পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, দেশ ভালো চলছেএ বর্ণনায় যদি আমি থাকি, তাহলে অর্থনীতি চলা মুশকিল। আমাদের একজন অ্যাবসেন্ট অর্থমন্ত্রী আছেন, তিনি বললেন, ‘সব ঠিক আছে, সব ভালো চলছে। আমি দেখতে পাচ্ছি রাজনৈতিক নেতৃত্বে বড় সংকট রয়েছে; বিশেষ করে অর্থনীতিতে নেতৃত্বের সংকট বেশি। এই সংকটময় মুহূর্তে অর্থনীতিতে একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব দরকার ছিল। সেটি আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’
গতকাল রবিবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ আয়োজনে ‘সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট : টুয়ার্ডস ফাস্টার, ক্লিনার গ্রোথ’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান, বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. ফ্রানজিসকা লিয়েসলটে অনসর্জ, ঢাকা চেম্বারের সভাপতি ব্যারিস্টার সামীর সাত্তার।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমরা অর্থনীতির টানাপড়েনের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সরকার সঠিক নীতিনির্ধারণের জন্য প্রায় দেড় বছর সময় পেয়েছিল, কিন্তু তারা নেয়নি। সরকার সাধারণ কথার মধ্যেই ছিলআমরা ভালো করছি, ভালো করব ইত্যাদি। বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলার কারণেই আজ এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমার কথা হলো, ১৫ বছর সময় পেয়েছি, এগুলো কি সংশোধন করতে পারতাম না?’
রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তাদের সঠিক সিদ্ধান্তের পরামর্শ দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘আমাদের দরকার কী ছিল। আমাদের পেমেন্ট লায়াবিলিটিস কী, আমার ঘাটতি কোথায়এগুলো চিহ্নিত করে জবাব দিতে হবে, আমাদের কোথায় কোথায় কী খরচ করতে হবে। সেগুলোর কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেই।’
নির্বাচন সামনে রেখে কঠিন সময় আসছে স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, ‘সামনে নির্বাচন। এটি কোনো সাধারণ নির্বাচনও নয়। আমরা এমন কোনো শিল্পরাষ্ট্র নই যে সব তাদের মতো স্বাভাবিকভাবে হয়ে যাবে। এখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা বাড়বে।’
এখনই অর্থনীতির সংকট সামাল দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমাদের এখনই স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। এমনভাবে ব্রেক কষতে হবে যাতে রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে কিছুতেই না নামে। এটা আমাদের এখনই করতে হবে। আপনার কাছে বহু অপশন আছে, এই সংকট ঠেকানোর জন্য। সেগুলো ব্যবহার করে রিজার্ভের পতন ঠেকান।’
অনুষ্ঠানে সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘কভিডের আগের দশকটা যদি ধরি, সেই সময় আমাদের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ছিল। কিন্তু সেই সুসময়ে আমাদের অর্থনীতির ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সামনে আসেনি। গত দুই বছরে আমাদের সব খাতের দুর্বলতা সামনে চলে এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রবাসীরা ইনফরমাল চ্যানেল ব্যবহার করে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। এভাবে হুন্ডিতে অর্থ পাঠালে অর্থ পাচারকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের একটি রাস্তা তৈরি হচ্ছে।’
সামনের অর্থনীতির সংকটের কথা স্মরণ করিয়ে সেলিম রায়হান বলেন, ‘আগামী দুই থেকে তিন বছর খুব গুরুত্বপূর্ণ। সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনাটা কোনো ছেলেখেলা নয়। এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
অনুষ্ঠানে ড. ফ্রানজিসকা লিয়েসলটে অনসর্জ বলেন, ‘দেশের কম উৎপাদনশীলতা রাজস্ব আয় কম হওয়ার একটি কারণ হয়ে থাকতে পারে। আর বাংলাদেশ এখনই খেলাপি হবে না, সেটি বহুদূর। আমি মনে করি, কর আদায় ব্যাপারটি খুবই সহজ। এগুলো এখন জনে জনে না বলে কম্পিউটারাইজড করাটা বেশি যৌক্তিক হবে। এই মুহূর্তে কর-জিডিপির অনুপাত বাড়াতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’
তিনি তার উপস্থাপিত প্রেজেন্টেশনে চারটি প্রশ্নের বিপরীতে চারটি উত্তর উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন এলে উত্তর হবে, খুব দ্রুত প্রবৃদ্ধির দিকে যাচ্ছে, তবে পতনের শঙ্কাও রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ কী এমন প্রশ্ন হলে উত্তর হবে, খুব বেশি ঋণ, কম রাজস্ব আদায়, কয়েকটি দেশ তো ঋণের চাপে আছে। অতীতের উচ্চ ঋণে কী ঘটেছিল, এমন প্রশ্নের উত্তর হবে, মাঝপথে এসে আর্থিক সংকট দেখা দেওয়া। কয়েকটি ঋণখেলাপির উদাহরণও আছে এই অঞ্চলে। সমস্যা সমাধানে করণীয় কী, এমন প্রশ্নের উত্তর হবে, সামনে বহু অপশন আছে, তবে কোনোটাই সহজ নয়।
অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই সভাপতি সামীর সাত্তার বলেন, ‘বাংলাদেশ জিডিপির তুলনায় ঋণ ৩২ শতাংশের বেশি। এটি ঠিক আছে। কিন্তু কর জিডিপির অনুপাত বিশে^ সবচেয়ে কম। মূল সমস্যাটা করজাল নিয়ে। মোট কর আদায়ের ৯০ শতাংশই শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। কেন জামালপুরের মানুষের কর আদায় ঠিকমতো হয় না, কেন অন্য অঞ্চলে রাজস্ব বোর্ড সক্রিয় হতে পারছে না। রাজস্ব খাতে আমাদের বেস্ট অফিসার প্রয়োজন, নইল শুধু ভবন করে লাভ নেই।’
