মরে ভেসে উঠল খানজাহান আলীর মাজারের কুমির

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৩, ০৮:৪৮ পিএম

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) মাজারের দীঘির মিঠা পানির কুমিরের মৃত্যু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে মাজারের দীঘির দক্ষিণ পশ্চিম পাড়ে কুমিরের মৃতদেহ ভাসতে দেখা যায়। বিকেল পাঁচটার দিকে স্থানীয়দের নিয়ে পানি থেকে কুমিরটি ওপরে তুলে আনে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।

কুমিরটির বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করে তা ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকার ফরেনসিকে পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে তারা।

মাজার দীঘির পাড়ে যুগযুগ ধরে বসবাস করা খাদেমরাই কুমিরগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছে। দর্শনার্থীদের দীঘির কুমির দেখিয়ে স্থানীয় খাদেমরা আয়-রোজগার করে থাকেন। মাজারের দীঘির পুরুষ কুমির মারা যাওয়ায় আরেকটি নারী কুমির অবশিষ্ট থাকল।

মাজারের প্রধান খাদেম শের আলী ফকির বলেন, ২০০৫ সালে বিলুপ্তি ঠেকাতে মিঠা পানির ছয়টি কুমির ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে এনে দীঘিতে ছাড়া হয়। এই কুমিরগুলো ছিল হিংস্র স্বভাবের। নিজেদের মধ্যে মারামারির কারণে দুটি ‍কুমিরের মৃত্যু হয়। দুটি সরিয়ে সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণি প্রজনন কেন্দ্রে নেওয়া হয়। বাকি দুটি দীঘিতেই বসবাস করছিল। এই দুটির একটি পুরুষ, একটি নারী।

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার দুপুরে পুরুষ কুমিরটির মৃতদেহ দীঘির দক্ষিণ পশ্চিম পাড়ের মোস্তফা ফকিরের ঘাটের অদূরে ভাসতে দেখা যায়। কবে কখন কুমিরটি মারা গেছে বলতে পারব না, তবে গত সাতদিন ধরে ওই পাড়ের খাদেম মোস্তফা ফকিরের নিয়ন্ত্রণে ছিল কুমিরটি। মোস্তফা এই কুমিরটিকে তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আটকে রাখেন। বারবার বলার পরেও সে কুমিরটির নিয়ন্ত্রণ ছাড়েনি। তিনি কুমিরটিকে আটকে রেখে মাজারের আসা দর্শনার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে আসছিলেন বলে অভিযোগ প্রধান খাদেমের।

খাদেম আরও বলেন, এই মাজারের দীঘির কুমির দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসেন। খাদেম মোস্তফার জন্য অন্য খাদেমরা কেন সমস্যায় পড়বে। এটা আমরা মেনে নেব না। তিনি এই ঘটনা সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রশাসনের কাছে মোস্তফার বিচার দাবি করেন।

ঘাটে আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করে মোস্তফা ফকিরের স্ত্রী সাকিলা বেগম বলেন, সদ্য নাতি হওয়ায় গত প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তারা সবাই হাসপাতালে। বৃহস্পতিবার দুপুরে কুমির মারা যাওয়ার খবর পাই। এই দীঘির কুমিরটি আমাদের ঘাটে থাকত। আমার স্বামী খাদেম মোস্তফা কুমিরটিকে খাবার দিত, খাবার খেয়ে আবার কুমিরটি দীঘিতে চলে যেত। কুমিরটি মৃত্যু কেন হল তা বলতে পারব না।

স্থানীয় বাসিন্দা বীনা বেগম বলেন, কয়েকশ’ বছরের মাজার দীঘির ঐতিহ্য হচ্ছে মিঠা পানির এই কুমির। এখানে হযরত খানজাহানের আমলের বংশধর ছিল কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়। কুমির দেখতে হাজার হাজার দর্শনার্থী এখানে আসেন। কালাপাহাড় ধলাপাহাড় বেঁচে থাকতে মিঠা পানির কুমিরের বিলুপ্তি ঠেকাতে ভারতের মাদ্রাজ থেকে কুমির ছাড়া হয়। ছিল দুটি কুমির তার একটি মারা গেল। এই দীঘির ঐতিহ্য ধরে রাখতে নতুন করে আরো কুমির ছাড়ার দাবি জানান তিনি।

বাগেরহাট প্রাণিসম্পদ বিভাগের ভেটেরিনারী কর্মকর্তা মনোহর চন্দ্র মন্ডল বলেন, বিকেলে স্থানীয়দের সহযোগিতায় দীঘির পানি থেকে মারা যাওয়া কুমিরটি তোলা হয়েছে। মারা যাওয়া কুমিরটি পুরুষ। মৃতদেহ দেখে ধারণা করছি, অন্তত ৬০ ঘণ্টা আগে কুমিরটির মৃত্যু হয়। কুমিরটির দৈর্ঘ্য ১২ ফুট। বয়স আনুমানিক ৪৫ বছর। কুমিরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করে তা ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকার ফরেনসিকে পাঠানো হচ্ছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আসার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।

বাগেরহাট সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে এম আজিজুল ইসলাম বলেন, মাজারের দীঘিতে থাকা একটি কুমির ভেসে ওঠার খবর পেয়ে এখানে আসি। কুমিরটির মৃত্যু নিয়ে স্থানীয় খাদেমরা বিচার দাবি করেছেন। প্রাণিসম্পদ বিভাগ কুমিরটির ময়নাতদন্ত করবে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রসঙ্গত. মিঠা পানির প্রজাতির বিলুপ্তি ঠেকাতে ২০০৫ সালে ভারতের মাদ্রাজের ক্রোকোডাইল ব্যাঙ্ক থেকে ছয়টি কুমির এনে দীঘিতে ছাড়ে সরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত