কাতার রেডিওতে তেলাওয়াতকারী প্রথম বাংলাদেশি

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৩, ১০:৩৮ পিএম

প্রায় তিন দশক ধরে রাজধানী দোহাসহ কাতারের বিভিন্ন শহরের মসজিদে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশি ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবরা। কাতারে মুয়াজ্জিন ও ইমামদের অধিকাংশই বাংলাদেশি। ১৯৯০ সালে প্রথম সরকারিভাবে ইমাম-মুয়াজ্জিন নেওয়া শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ধনী দেশ কাতার।

কাতারে ১ হাজার ৮০০টি মসজিদ রয়েছে। প্রতিটি মসজিদে একজন ইমাম, একজন মুয়াজ্জিন এবং একজন খতিব রয়েছেন। কাতার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশি ইমামরা। বর্তমানে কাতারে কর্মরত ইমাম-মুয়াজ্জিনের সংখ্যা ৭০০ জনের বেশি। তাদেরই একজন কারি মুহাম্মাদুল্লাহ বিন হাফিজ। তিনি ২০০৪ সালে কাতারে ইমাম ও খতিব হিসেবে নিয়োগ পান। বর্তমানে তিনি দোহার আল ওয়াকির অঞ্চলের মসজিদে সাউদ বিন আব্দুর রহমান বিন জাছেম আল সানিতে দায়িত্ব পালন করছেন।

ইমামতির পাশাপাশি কাতার রেডিওতে নিয়মিত পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করে সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন করছেন তিনি। বাংলাদেশি কারিদের মধ্যে তিনিই প্রথম কাতার রেডিওতে কোরআন তেলাওয়াত করার সুযোগ পান। শ্রোতাদের হৃদয়কাড়া সুরে কোরআন তেলাওয়াত করে মন জয় করা কারি মুহাম্মাদুল্লাহ বিন হাফিজের সাফল্যের গল্প এখানেই শেষ নয়। তিনি কাতার আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় পাঁচবার পাঁচ রেওয়াতের পুরস্কার লাভ করেন এবং পবিত্র কোরআনের প্রসিদ্ধ ১০ কেরাতের বিভিন্ন রেওয়ায়েতের ওপর একাধিকবার পুরস্কার অর্জন করেন। বাংলাদেশি হাফেজদের মধ্যে এটা তার একক অর্জন। এ ছাড়া ইরান আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় তিনি চতুর্থ স্থান লাভ করেন। তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক কারি মুহাম্মাদুল্লাহ ১৯ বছর ধরে পরিবারসহ কাতারেই বসবাস করছেন।

নরসিংদী জেলার শিবপুরের চৈতন্য গ্রামের হাফেজ মাওলানা হাফিজুল্লাহ (রহ.)-এর সন্তান কারি মুহাম্মাদুল্লাহ বিন হাফিজ। অল্পবয়সে মায়ের কাছেই এক-দুই পারা কোরআন মাজিদ মুখস্থ করেন। পরে বাবার প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া দক্ষিণ মির্জানগর মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে বাবার কাছেই মাত্র ১১ বছর বয়সে পূর্ণ কোরআন মাজিদ মুখস্থ করেন।

হেফজ শেষ করে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ায় কিতাব বিভাগে ভর্তি হয়ে সাত বছর পড়াশোনা করে ২০০০ সালে মিরপুরের মাদ্রাসা দারুর রাশাদ থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করে মাওলানা সনদ লাভ করেন। পড়াশোনা শেষে ২০০১ সালে জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া দক্ষিণ মির্জানগরে (নরসিংদী) মুহতামিম হিসেবে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন।

পরে ২০০৪ সালে কাতার ধর্ম মন্ত্রণালয়ে ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে ইমাম ও খতিব হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং কাতারে অনুষ্ঠিত ২০০৮ ও ২০০৯, ২০১০, ২০১২ সালে বিভিন্ন রেওয়াতের ওপর হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় পঞ্চম, চতুর্থ, তৃতীয় ও দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। তিনি ২০১৭-২০১৮ সালে আরটিভিতে আয়োজিত হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন।

কারি মুহাম্মাদুল্লাহ বিন হাফিজের ছেলে হাফেজ মুহান্নাদ বিন মুহাম্মাদ চলতি বছরের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান লাভ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় ওই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।

মিনেসোটার এডিনা হাইস্কুল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হয়। প্রতিযোগিতায় হিফজুল কোরআন বিভাগে ছেলেদের মধ্যে তৃতীয় স্থান অর্জন করে বাংলাদেশের হাফেজ মুহান্নাদ বিদেশের মাটিতে দেশের নাম উজ্জ্বল করেন।

মিনেসোটাভিত্তিক কোরআন শিক্ষাকেন্দ্র তিবইয়ান সেন্টার ফর কোরআনিক সায়েন্স তিনব্যাপী আন্তর্জাতিক ওই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কারের অর্থ ও সম্মাননা সনদ তুলে দেন মিনেসোটা ইসলামিক ইউনিভার্সিটির প্রধান শায়খ ড. ওয়ালিদ ইদরিস আল-মানিসি। দুই গ্রুপে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় ৩০টি দেশ থেকে ৪২ জন প্রতিযোগী অংশ নেয়।

আন্তর্জাতিক এ প্রতিযোগিতায় ফ্রান্সের ওমর আফুফ প্রথম স্থান, যুক্তরাষ্ট্রের সরওয়ার জামালুদ্দিন দ্বিতীয় স্থান এবং বাংলাদেশের মুহান্নাদ তৃতীয় স্থান অধিকার করে। পুরস্কার হিসেবে মুহান্নাদ পাঁচ হাজার ডলার ও সম্মাননা সনদ পেয়েছে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটায় তরুণ মুসলিমদের মধ্যে কোরআনভিত্তিক শিক্ষা-কার্যক্রম প্রসারে কাজ করছে তিবইয়ান সেন্টার ফর কোরআনিক সায়েন্স। শায়খ কারি আবদুর নাসের ফারেহ প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে ২০২২ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতা শুরু হয়। গত বছর ল্যানহামে অনুষ্ঠিত এ প্রতিযোগিতায় ১৮টি দেশের প্রতিযোগীরা অংশ নেয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত