বিশ্বকাপে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে উৎসাহ দিতে ‘উই ওয়ান্ট দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ’ সেøাগানে শোবিজ তারকাদের নিয়ে আয়োজন করা হয় সেলিব্রিটি ক্রিকেট লিগ (সিসিএল)। দুই বিভাগে এতে অংশ নেয় ৮টি দল। পাঁচ দিনের মহড়া শেষে গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় গ্রুপ পর্বের খেলা। ৩০ সেপ্টেম্বর ফাইনালের মধ্য দিয়ে এ আসরের সমাপ্তি হওয়ার কথা থাকলেও এক অপ্রীতিকর ঘটনায় স্থগিত হয়ে যায় পুরো আয়োজন।
গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় দিন (২৯ সেপ্টেম্বর) মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামে মোস্তফা কামাল রাজের গিগাবাইট স্কোরারস ও দীপংকর দীপনের দল রানার ফাস্টিসের খেলা চলাকালে মাঠে থাকা তারকাদের মধ্যে একসময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একে অন্যকে টিজ করার ঘটনা ঘটে থাকে। ম্যাচে মোস্তফা কামাল রাজের গিগাবাইট স্কোরারস ছয় ওভারে সংগ্রহ করেছিল ১১৯ রান। প্রতিপক্ষ দীপংকর দীপনের রানার ফাস্টিস দ্বিতীয় ইনিংসে নির্ধারিত ওভারে ১১২ রান করতে সক্ষম হয়। ৭ রানে ম্যাচটি জিতে গিগাবাইট স্কোরারস। ম্যাচ জেতার পরপরই হাতাহাতি ও মারামারির সূত্রপাত হয়।
একে অন্যকে খোঁচাখুঁচি করার এক পর্যায়ে সেদিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘটনাটি বড় আকারে রূপ নেয়, এক পর্যায়ে মারামারিতে রূপ নেয়। এ সময় শরিফুল রাজকে বেশ উত্তেজিত হতে দেখা যায় এবং রাগের বশে ফ্লোরে বোতল ছুড়ে মারেন। অপরদিকে দীপনের দলের খেলোয়াড় রাজ রিপাকে দেখা যায় রাজের দলের দিকে চেয়ার ছুড়ে মারতে। এ সময় পাল্টাপাল্টি মারামারি করতে গিয়ে আহত হয়ে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে (জাতীয় অর্থোপেডিক্স হসপিটাল) ভর্তি হন ৬ জন খেলোয়াড়। আহতরা হলেন শিশির সরদার, রাজ রিপা, জয় চৌধুরী, আতিকুর রহমান, শেখ শুভ ও আশিক জাহিদ।
দীপংকর দীপনের দলের খেলোয়াড় নায়ক জয় চৌধুরী জানান, নির্মাতা রাজ অভিনেতা মনোজ প্রামাণিককে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এছাড়াও আয়োজকদের নামে ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ আনেন। একই অভিযোগ আনেন দলের আরেক খেলোয়াড় অভিনেতা মনির হোসেন শিমুল। তিনি বলেন, তারা বাইরে থেকে সন্ত্রাসী এনে আমাদের ওপর আক্রমণ শুরু করেন। এটা তো ক্রিকেট। এখানে এসবের কোনো মানেই হয় না। এছাড়া আরও গুরুতর অভিযোগ তুলেন একই দলের আরেক খেলোয়াড় রাজ রিপা। নির্মাতা মোস্তফা কামাল রাজ ও চিত্রনায়ক শরীফুল রাজের বিরুদ্ধে গায়ে হাত তোলার অভিযোগ আনেন। গণমাধ্যমের সামনে এসে কাঁদতে কাঁদতে এমন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত শেষে বিচারের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এমন অপ্রীতিকর ঘটনায় আয়োজকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ঘটনার পরদিন সন্ধ্যায় মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে তারা এই অনভিপ্রেত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে সাময়িকভাবে এই আয়োজন স্থগিত ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে জানানো হয়, দীপংকর দীপন ও মোস্তফা কামাল রাজের দলের মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে আয়োজক কমিটি ছাড়াও এ সময় উপস্থিত ছিলেন দুই দলের অধিনায়ক দীপংকর দীপন ও মোস্তফা কামাল রাজ।
তারা জানান, সেলিব্রিটি ক্রিকেট লিগের এই আয়োজন সাময়িক স্থগিত রাখা হলো। অনুষ্ঠিত না হওয়া সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল ম্যাচ কবে অনুষ্ঠিত হবে, সে সিদ্ধান্ত পরে জানাবেন। তাদের ভাষ্যমতে, এই পুরো আয়োজন আবার নতুন করে শুরু হতে পারে কিংবা যেখানে এই আয়োজন শেষ হয়েছে সেখান থেকে আবার শুরু হতে পারে। তবে এরজন্য তারা কিছুদিন সময় চেয়ে নিয়েছেন। ঘটনা প্রসঙ্গে তারা বলেন, খেলার মধ্যে যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটি আসলে তারকাদের কেউ করেননি। এ সময় সাপোর্টার হিসেবে উপস্থিত থাকা বাইরের কিছু লোকজন এই গণ্ডগোল সৃষ্টি করেন। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান আয়োজক কমিটি।
এ সময় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় সে গিগাবাইট স্কোরারস দলের ক্যাপ্টেন মোস্তফা কামাল রাজ অনভিপ্রেত ঘটনার জন্য সবার কাছে ক্ষমা চান। তিনি বলেন, অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্য আমি লজ্জিত এবং দুঃখিত। এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, বিশেষ করে আমার টিম থেকে, তাদের পক্ষ থেকেও আমি লজ্জিত। অভিযোগ আমার দলের খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে নয়। বাইরের কিছু লোকের বিরুদ্ধে। আমি মনে করি, আমরা সবাই মিলে একটা পরিবার। সেই পরিবারে অনেক সময় ঝগড়া হয়। এখানেও তেমন একটা ঘটনা ঘটেছে। এটা আমরা নিজেরা সমাধান করছি। প্রতিটা পরিবারে অনেক কিছুই হয়। সে রকমই খেলার মধ্যেও উত্তেজনায় অনেক কিছু হয়ে যায়। তবে এখানে বহিরাগত কেউ ছিল না। সমর্থকরাই ছিল। পুরো বিষয়ে আমি বিস্তারিত কিছুই বলতে চাই না। একটা কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই, মদ খেয়ে মারামারি হয়েছে এমনটা যে ছড়িয়েছে, এটা পুরোপুরি মিথ্যা।
অন্যদিকে দীপংকর দীপন বলেন, মারামারির যে ঘটনাটি ঘটেছে, এটা সাংস্কৃতিক সমাজের প্রতিফলন নয়। আমাদের টিমের কেউ মারামারিতে জড়ায়নি। কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে যারা আমাদের ওপর এসে হামলা করেছে। মাঠে খেলায় অংশ নেওয়া কোনো প্লেয়ার ওই হামলায় ছিল না। বিপক্ষ দলের জার্সি পরা মাঠের সাইডে থাকা সাপোর্টারদের থেকে হামলাটা হয়েছে। যারা পুরো ম্যাচ জুড়ে উসকানি দিচ্ছিল তারাই হামলাটা করেছে। মোস্তফা কামাল রাজদের টিম এই হামলা ঠেকাতে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। যে ৬ জনকে আমরা পয়েন্ট আউট করেছি তারা শুধু আমাদের ওপর হামলা করেছে, সেটি নয়। তারা ২টি ভীষণ বড় ক্ষতি করেছে। পুরো সেলিব্রেটি সমাজের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। আয়োজক, স্পন্সরদের বিরাট আর্থিক ক্ষতি করেছে তারা, প্রথম হওয়া সেলিব্রেটি ক্রিকেট লিগকে সাময়িক স্থগিত করে ছেড়েছে। আয়োজকরা এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করায় আমরা খুশি। তবে আমরা এটার সুষ্ঠু বিচার চাই।
গত বৃহস্পতিবার দেশের বিনোদন অঙ্গনের তারকাদের নিয়ে শুরু হয় ‘সেলিব্রিটি ক্রিকেট লিগ’। প্রতি দলে অংশ নিয়েছেন নারী-পুরুষ তারকারা। দলগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন গিয়াস উদ্দিন সেলিম, সালাহউদ্দিন লাভলু, শিহাব শাহীন, চয়নিকা চৌধুরী, দীপংকর দীপন, সকাল আহমেদ, মোস্তফা কামাল রাজ ও রায়হান রাফী।
