ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজ শাখা ছাত্রলীগের এক বছরের কমিটি পার করেছে পাঁচ বছরের বেশি সময়। মেয়াদোত্তীর্ণ এ কমিটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। কিছু নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার তথ্য রয়েছে। সর্বশেষ মদের বার ভাঙচুর ও লুট করে আবারও আলোচনায় এ কমিটির নেতাকর্মীরা।
নতুন কমিটি না হওয়ায় নেতারা বেপরোয়া আচরণের পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছেন বলে মনে করেন সাধারণ কর্মীরা। তারা বলেন, সংগঠনের কর্মকাণ্ডও স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানান তারা।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২৭ এপ্রিল ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে মো. রিপন মিয়াকে সভাপতি ও মাহমুদুল হক জুয়েল মোড়লকে সাধারণ সম্পাদক করে তিতুমীর কলেজ শাখা ছাত্রলীগের এক বছরের জন্য আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। পরে গত বছর ১২ জুন ৩২১ জনের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেন আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্য।
দীর্ঘদিন কমিটি না হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব যেমন তৈরি হচ্ছে না, তেমনি সাংগঠনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে। এ নিয়ে কর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ, ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। এতে একদিকে যেমন কমিটির নেতারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন, অন্যদিকে সংগঠনের মধ্যে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন উপদল। ফলে বাড়ছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। এ ছাড়া অনেকেই জড়িয়ে পড়ছেন নানান অপরাধে।
দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর মহাখালীতে তিতুমীর কলেজ ক্যাম্পাস এলাকার আশপাশের রেস্তোরাঁ, কাপড় ও ভাসমান পিঠার দোকানসহ ফুটপাত থেকে নিয়মিত চাঁদা নিয়ে থাকেন কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ওয়্যারলেস গেটের বিভিন্ন দোকান থেকে মাসিক ২০-৩০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করেন তারা। কলেজের উল্টো পাশে ফুটপাতে ভ্যানে করে পিঠা বিক্রি ও জুতা সেলাই করা ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রতিদিন ১০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। এ ছাড়া ফুটপাতে ভাসমান চায়ের দোকান বসানোর জন্য এককালীন কয়েক হাজার টাকা নিয়ে থাকেন কলেজ ছাত্রলীগের নেতারা।
অভিযোগ রয়েছে, বক্ষব্যাধি ও মহাখালী লাইফলাইন হাসপাতালসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি হাসপাতালে রোগী ভর্তি ও সিটবাণিজ্য করে মাসে লাখ লাখ টাকা আয় করেন কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া কনকর্ড টাওয়ার, রূপায়ণ সেন্টার, নিটল-নিলয় টাওয়ার, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ, সিনহা গ্রুপ, কলম্বিয়া মার্কেট, মহাখালীর আবাসিক হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, খাজা টাওয়ার, প্যারাগন টাওয়ার, বাংলা টাওয়ারসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে মাসে লাখ টাকার চাঁদা ঢোকে কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও তাদের অনুসারীদের পকেটে।
সহসভাপতি আসাদুজ্জামান আসাদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান সাগরসহ কয়েকজন ছাত্রলীগের সভাপতি রিপন মিয়ার পক্ষে চাঁদা নিয়ে থাকেন। অন্যদিকে সাংগঠনিক সম্পাদক সবুজ আহমেদ এবং সাবেক সহসভাপতি নাহিদুজ্জামান নাহিদসহ কয়েকজন সাধারণ সম্পাদক জুয়েলের পক্ষে চাঁদা নিয়ে থাকেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যবসায়ীরা জানান। আর এসব কর্মকাণ্ডের বেশ কয়েকটি প্রমাণও এসেছে দেশ রূপান্তরের হাতে।
ওয়্যারলেস গেটের এক ফল ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফুটপাতে দোকান চালানোর জন্য ছাত্রলীগকে মাসিক ৩-৪ হাজার টাকা দিতে হয়। সভাপতি রিপনের নাম বলে আসাদ প্রতিদিন সন্ধ্যায় এসে ৫০-১০০ টাকা করে নিয়ে যায়।’
ওয়্যারলেস গেট এলাকার এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি রিপন ভাই ও সাধারণ সম্পাদক জুয়েল ভাইয়ের নাম বলে আমাদের থেকে প্রতিদিন টাকা নিয়ে যায়। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের কিছু করার নেই। বাধ্য হয়ে টাকা দিই।’
এর আগে গত বছর অক্টোবরে ইভটিজিং ও হেনস্তার অভিযোগ এনে তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের উপমানব উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক ইমাম হাসান শুভসহ চারজনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন বাঙলা কলেজের এক ছাত্রী। কলেজ ছাত্রলীগের সহসভাপতি নূর আলম সিদ্দিকী, পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক এসএম ইমরান খান, উপ-আইনবিষয়ক সম্পাদক এসএম আশিক মাহমুদসহ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। এমন পোস্ট দেওয়ায় সারা দেশে বহু নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হলেও, তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগ একজনকেও বহিষ্কার করা হয়নি। গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে চাঁদা না দেওয়ার কারণে মহাখালী থেকে গুলশান সড়কের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়ে সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় এই কলেজ ছাত্রলীগ। এ ছাড়া ক্যাম্পাসের সহশিক্ষাবান্ধব ক্লাবগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মীদের ওপর হামলার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো তিতুমীর কলেজ বিতর্ক ক্লাবের সাবেক সভাপতি মাহবুব রিপন, শুদ্ধস্বর কবিতা মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর ইসলাম শান্তসহ নাট্যদল, স্কিল ডেভেলপমেন্ট ক্লাবের জ্যেষ্ঠ নেতারা লাঞ্ছিত হয়েছেন।
কলেজ ছাত্রলীগের কর্মীদের হাত থেকে রক্ষা পাননি সাংবাদিকরাও। গত বছর সেপ্টেম্বরে তিতুমীর কলেজ সাংবাদিক সমিতির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক রাব্বি হোসেনকে এক অনুষ্ঠানে মারধর করে কলেজ ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী। এ ছাড়া সাংবাদিক সমিতির সদস্য মামুন সোহাগ, ইমরান হোসেনের ওপর বিভিন্ন সময় হামলা হলেও অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কলেজ ছাত্রলীগ। বরং নেতাকর্মীদের পরবর্তী সময়ে আরও উগ্র আচরণ করতে দেখা যায়।
সর্বশেষ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মদের বার ভাঙচুর এবং টাকা ও মদ লুটের অভিযোগ ওঠে। কলেজের পাশেই হোটেল জাকারিয়া ইন্টারন্যাশনালের বারে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের জন্য ছিল বিশেষ ছাড়। তারপরও গত রবিবার বারটিতে ভাঙচুর করে তারা। বারের জেনারেল ম্যানেজার খোকন চৌধুরী বলেন, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এসে বার ভাঙচুর করে। বারে থাকা প্রায় ৪ লাখ টাকার ৪০ বোতল ফরেন হুইস্কি লুট করে নিয়ে যায় এবং প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার টাকার ৮০ বোতল কেরুর মদ লুট করে। এ ছাড়া ক্যাশ বাক্স থেকে কয়েক লাখ টাকাও নিয়ে যায়। এতে বারের ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ ঘটনায় বনানী থানায় মামলা করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজ ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মী বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এ কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি দিয়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করা দরকার। বর্তমান কমিটির কয়েকজন চাঁদাবাজি, মাদক সেবন ও কারবার এবং ইভটিজিংসহ নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িত। আবার অনেকেই অছাত্র ও বিবাহিত।
অভিযোগের বিষয়ে কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল মোড়ল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি কিংবা আমার কোনো অনুসারী বার ভাঙচুরে ছিল না। আমাদের সভাপতির এলাকার ছোট ভাই সাগর, মূলত তার সঙ্গে ঝামেলাটা হয়েছে। যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিতে আমাদের সমস্যা নেই।’
চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কারও কাছে এক পয়সাও দাবি করিনি। কেউ করছে কি না জানাও নেই। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ।’ তবে নিজের ছাত্রত্ব না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি।
বার ভাঙচুরের বিষয়ে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি রিপন মিয়া বলেন, ‘আমরা কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নই। এ ঘটনায় কেউ জড়িত প্রমাণ হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারব।’ চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলো উড়ো কথা, উড়ো কথার কোনো জবাব নেই। এমন ঘটনা ঘটে থাকলে সেটা প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। আমরা ছাত্র, এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না।’ নিজের ছাত্রত্ব আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি ফোনে উত্তর দিতে রাজি হননি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান বলেন, ‘ঢাকায় যে কমিটিগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ সেগুলোর বিষয়ে ইতিমধ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আমরা দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করব। যে ঘটনাগুলো সম্প্রতি ঘটেছে, সেগুলো আমাদের জন্য বিব্রতকর। এ বিষয়ে ছাত্রলীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে। কারও ব্যক্তিগত অপকর্মের কারণে যাতে সংগঠনের বদনাম না হয়।’
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসাইন বলেন, ‘ছাত্রলীগের নাম ব্যবহার করে কোনো নেতাকর্মী যদি অপকর্ম করে থাকে তাহলে আমরা সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব। অপকর্ম করে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করলে কেউ ছাড় পাবে না। এ বিষয়ে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করব। সবার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
