। এখানে দুই পক্ষের দায়িত্ব রয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দলের দায়িত্ব রয়েছে। মনে রাখা দরকার যে, বিরোধী দলসহ নির্বাচন বানচালের প্রচেষ্টাকারী যে কারও ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।

সরকারি দলকে যেটা করতে হবে, নির্বাচনের জন্য একটা সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা, সেখানে তাদের উদার ভূমিকা পালন করতে হবে। ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। আর বিরোধী দলকে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সংবিধান ও গণতন্ত্র সমর্থন করে না এ রকম কোনো দাবিতে অনড় থাকলে চলবে না। তেমন দাবি থেকে বেরিয়ে এসে একটা আপসরফার পথে হাঁটতে হবে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের বোঝাপড়াটা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বিধিনিষেধে বাংলাদেশের নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার ক্ষেত্রে একটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ হিসেবে কাজ করবে নিঃসন্দেহে। তবে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রকৃত অঙ্গীকার আসতে হবে রাজনৈতিক দলগুলের কাছ থেকেই।

লেখক: লেখক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত