‘জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে আমার স্ত্রীকে নিয়ে গিয়েছিলাম সুস্থ করতে, কিন্তু ফিরে আসলো লাশ হয়ে। শুধু তাই নয়, মাত্র এক সপ্তাহে আমার পুরো পরিবার এলোমেলো হয়ে গেছে। আমার স্ত্রী তানজিনা বেগম মারা গেল, সাত মাসের শিশু তাহরিম এতিম হয়ে গেল, আমি জানি না তাকে কীভাবে বড় করব। বড় ছেলে বাঁধন এইচএসসির শেষ দিনের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি’, বলছিলেন রাজধানীর শ্যামলী এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজা।
তিনি ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার সাত মাসের শিশু তাহরিম মায়ের জন্য কান্নাকাটি করে, ও মায়ের দুধ খেত। তাহরিমকে এখন সামলানোর চেষ্টা করছে বড় মেয়ে সেলিনা আক্তার; যার নিজেরও ৩ বছরের একটা শিশু রয়েছে। ভাই কী আর বলব, সেদিন আনসার সদস্যদের হামলায় আমার দুই ছেলে তানভীর হাসান বাঁধন ও তানজিল হাসান নয়ন মরতে মরতে বেঁচে গেছে। তাদের আহত অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্রামের বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম। তাদের মায়ের জানাজা শেষে আবার হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। এখন ঢাকায় ফিরেছি। ছেলে দুটি এখনও অসুস্থ। তাদের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। আনসার সদস্যদের লোভের কারণে আমার পুরো পরিবার শেষ হয়ে গেছে, তাদের পক্ষ নিয়ে ডাক্তার-নার্সরা মিলে আমার স্ত্রীকে হত্যা করেছেন।
জানা যায়, সেলিম রেজা গণপূর্তের ঠিকাদার। তার তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। পরিবার নিয়ে থাকেন রাজধানীর শ্যামলীতে। তাদের গ্রামের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায়। গত শুক্রবার রাতে হৃদরোগ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হন তার স্ত্রী তানজিনা আক্তার (৩৫)। অবস্থার অবনতি হলে তাকে সিসিউতে নেওয়া হয়। তখন তার রক্তের প্রয়োজন হয়। গত রবিবার রাতে রক্ত নিয়ে তানজিনার কাছে যেতে চাইলে আনসার সদস্যরা টাকা দাবি করেন সেলিম রেজার কাছে। এর আগেও এই পরিবার ৩-৪ বার আনসার সদস্যদের টাকা দিয়েছিল। এ সময় সেলিম রেজার ছেলে নয়ন বলেন, ‘এর আগেও আপনাদের টাকা দিয়েছি, আর কতবার দেব’।
এ নিয়ে বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে এক আনসার সদস্য থাপ্পড় দিলে তার সঙ্গে মারামারি হয়। পরে ওই আনসার সদস্যের বাঁশির শব্দে বিশ-ত্রিশজন আনসার সদস্য জড়ো হয়ে নয়নের ওপর হামলা চালান। তাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে গেলে বাবা সেলিম বোন সেলিনা আক্তারসহ পুরো পরিবারের ওপর হামলা হয়।
সেলিম রেজা দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, ‘আমাদের ওপর যখন হামলা চালানো হয়, তখন সিসিউতে তানজিনার পাশে ছিলেন আমার শাশুড়ি। সেখানে যে ডাক্তার-নার্সরা ছিলেন তারা আমার শাশুড়ির সামনে তানজিনার অক্সিজেন খুলে ফেলেন। আমার মেয়ে ভেতরে গিয়ে দেখে তার মা ছটফট করছে। সে দৌড়ে গিয়ে ডাক্তারকে (সম্ভবত সেই ডাক্তারের নাম জুলফিকার আলী) জানায়। ডাক্তার দৌড়ে গিয়ে আমার স্ত্রীর বুকে অনেকবার চাপ দেন, এ ছাড়া বিভিন্ন চেষ্টা চালান কিন্তু তাতে লাভ হয়নি- আমার স্ত্রী সেখানেই মারা যায়’।
এ ঘটনায় নিহত তানজিনার মেয়ে সেলিনা আক্তার রবিবার রাতেই শেরেবাংলা নগর থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। এরপর তারা গ্রামের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দীনে চলে যাওয়ায় মামলার আর অগ্রগতি হয়নি। তানজিনার কুলখানি, মিলাদ শেষ করে আজ শুক্রবার তারা ঢাকায় ফেরেন। এ প্রতিবেদন লেখার সময় সেলিম রেজা শেরেবাংলা নগর থানায় অবস্থান করছিলেন। তিনি মামলার বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলছেন।
সেলিম রেজা বলেন, কারা হামলা করেছে আমি তাদের নাম চিনি না। কিন্তু হাসপাতালের সিসিটিভিতে ফুটেজ আছে। পুলিশ সেই ফুটেজ সংগ্রহ করলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। তবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ না আবার ফুটেজ ডিলিট করে ফেলে। ঘটনার পর হাসপাতাল থেকে আজ পর্যন্ত কেউ তার বা পরিবারের কারও সাথে যোগাযোগ করেনি।
তিনি বলেন, ‘আমার বড় ছেলের হাত ভাঙ্গা, একটু পরপর মায়ের জন্য কান্নাকাটি করে। ছোট ছেলেটা বেশী অসুস্থ। ও ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারতেছে না। ওরে আনসাররা বুট দিয়ে পাড়াইছে ভাই। তার গায়ে এখনও অনেক ব্যথা’।
মারধরের শিকার তানজিল হাসান নয়ন বলেন, ‘আমাকে রাইফেল দিয়ে পিটিয়েছে বুকে, পিঠে। আনসাররা বুট দিয়ে ওপরে উঠে পা দিয়ে পাড়াইছে। আমাকে বাঁচাতে আমার বোন এসে আমার ওপরে পড়লে তাকেও আনসার সদস্যরা মারধর করেন। এ সময় আনসার সদস্যদের সঙ্গে হামলায় যুক্ত হয় অ্যাম্বুলেন্স চালকেরাও’।
নিহতের বোন আসমা আক্তার অভিযোগ করেন, ‘আমার বোন (তানজিনা আক্তার) তার সন্তানের ওপর মারধরের খবর শুনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আমরা বোন চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার রক্তের দরকার ছিল। কিন্তু রক্ত জোগাড় করে নিয়ে এলেও টাকা না দেওয়ায় আনসার সদস্যরা ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। আমার বোন মারা গেছে শুনে আমি হাসপাতালে এলে আমাকেও ঢুকতে না দিয়ে উলটো মারধর করে, যা সিসিটিভি ফুটেজে দেখতে পাবেন। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই’।
এ বিষয়ে জানতে জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক মীর জামাল উদ্দীনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।
