মাতৃত্বকালীন ভাতার টাকাতেও লোভ

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৩, ১০:১৪ পিএম

মূলত একটি দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর নির্ভর করে অসচ্ছল নারীদের কী পরিমাণ অর্থ ভাতা হিসেবে প্রদান করা হবে। মাতৃত্বকালীন ভাতা বাংলাদেশে মাসিক ৮০০ টাকা হারে ৬ মাস অন্তর মায়েরা ভাতা পান ৩৬ মাস বা ৩ বছর। অর্থাভাবে শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশ যাতে ব্যাহত না হয়, তারই ধারাবাহিকতায় সরকার গর্ভবতী মায়ের জন্য ভাতা প্রদানের প্রচলন করে। এই ধরনের মায়েদের ভাতার পরিমাণ ও সময় বৃদ্ধির একটা কারণ রয়েছে। বর্তমানে যে হারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে প্রায় অসচ্ছল মায়েরাই এর ভুক্তভোগী। যদিও টাকার পরিমাণ সামান্য, তবু তার অঙ্ক এবং সময়সীমা নিম্ন আয়ের মায়েদের উপকারে আসবে। এরপরও কথা থাকে, মাতৃত্বকালীন ভাতা ও এর সময়সীমা আরেকটু বৃদ্ধি করা দরকার। কারণ বর্তমানে সাধারণভাবে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে হলেও, একটা ন্যূনতম অর্থের দরকার। সে বিষয়ে অবশ্যই সরকারের ভাবনার অবকাশ রয়েছে।

আশার কথা, বর্তমানে ভাতা পাওয়ার সময় আরও ১ বছর বাড়িয়ে ৪৮ মাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০২২ সালে মাতৃ এবং শিশু সহায়তা দুটি কর্মসূচিকে (দরিদ্র মায়ের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা এবং শহর অঞ্চলের কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাতৃভাতা) একত্র করে মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি (এমসিবিপি) চালু করে। সন্দেহ নেই, এই উদ্যোগের ফলে কর্মজীবী দরিদ্র মায়েদের কিছুটা হলেও কষ্ট লাঘব হবে। এ বিষয়ে শুক্রবার দেশ রূপান্তরে ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা ও সময় বাড়ছে’ প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ১০৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে মা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) অনুমোদনের পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) উত্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের এই কর্মসূচি প্রায় ১২ লাখ সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের গর্ভবতী নারীদের এবং অনূর্ধ্ব চার বছর বয়সী শিশুদের মায়েদের জন্য মাসিক ৮০০ টাকা দিয়ে আসছে। আবেদনকারীরা অনলাইনে নিজেদের নিবন্ধন করতে পারেন। ভাতা প্রতি মাসে সরাসরি তাদের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়।

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর বলছে, মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচিটিতে অন-ডিমান্ড তালিকাভুক্তি এবং নিয়মিত ইলেকট্রনিক পেমেন্টের সুবিধা রয়েছে, কিন্তু দেশব্যাপী সব সুবিধাভোগী এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত নয়। গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে মাত্র ৩৬ মাস পর্যন্ত যে ভাতা দেওয়া হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। তা ছাড়া, মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য ও সুরক্ষার জন্য পরিষেবা প্রদানকারীদের (স্বাস্থ্য পরিকল্পনা, পুষ্টি এবং জন্মনিবন্ধন) সঙ্গে সমন্বয়ের কিছুটা অভাব রয়েছে এবং মা-শিশুর পুষ্টি ও প্রয়োজনীয় সেবা এবং বিকাশ সম্পর্কিত সামাজিক এবং আচরণ পরিবর্তনজনিত কাউন্সেলিংয়ের (এসবিসিসি) গুণগতমান উন্নয়ন ও বিস্তৃতির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ‘সাপোর্টিং ইমপ্লিমেন্টেশন অব দ্য মাদার অ্যান্ড চাইল্ড বেনিফিট প্রোগ্রাম’ শীর্ষক প্রকল্পটি প্রাক্কলিত ব্যয় ১০৬ কোটি ৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন মাত্র ১৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ বা ১৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। বাকি ৮৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দিচ্ছে বিশ^ব্যাংকের আইডিএ প্রোগ্রাম। অর্থাৎ প্রকল্পের ৮২ দশমিক ৪২ শতাংশই আসবে এ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে।

প্রকল্প ব্যয়ের বড় অংশই খরচ হবে কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণকে কেন্দ্র করে। এ খাতের ৩ হাজার ৯১৩টি প্রশিক্ষণের জন্য ব্যয় হবে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা, যা প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৪৫ শতাংশের বেশি। যেসব গর্ভবতী মা ভাতা ও প্রশিক্ষণের আওতায় আসবেন, তাদের সামাজিক আচরণ পরিবর্তনের জন্য কাউন্সেলিং (এসবিসিসি) সেশন পরিচালনাকারী সরকারি রিসোর্স পুলের ব্যক্তিদের সম্মানী ভাতাতেই যাবে ১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ৯ পরামর্শকের বেতন বাবদ ১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা খরচ করা হবে, যা প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ১২ শতাংশ। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে আর গ্রামপর্যায়ে মাঠ কর্মীদের কী দোষ? অভিযোগ রয়েছে, মাতৃত্বকালীন ভাতার কার্ড বিতরণে চলছে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং স্বজনপ্রীতি। বিশেষ করে গর্ভবর্তী মায়েদের ভাতার কার্ড বিতরণ করার সময়, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপজেলা কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন তাদের কাছ থেকে মাত্র ১০০ টাকা করে আদায় করছেন! আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত