বিএনপি করায় ছেলের বিষপান মানতে নারাজ বাবা

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৬:০৬ এএম

‘আমি অনেক বছর ধরে বিএনপির রাজনীতি করছি। আমার ছেলে চার-পাঁচ বছর ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতি করছে। অতীতে বিএনপির কত মিটিং-মিছিলে গিয়েছি। রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কোনো দিন ছেলের সঙ্গে আমার বাগ্বিতণ্ডাও হয়নি। তাহলে আমার ছেলে বিষ খেয়ে কেন আত্মহত্যার চেষ্টা করবে? নিশ্চয়ই কেউ একজন বা কোনো মহল ফায়দা লুটতে ছেলেকে চাপ সৃষ্টি করেছে।’

গতকাল শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছেলে নীরব ইমনের শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে দেশ রূপান্তরকে এসব কথা বলেন বাবা মোহাম্মদ জহির। তাদের বাড়ি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের মালিরহাট এলাকায়। ইমন পোমরা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তার বাবা জহির পোমরা ইউনিয়ন যুবদলের সহসভাপতি।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে পোমরা ইউনিয়নে দলীয় কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ছাত্রলীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাদের মধ্যে ইমনও ছিলেন। এ সময় চট্টগ্রাম নগরীতে অনুষ্ঠিত বিএনপির রোডমার্চ কর্মসূচিতে তার বাবার অংশ নেওয়ার একটি ছবি দেখতে পেয়ে তা ফেসবুকের মেসেঞ্জারে লাল চিহ্ন দিয়ে ইমনকে পাঠান তার সহকর্মী ছাত্রলীগের অন্য এক নেতা। ইমন বাবার ছবিটি দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে বাড়িতে ছুটে যান এবং এ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে রাগারাগি করেন। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বিষপান করেন তিনি। পরে তাকে প্রথমে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে পরে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

গতকাল চমেক হাসপাতালের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে (মেডিসিন ইউনিট-১) গিয়ে দেখা যায়, একটি কেবিনের ৪২ নম্বর শয্যায় শুয়ে আছেন ইমন। শয্যার সঙ্গে গামছা দিয়ে তার দুই হাত ও দুই পা বাঁধা। বুকে লাগানো চিকিৎসার নানান যন্ত্রপাতি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে বাম হাত একটু বাঁকা করে মাঝেমধ্যে নিজের মোবাইল ফোন দেখছিলেন ইমন। কেমন আছেন জানতে চাইলে বলেন, ‘ভালো আছি।’ এ সময় তার শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাবা জহির ও এক ফুপু।

ছেলে কেন বিষপান করেছে জানতে চাইলে জহির বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে ছেলে বিষপান করেছে। তখন আমি চট্টগ্রাম শহরে বিএনপির রোডমার্চ কর্মসূচিতে ছিলাম। ছেলের ফেসবুক মেসেঞ্জারে বিএনপির রোডমার্চের কর্মসূচিতে আমার অংশ নেওয়ার যে ছবিটি তার (ইমন) বন্ধুরা তাকে মেসেঞ্জারে পাঠিয়েছে, সেই ছবি আমি নিজেই ফেসবুকে আপলোড করেছি। আমি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এসব নিয়ে ছেলে কোনোদিন আমার কাছে প্রশ্নও তোলেনি। এতদিন পর এসে কেন সে বিষ খেয়ে মরতে যাবে? নিশ্চয়ই তাকে সরকারদলীয় কোনো মহল বলেছে “তুমি ছাত্রলীগ করো। তোমার বাবা কেন বিএনপির রাজনীতি করে” হয়তো এভাবে বলায় সে অপমানিত বোধ করেছে। তাকে বিষ খাওয়ার জন্য প্রলুব্ধ করা হয়েছে।’

বৃহস্পতিবার বিকেলে ইমন বিষপান করার আগে বাবা বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত থাকার বিষয়ে বাড়িতে গিয়ে পরিবারের কারও সঙ্গে রাগারাগির বিষয়টিও নাকচ করেছেন জহির।

ইমনের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. শ্রাবন্তী বলেন, ‘ইমনের পাকস্থলী ওয়াশ করা হয়েছে। সিনিয়রদের পরামর্শে তার চিকিৎসা চলছে। তবে তিনি এখনো আশঙ্কামুক্ত কি না, তা বলা মুশকিল। তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।’

১৩ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বরত চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে বাবা জহির বলেন, ‘ইমন এখনো আশঙ্কামুক্ত নয়।’ তিনি আরও জানান, পেশায় তিনি ছিলেন অটোরিকশাচালক। তবে চার-পাঁচ বছর আগে সেই পেশা ছেড়ে গ্রামে অন্যের জমিজমা চাষাবাদ করে সংসার চালাচ্ছেন। তার দুই মেয়ে, চার ছেলের মধ্যে ইমন সবার বড়। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এক ছেলে কোরআনে হাফেজ। এক মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। ইমন সপ্তম-অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। প্রায় ২০ মাস আগে তাকে দুবাই পাঠানো হয়েছিল। পাঁচ মাস আগে সে দেশে আসে। আগামী জানুয়ারিতে ফের তার দুবাই চলে যাওয়ার কথা।

অবশ্য ইমনের চাচা পোমরা ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মো. মহিউদ্দিনের দাবি, জহির বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত থাকায় তার ছেলে তাকে রাজনীতি থেকে বিরত থাকতে বলত। তিনি বলেন, ‘এরপরও তার বাবা বিএনপির রোডমার্চ কর্মসূচিতে যাওয়ায় ক্ষোভে ইমন এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জেনেছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত