আল্লাহতায়ালা যুগে যুগে নবী-রাসুল পাঠিয়ে যুগোপযোগী জীবনবিধান দিয়েছেন মানুষের সঠিক দিকনির্দেশনার জন্য। আবার শেষ নবীর পর যুগে যুগে দেশে দেশে কিছু মহাপুরুষের জন্ম হয়েছে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে মানুষকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য। যাতে করে মানুষ কোরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবনযাপনের কথা শুনে ও বুঝে সেই অনুসারে জীবনযাপন করে দুনিয়ায় শান্তি ও আখেরাতে নিয়ামতভরা জান্নাত পেতে পারে।
আল্লামা শামছুদ্দীন কাসেমী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন বাংলাদেশের একজন সফল দাঈ ইলাল্লাহ। তিনি গ্রাম থেকে উঠে এসে শহর-বন্দর, দেশ ও আন্তর্জাতিকভাবে কোরআন মাজিদের সঠিক অর্থ ও ব্যাখ্যা জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন। যাবতীয় বাতিল মতবাদের বিরুদ্ধে মানুষের সামনে দৃপ্তচিত্তে কথা বলেছেন এবং মানুষকে আল্লাহর পানে ডেকেছেন এবং তাদের দরদভরা ভাষায় আল্লাহর দিকে আকৃষ্ট করেছেন। মানুষের মাঝে দ্বীনের আলো প্রজ্জ্বলিত রাখতে নবীর ওয়ারিস হিসেবে অসংখ্য ছাত্র রেখে গেছেন। যারা দ্বীনি দায়িত্ব দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। দায়িত্ব পালন করছেন বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসায়।
মানুষ যখন এক আল্লাহকেই একমাত্র ইলাহ ও রব মানে, তখন আর কাউকে পরোয়া করার প্রয়োজন পড়ে না। দ্বিধাহীনচিত্তে সত্য ও হক কথা বলা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়। মাওলানা কাসেমী (রহ.)-এর ক্ষেত্রে এ কথা শতভাগ প্রযোজ্য। মাওলানা কাসেমী (রহ.)-এর ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক, সামাজিক, দলীয়, দেশ এবং আন্তর্জাতিকভাবে নিজেকে মহান আল্লাহর সেরা জীব হিসেবে যেমন তুলে ধরেছেন এবং মানুষের অন্তরের গভীরে পৌঁছে গিয়ে তাদের আল্লাহর গোলাম বানানোর প্রচেষ্টা করে গেছেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-ব্যবহার মানুষের সঙ্গে অবাধে কথা বলা দিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের এক জ¦লন্ত প্রমাণ রেখে গেছেন। পারিবারিকভাবে স্ত্রী-সন্তান, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে অমায়িক ব্যবহারের মাধ্যমে আল্লাহর গোলাম হিসেবে উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সৎ, যোগ্য, খোদাভীরু নেতৃত্ব খুবই প্রয়োজন। এ অভাব পূরণ করতে হবে আমাদেরই। সাময়িক সুযোগ-সুবিধা উপেক্ষা করে দুনিয়ার স্বার্থ পরিত্যাগ করে জনগণের স্বার্থ, ইসলামের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই আমাদের নেতা বাছাই করতে হবে যাতে করে দেশ ও জাতি উপকৃত হয়, আখেরাত আমাদের জন্য উন্মুক্ত হয়। এটাই ছিল আল্লামা শামছুদ্দীন কাসেমী (রহ.)-এর জীবন দর্শন। তার বর্ণাঢ্য জীবনী অল্প কথায় শেষ করা যাবে না।
আল্লামা শামছুদ্দীন কাসেমী (রহ.) হক্কানী আলেমদের অন্যতম। সৃষ্টিকর্তা দয়াময় আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অন্বেষণে যারা পার্থিব সকল প্রকার মোহ সার্বিকভাবে বিসর্জন দিয়েছেন, ইসলাম ও মানবতার কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, তিনি তাদেরই একজন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের নির্বাহী সভাপতি, জামিয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া আরজাবাদের রূপকার, খ্যাতিমান মুহতামিম, বহু মাদ্রাসা-মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ও পৃষ্ঠপোষক আল্লামা শামছুদ্দীন কাসেমী (রহ.) দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় এ দেশে ইসলামি শিক্ষা ও হকের আওয়াজকে উঁচু করার জন্য আন্দোলন ও সংগ্রামে নিয়োজিত ছিলেন। চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ থানার নিয়ামস্তি এলাকায় জন্ম নেওয়া এই বুজুর্গ দেশে পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে দারুল উলুম দেওবন্দ এবং পাকিস্তানের লাহোর গমন করেন। সেখান উচ্চশিক্ষা শেষে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত সোহাগী মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
এর পর পর্যায়ক্রমে ঢাকার বড় কাটারা মাদ্রাসা, ফরিদাবাদ মাদ্রাসা, যাত্রাবাড়ীর জামিয়া মাদানিয়া, চট্টগ্রামের শোলকবহর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শেষে ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে বিশিষ্ট মুরব্বি ও আলেমদের পরামর্শে আল্লামা কাসেমী (রহ.) পুনরায় ঢাকা চলে আসেন এবং আরজাবাদ মাদ্রাসার মোহতামিমের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অক্লান্ত পরিশ্রম-সাধনা ও অধ্যবসায় দ্বারা তিনি মাদ্রাসাটিকে দাওরায়ে হাদিস মানে উন্নীত করেন। এ ছাড়া তিনি এ প্রতিষ্ঠানের শায়খুল হাদিস হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
প্রাজ্ঞা ও বিচক্ষণ ইসলামি রাজনীতিবিদ হিসেবে তার ব্যাপক পরিচিতি আছে। তিনি কওমি মাদ্রাসাগুলাকে একটি সুনির্দিষ্ট প্ল্যাটফরমে নিয়ে আসার জন্য বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ‘বেফাক’ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। আল্লামা শামছুদ্দীন কাসেমী (রহ.) খতমে নবুওয়াত আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি পাকিস্তান আমল ও স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বহু ধর্মীয় প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। তিনি সাপ্তাহিক ‘জমিয়ত’ পত্রিকা ও মাসিক ‘পয়গামে হক’-এর প্রকাশক ও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। তার লেখা পুস্তকের মধ্যে বায়তুল মুকাদ্দাস ও মসজিদে আকসা, পাকিস্তানে খ্রিস্টান মিশনারি উৎপাত, রমজানের সওগাত, ইসলাম বনাম কমিউনিজম, ধর্ম নিরপেক্ষতা, শিয়া কাফের, কাদিয়ানী ধর্মমত ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দ্বীনি কারণে তিনি সৌদি আরব, ইরাক, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানসহ প্রভৃতি দেশ বহুবার সফর করেছেন, অংশ নিয়েছেন অনেক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে।
আগেই বলা হয়েছে, তার জীবনালেখ্য অল্প কথায় লিখে শেষ করা যাবে না, বাস্তবতাও তাই। ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষ ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে ১৯ অক্টোবর শনিবার রাত ৮টা পনেরো মিনিটে ৮ সন্তান, অসংখ্য ভক্ত, ছাত্র ও গুণগ্রাহীকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দেন। পরদিন মাদ্রাসার অনতিদূরে অবস্থিত ১নং ওয়ার্ড ঈদগাহ ময়দানে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। আল্লাহতায়ালা তার কবরকে জান্নাতের বাগানে পরিণত করুন।
