ভারতের উত্তর সিকিমে অতিভারী বর্ষণে সেখানকার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ড্যাম (বাঁধ) ভেঙে সৃষ্টি হওয়া বন্যার প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তা নদী অববাহিকার পাঁচ জেলা নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধায়। গতকাল শুক্রবার বন্যা পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হলেও তিস্তাপাড়ের মানুষজনের আতঙ্ক কাটেনি। যেকোনো সময় উজানের সিকিম থেকে ফের বাঁধ ভেঙে ঢল আসতে পারে এমন গুঞ্জন ঘুরপাক খাচ্ছে তিস্তা অববাহিকায়।
এদিকে উজান থেকে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের মরদেহ তিস্তার বাংলাদেশ অংশে ভেসে আসা অব্যাহত রয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয়দের ধারণা, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সিকিমে প্রবল বৃষ্টিতে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় নিখোঁজদের কারও কারও মরদেহ এগুলো।
উজান থেকে আসা ঢলে কাদা ও ঘোলাপানিতে একাকার তিস্তার বুক। জমাট বাঁধছে পলি। ১৯৬৮ সালের পর তিস্তাপাড়ের মানুষ এমন কাদাযুক্ত পানি দেখেনি বলে জানান ডিমলার ঝাঁড়সিংহেশ্বর চরের ৬৮ বছর বয়সী জয়নুল আলী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুধু কাদাযুক্ত পানি এলাকায় প্রবেশ করছে। আজকে (গতকাল) চরের অবশিষ্ট আমনের আধাপাকা ধান কেটে নিয়ে আসছে এলাকাবাসী। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও সন্ধ্যার পর আতঙ্কে থাকতে হয়। রাতে আবার কখন পানি বাড়ে সেই ভয়ে। এলাকাবাসীর চোখে এখন আর ঘুম নেই। রয়েছে আতঙ্ক।’
বাইশপুকুর চরের প্রবীণ ব্যক্তি নুরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৫৫ বছর পর এবার তিস্তায় এত কাদাযুক্ত পানি দেখা গেল। ফলে নদীর ওপরের জমিতে পলিমাটি জমবে। বন্যার পানি শুকিয়ে যাওয়ার পরও জমিতে পলিমাটি থেকে যাবে। এর কারণে চরে বিভিন্ন ফসলি জমির সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। আবাদ ভালো হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন চরাঞ্চলের কৃষকরা।’
তবে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসফাউদ্দৌলা বলেন, ‘তিস্তার পানি কাদামাটিতে ভরে গেছে। এতে নদী ভরাটও হয়েছে, যা তিস্তার পানি প্রবাহের জন্য বড় বিপজ্জনক। কারণ একটু পানি বাড়লেই নদীর পানি উপচে পড়বে। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করেছি।’
নীলফামারীর ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম জানান, গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তিস্তা অববাহিকায় বৃষ্টিপাত না হলেও আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা লেগে ছিল। তিস্তার পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বিপদসীমার (৫২.১৫) ৮৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ পয়েন্টে গত বুধবার রাত ৯টায় তিস্তার পানি বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। ফলে গতকাল থেকে তিস্তা অববাহিকার পাঁচ জেলার বন্যা পরিস্থিতির নাটকীয় উন্নতি হয়।
উজানের ঢল কমলেও বাংলাদেশের নীলফামারীর কালীগঞ্জের জিরোপয়েন্টের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবা থেকে তিস্তার ঘোলা পানির ঘূর্ণিতে বাংলাদেশে এখনো ভেসে আসছে মরদেহ, জুতা, জামাকাপড়, বাসনপত্র, গবাদি পশু থেকে রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার।
১৯৬৮ সালের ভয়াবহ বন্যার সময় তিস্তা নদীর যে রূপ ছিল, সে ধরনের অবস্থা হয়েছিল বলে জানান তিস্তা অববাহিকার ঝুনাগাছ চর এলাকার প্রবীণ কৃষক মান্নান মিয়া। তিনি বলেন, ‘তিস্তা নদীর স্বচ্ছ নীলাভ পানি নিমিষেই কাদামাটিতে পরিণত হয়। যার রেশ এখনো কাটেনি।’
তিস্তায় আরও মরদেহ : লালমনিরহাট ও রংপুরে আরও তিনটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ তিস্তায় উদ্ধার হয়েছে। লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের তিস্তা নদীবেষ্টিত প্রেমেরবাজার চর থেকে অজ্ঞাতপরিচয় দুই যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে লালমনিরহাট সদর থানা পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবকের মরদেহ উদ্ধারের পর গতকাল সকালে একই স্থান থেকে আরও এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, উত্তর সিকিমের বাঁধ ভাঙায় ভারতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মরদেহ পানিতে ভেসে এসেছে।
এ ছাড়া রংপুরের গঙ্গাচড়ায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তিস্তা নদীর পানিতে ভেসে আসা অজ্ঞাতপরিচয় যুবকের (৩৫) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ ও স্থানীয়দের ধারণা, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সিকিমে প্রবল বৃষ্টিতে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় মরদেহটি ভেসে এসেছে।
তিস্তায় ভেসে আসতে পারে মর্টার শেল : সিকিমে জলবিদ্যুতের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর তিস্তার ঢলে ভেসে আসছে মর্টার শেলও। এগুলো সিকিমের সেনা ক্যাম্পের মর্টার শেল বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এখনো বাংলাদেশে তিস্তায় মর্টার শেল উদ্ধার হয়নি। তবে বাংলাদেশের উজানে জলপাইগুড়িতে একটি ভেসে আসা মর্টাল শেল বিস্ফোরণে দুজন নিহত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিস্তা অববাহিকার বাংলাদেশের নীলফামারীর ডিমলার কলোনিহাট ৫১ বিজিবি ক্যাস্পের কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার ফয়জুল হক বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ সতর্কবার্তা দিয়েছে। বিষয়টি আমরা তিস্তা অববাহিকায় চর ও গ্রামে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে জানিয়ে দিয়েছি। কেউ যদি মর্টার শেল দেখতে পায়, হাতে না ধরে বিজিবিকে খবর দিতে বলেছি।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন লালমনিরহাট প্রতিনিধি ফরহাদ আলম সুমন
