কিছুক্ষণ পর পরই লোহার গ্রীলের দরজায় এসে কাউকে যেন খুঁজছেন তপন বাবু। চলে গিয়ে আবার ফিরে আসছেন। বিড়বিড় করে কি যেন বলছেন, কিন্তু কোথাও কেউ নেই। একাকিত্বের দিনগুলো এমনই কাটছে তার। তপন বাবুর বর্তমান স্থান চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার আমেনা বশর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে। দু'বছর ধরে এখানে থাকছেন তিনি। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। কেউ তার খবর নেন না। প্রথম বছর দুর্গা পূজায় দেখতে আসলেও এখন তাকে কেউ দেখতেও আসেন না। এভাবে স্বজনের অপেক্ষায় দিন কাটে তপনের। শুধু তপন বাবু নয় জীবনের পড়ন্ত বিকালে এসে এই বৃদ্ধাশ্রমে একাকিত্বের এমন দুর্বিষহ যন্ত্রণাময় সময় কাটাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আসা ৩৪ জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা।
২০১৪ সালের পহেলা মে দক্ষিণ রাউজানের নোয়াপাড়ায় চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক সংলগ্ন বিশাল এলাকা জুড়ে আমেনা বশর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মো. শামছুল আলম মা-বাবার নামে এ বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
জানতে চাইলে এর প্রতিষ্ঠাতা ব্যবসায়ী সামছুল আলম বলেন, ১৯৮৫ সালের দিকে ইংল্যান্ডে বেড়াতে গিয়ে চাচাতো ভাইয়ের বাসার বারান্দায় বসে একদিন বিকেলে দেখলাম, সাইরেন বাজিয়ে একটি গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। আমার চাচাতো ভাই জানালেন, গাড়ির আরোহীরা বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা। তাদের ঘোরানোর জন্য পার্কে নেওয়া হচ্ছে। সেদিনই ঠিক করেছিলাম আমি এ রকম একটি প্রতিষ্ঠান করব। যেখানে অসহায় বয়স্করা তাদের জীবনের শেষ দিনগুলো নিশ্চিন্তে কাটাতে পারবেন। সেই স্বপ্ন পূরণ হয় ২০১৪ সালে৷ নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে তৃপ্ত রাউজানের স্থায়ী বাসিন্দা ব্যাবসায়ী সামছুল আলম। প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিনে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়া অসহায় মানুষদের কাছে ছুটে যান তিনি। তাদের সুখ-দুঃখের খবর নেন। বৃদ্ধাশ্রমের চারতলা ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় প্রবীণদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সোমবার সকালে কথা হয়, বৃদ্ধাশ্রমে থাকা চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ৮০ ছুঁইছুঁই নজরুল ইসলামের সাথে৷ এই বৃদ্ধাশ্রমের প্রথম মানুষ তিনি। দশ বছর ধরে পরিবার ছাড়া এখানেই জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। কথা বলতেই, বুকে জমানো দশ বছরের ক্ষোভ প্রকাশ করলেন তিনি। ছেলেমেয়েরা খবর নেন না বলে এতো বছর এখানেই থাকছেন তিনি৷
বোয়ালখালী উপজেলার মাহবুবুল আলম এখানে আছেন অনেক দিন ধরে৷ পরিবারের সুখের জন্য জীবনের সোনালী বসন্ত তিনি কাটিয়েছেন প্রবাসে৷ কিন্তু বার্ধক্যের এই সময়টিতে তিনি আছেন একা৷ তিনি জানালেন, ছেলেরা থাকেন আমেরিকায়, মেয়ে থাকেন কানাডায়৷ তার অসুস্থতায় ৩০ বছর একসাথে কাটানো স্ত্রীও নেন না খবর। জীবন যেন তার কাছে এক বেদনার নীল সাগর।
মেহেরুন্নেসা কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা। তিনি বলেন, 'পুত্রবধূরা আমাকে সইতে পারেনা। তাই সবাইকে ছেড়ে এখানে একা পরে রয়েছি।'
বেদনার দেয়ালে আটকে পরা ডানা ঝাপটানো সেই মানুষগুলোর জীবনের দুঃখ গাঁথা শুনতে ও আনন্দ ভাগাভাগি করতে পুরো একটি দিন কটিয়েছেন রোটারী ক্লাব অব গ্রেটার চিটাগংয়ের বন্ধুরা। এ সময় তারা বৃদ্ধাশ্রমের বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সাথে নিয়ে কেক কাটেন। পরে তাদের জন্য নতুন কাপড়ও তুলে দেন রোটারি ক্লাব।
ক্লাব প্রেসিডেন্ট জামাল উদ্দিন সিকদার বলেন, 'প্রত্যেক সন্তানেরই উচিৎ জীবনের শেষ সময়ে বাবা-মা'কে সাথে রাখা। যারা এটি করেন না, সেই সন্তানেরা আসলেই কি মানুষ?'
রোটারি চট্টগ্রাম জেলা গভর্নর প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান বলেন, 'কারো জীবনেই যেন বৃদ্ধাশ্রম না আসে। জীবন সায়াহ্নে পরিবার-পরিজনকে ছাড়া থাকা কতটা বেদনার তা মানুষ না হলে বুঝবেনা।'
চারতলা ভবনের আমেনা-বশর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ফারুক দেশ রূপান্তরকে জানান, মাত্র সাতজন বয়স্ক মানুষকে পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে এ কেন্দ্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে ৩৪ জন আছেন। তাদের দেখাশোনার জন্য পাঁচজন কর্মচারী আছেন। প্রতিষ্ঠাতা সামছুল আলমের নিজ অর্থায়নে পুনর্বাসিতদের পুষ্টিচাহিদা অনুযায়ী খাবার, প্রয়োজন মতো চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।
