পুলিশ হেফাজতে চট্টগ্রাম নগরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অবসরপ্রাপ্ত এক উপপরিচালক ও বগুড়ায় এক আইনজীবী সহকারীর মৃত্যু হয়েছে। ওই দুজনের পরিবারের অভিযোগ, তাদের হত্যা করা হয়েছে।
চট্টগ্রামে গত মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে মারা যাওয়া দুদকের সাবেক কর্মকর্তা এসএম শহীদুল্লাহ (৫৮) নগরের চান্দগাঁও থানার এক কিলোমিটার এলাকার মুহুরি বাড়ির বাসিন্দা ছিলেন। শহীদুল্লাহর বড় ছেলে সৈয়দ আসিফ শহীদের অভিযোগ, তার বাবা হার্টের রোগী ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর পুলিশের গাফিলতি ও অবহেলার কারণে চান্দগাঁও থানায় তার বাবার মৃত্যু হয়েছে। গ্রেপ্তারের আধঘণ্টার মধ্যে তার বাবা মারা গেলে থানা ভবনে পরিবারের কাউকে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ। এমনকি অনুরোধ করার পরও পুলিশ তার বাবাকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেনি। একপর্যায়ে তার বাবাকে বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালে নিয়ে যান তার চাচা এসএম সাইফুল্লাহ।
আসিফ শহীদ বলেন, ‘কোনো ওয়ারেন্ট না দেখিয়েই ধস্তাধস্তি করে বাবাকে নিয়ে গেছেন চান্দগাঁও থানার এসআই সোহেলসহ পুলিশের তিন সদস্য। তারা আমার বাবাকে হত্যা করেছে। স্প্রেটা পর্যন্ত দিতে দেয়নি।’
শহীদুল্লাহর ছোট ছেলে নাফিস শহীদ অভিযোগ করেন, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তার বাবা বাড়ির অদূরে একটি ফার্মেসিতে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এ সময় সাদা পোশাকে দুই পুলিশ সদস্য তার বাবাকে শার্টের কলার ধরে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে যায়। নাফিস শহীদের অভিযোগ, হৃদরোগীকে ওষুধ দিতে না দেওয়াও এক ধরনের নির্যাতন এবং এটা পরিকল্পিত হত্যা।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মাহতাব উদ্দিন গতকাল বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) জরুরি বিভাগের সামনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। তার সঙ্গে পুলিশ কী ধরনের আচরণ করেছে তা থানার সিসি ক্যামেরায় আছে। হঠাৎ মৃত্যুর পর তার পরিবার অনেক কথা বলতেই পারে।’ তবে এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
চান্দগাঁও থানার ওসি খাইরুল ইসলাম বলেন, থানায় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে পুলিশ ও পরিবারের লোকজন তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। তবে ওই হাসপাতালের একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, হাসপাতালে আনার আগেই শহীদুল্লাহর মৃত্যু হয়েছে।
গতকাল হাসপাতালে আসিফ শহীদসহ তার পরিবারের সদস্যরা গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে প্রশ্ন তোলেন সাদা পোশাকে কেন পুলিশ গ্রেপ্তার অভিযানে গেল। এ বিষয়ে ওসির কাছে জানতে চাইলে তিনি তা এড়িয়ে যান।
এসএম শহীদুল্লাহ সবশেষ চট্টগ্রামে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২-এ উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালের ১২ জুলাই অবসরে যান তিনি।
পুলিশ সূত্র জানায়, শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে গত ২৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেন রণি আক্তার ওরফে তানিয়া নামে এক নারী। ওই মামলায় শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা গত ২ অক্টোবর থানায় পৌঁছায়।
অন্যদিকে বগুড়ায় ডিবি পুলিশের হেফাজতে থাকা হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামি বগুড়া জেলা আইনজীবী সহকারী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব (৩৫) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। গত মঙ্গলবার রাত পৌনে ৯টার দিকে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। ওইদিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাকে আদালতের সামনে থেকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
নিহত হাবিব জেলার শাজাহানপুরের খুকি বেগম হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামি ছিলেন। তিনি শাজাহানপুর উপজেলার জোড়া গ্রামের আবদুল কুদ্দুস বাবলুর ছেলে।
হাবিবের পরিবারের অভিযোগ, তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। আর নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে বগুড়া ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মোস্তাফিজ হাসান বলেন, ১০ বছর আগে বগুড়ার শাজাহানপুরের জোড়া গ্রামে বিপুল নামে এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। হাবিব ওই মামলার প্রধান আসামি ছিলেন। নিহত শিশুর সৎমা খুকি বেগম ওই হত্যা মামলার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন। কিন্তু সাক্ষ্যের জন্য ধার্য তারিখের আগেই গত ২ আগস্ট খুকিকে হত্যা করা হয়। গত মঙ্গলবার মনোয়ারা বেগম নামে প্রতিবেশী এক নারীর বাড়ির সেপটিক ট্যাংকের ভেতর থেকে খুকি বেগমের খন্ডিত পা উদ্ধার করা হয়।
তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে মনোয়ারা জানিয়েছেন, তার সামনেই হাবিবসহ কয়েকজন খুকিকে হত্যা করে। মনোয়ারা বেগমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী হাবিবকে মঙ্গলবার আটক করা হয়। পরে ডিবি অফিসে নিয়ে মনোয়ারা বেগমের মুখোমুখি করা হলে হাবিব বুকে ব্যথার কথা বলেন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
গতকাল দুপুরে পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার জানান, হাবিবকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি। যেহেতু অভিযোগ উঠেছে, তাই ঘটনাটি তদন্ত করা হবে।
