দেশের সড়কে এখন থেকে ৩৭৫ সিসি (ইঞ্জিন ক্ষমতা) পর্যন্ত দেশে উৎপাদিত মোটরসাইকেল চলাচল করতে পারবে। মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি দেশে উৎপাদিত ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল নিবন্ধনের অনুমতি দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। এতদিন সড়কে ১৬৫ সিসির ওপর মোটরসাইকেল চলাচলের অনুমতি ছিল না। তবে বাড়তি সিসির এই মোটরসাইকেলে মহাসড়কে দুর্ঘটনা বাড়ার শঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ।
দেশের সড়কে ঘটা দুর্ঘটনায় তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতি মাসে মোট দুর্ঘটনার ৩৮ থেকে ৪২ শতাংশ ঘটছে মোটরসাইকেলে। দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির গত সেপ্টেম্বর মাসের দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত মাসে ৪০২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৭ জন নিহত, ৬৫১ জন আহত হয়েছে। এই সময়ে ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৭২ জন নিহত ও ১০৭ জন আহত হয়েছে। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৮.০৫ শতাংশ, নিহতের ৪২.৭৮ শতাংশ ও আহতের ২৬.৬১ শতাংশ।
মহাসড়ক ব্যবহার করে মোটরসাইকেলে মাঝেমধ্যে গ্রামের বাড়িতে যাতায়াত করেন শেখ শামীম। তিনি বলেন, ‘মোটরসাইকেল মূলত মধ্যবিত্তের একটি বাহন। আর নতুন যে সিসির মোটরসাইকেল বাজারে আসবে সেগুলো মূলত চালাবে ধনীরা। এসব মোটরসাইকেল অধিক সিসির হওয়ায় যারা চালাবে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে সড়কে। তাছাড়া মহাসড়কের যে অবস্থা তখন পাল্লাপাল্লি করতে গিয়ে দুর্ঘটনা আরও বাড়ার শঙ্কা থেকে যাবে।’
একই ধরনের মত বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরীর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সংগঠনের দুর্ঘটনার প্রতিবেদনে দেখা যায় প্রতি মাসে মোট দুর্ঘটনার ৩৮ থেকে ৪২ শতাংশ ঘটছে মোটরসাইকেলে। এরই মধ্যে এত সিসির মোটরসাইকেল সড়কে নামানোর তো কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। আর গণপরিবহনকে প্রাধান্য না দিয়ে মোটরসাইকেলের সিসিকে এইভাবে উৎসাহ দেওয়ার জন্য সড়কে বিশৃঙ্খলা বেড়ে যাবে।’
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামানও বেশি ক্ষমতার মোটসাইকেল সড়কে নামানোর পক্ষে নন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এত সিসির মোটসাইকেল মানুষ কোথায় চালাবে? সিটিতে পিক-আওয়ারে গতি থাকে ৫ কিলোমিটার। আর দেশের মহাসড়ক অন্য দেশের মহাসড়কের মতো আধুনিক মানের নয়। আলাদা করে মোটরসাইকেলের কোনো লেনও নেই। পশ্চিমা দেশের অনেক গবেষণায় দেখা যায়, সিসি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে থাকে। সেই হিসাবে আমাদের দেশের জন্য এই ৩৭৫ সিসির মোটসাইকেলে মহাসড়কে দুর্ঘটনা বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাপানের মতো উন্নত দেশে ১২৫ থেকে ১৫০ সিসির মোটসাইকেল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। জাপানে অধিক সিসির মোটসাইকেল তারা তৈরি করলেও সেগুলো অন্য দেশগুলোতে রপ্তানি করে। জাপানের মতো দেশের এত ভালো রাস্তায় সেখানে মাত্র ১৫ শতাংশ মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ক্ষমতা ২৫০ সিসির বেশি। অর্থাৎ ৮৫ শতাংশ ব্যবহারকারী ২৫০ সিসির কম মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। সেখানে আমাদের দেশের মতো জায়গায় যেখানে চালকরা কাউকে পরোয়া করে না। অনেক সময় বেপরোয়া গতিতে বাইক চালায়। সেই দিকগুলো বিবেচনায় এত সিসির মোটসাইকেলের অনুমোদনে দুর্ঘটনা বাড়ার শঙ্কা থেকে যাবে।’
