চলতি দশকের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চল এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বড় হুমকি হয়ে উঠবে ডেঙ্গু। গতকাল শুক্রবার বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ জেরেমি ফারার। কয়েক মাস আগেই ডব্লিউএইচওতে যোগ দেওয়া এ ব্রিটিশ বিজ্ঞানী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্র- ইউরোপের-আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে গ্রীষ্মকাল দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে এবং বৃষ্টিপাত বাড়ছে। আবহাওয়ার এ বৈশিষ্ট্য এডিস মশার বিস্তারের জন্য খুবই উপযোগী। আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে গত কয়েক বছর ধরেই ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং প্রতিবছর তার হার বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং এডিস মশার বিস্তারের কারণে সামনের বছরগুলোতে রোগটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। আমার আশঙ্কা, চলতি দশকের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চল এবং আফ্রিকার বিভিন্ন নতুন অঞ্চল রীতিমতো দখল করে নেবে ডেঙ্গু।
মশাবাহিত বিভিন্ন রোগের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আতঙ্কজনক হয়ে উঠেছে ডেঙ্গু। এ রোগের জন্য দায়ী ভাইরাসটির একমাত্র বাহক এডিস মশা। এ মশার মাধ্যমেই একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়ায় এ ভাইরাস। উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া এডিস মশার বিস্তারের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। একসময় এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা যেত। ২০০০ সালের পর থেকে প্রায় সারা বছরই ডেঙ্গুর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে এ অঞ্চলের দেশগুলোতে। ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে প্রতি বছর গড়ে ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
ফারার বলেছেন, ডেঙ্গু সংক্রমণ সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং আফ্রিকার কিছু অংশের জন্য স্থানীয় রোগ হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে। ইতিমধ্যেই সীমিত আকারে এ অঞ্চলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা মশার অনুকূলে থাকে এবং সহজেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়লে অনেক দেশের হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, আইসিউর প্রয়োজন পড়বে, সঙ্গে রোগীদের জন্য নার্সের। তবে আফ্রিকার জন্য ডেঙ্গু বড় একটি সমস্যা হয়ে উঠবে। সত্যিই আমি তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে ৪২ লাখ ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়েছে। তবে জেরেমি ফারার বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা এ পরিসংখ্যানের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি।
ভিয়েতনামে ১৮ বছর ধরে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন এশীয় মৌসুমি রোগ নিয়ে কাজ করেছেন জেরেমি ফারার। করোনা মহামারীর সময় ব্রিটেনের সরকারের ‘কভিড ১৯ রেসপন্স কমিটির’ সদস্য ছিলেন তিনি, সেই সঙ্গে দাতব্য চিকিৎসাবিষয়ক বৈশ্বিক এনজিও ‘ওয়েলকাম’র সঙ্গেও যুক্ত তিনি।
রয়টার্সকে এ গবেষক বলেন, আমাদের এখন ডেঙ্গু প্রতিরোধবিষয়ক আলাপ-আলোচনা ও বৈশ্বিক সচেতনতা বাড়ানো উচিত। এ রোগে আক্রান্ত রোগীদের অনেকেরই একপর্যায়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। মহামারী আকারে এ রোগ ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালগুলো যেন সেই বাড়তি চাপ নিতে পারে, সেজন্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকেও প্রস্তুত করা প্রয়োজন। ফারার বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলা করার জন্য বিশ্বের নতুন অঞ্চলগুলোকে প্রস্তুত করার অর্থ হলো, মশা নিয়ন্ত্রণের সর্বোত্তম উপায়সহ জনস্বাস্থ্যের তহবিল সঠিক এলাকায় ব্যয় করা। ডেঙ্গু এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়, যা ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহনকারী মশার চেয়ে ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, এ মশা ঘরের ভেতরে মানুষকে কামড়ায় এবং রাতের থেকে দিনের বেলা বেশি কামড়ায়। খুব অল্প পানিতে তারা বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
