দ্রুত উত্থান দ্রুত পতনেই শেষ ঘূর্ণিঝড় ‘হামুন’

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৩, ০৬:২৩ এএম

সাগরে শক্তি হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে ঘূর্ণিঝড় ‘হামুন’। ঘূর্ণিঝড়টি মধ্যরাতেই উপকূল অতিক্রম করেছে। তার আগে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়টি সাধারণ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১টায় ঘণ্টায় ১৩০ কিলোমিটার গতির ‘হামুন’ বিকেল সাড়ে ৪টায় ১১০ কিলোমিটারে নেমে আসে। সন্ধ্যার দিকে ঘূর্ণিঝড়ের মূল অংশ কুতুবদিয়া হয়ে উপকূল অতিক্রম করতে শুরু করে। মধ্যরাতে তা ঘণ্টায় ৬২ থেকে ৮৮ কিলোমিটারে নেমে আসে। ঘূর্ণিঝড়টি উপকূল অতিক্রমের সময় গাছ উপড়ে ও দেয়াল ধসে কক্সবাজারে তিনজন নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

এর আগে বিকেল সাড়ে ৪টায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১২ নম্বর বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড়টি সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলের মধ্যবর্তী এলাকা দিয়ে ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার থেকে সর্বোচ্চ ১১০ কিলোমিটার গতিতে অতিক্রম করবে। এ সময় উপকূলীয় এলাকায় সাধারণ জোয়ারের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ ফুট উচ্চতার বেশি জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। এজন্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৭ নম্বর বিপদসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ৫ নম্বর বিপদসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। তবে সন্ধ্যা ৭টার ১৩ নম্বর বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড়টি পরবর্তী ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার মধ্যে কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূল অতিক্রম করবে। এ সময় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা গতিবেগ ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ দুপুর ১টায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১১ নম্বর বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছিল, ঘূর্ণিঝড়টি অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে গতিবেগ ঘণ্টায় ১২০ থেকে সর্বোচ্চ ১৩০ কিলোমিটার গতিতে এগোচ্ছে। আর এটি বুধবার সকালে মেঘনা মোহনার ভোলার কাছ দিয়ে উপকূল অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু সাড়ে তিন ঘণ্টা পর বিকেল সাড়ে ৪টায় ১২ নম্বর বুলেটিনে তা প্রায় ১২ ঘণ্টা (বুধবার সন্ধ্যা ৬টা, আগে ছিল বুধবার সকালে) এগিয়ে গেল এবং গতিপথও প্রায় ১০০ কিলোমিটার নিচে (দক্ষিণে) চট্টগ্রাম-কক্সবাজার উপকূলের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টার মধ্যে অতিক্রম করবে বলা হয়। অন্যদিকে ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর ও সার্ক আঞ্চলিক আবহাওয়া সেন্টারের বুলেটিনে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়টি বুধবার সকালে অতিক্রম করার কথা। দুটি সংস্থার বুলেটিনে এত পার্থক্য কেন? এ প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়টি দ্রুত উত্থান হয়েছে এবং আবার দ্রুত পতন হয়েছে। অর্থাৎ হঠাৎ এর গতিবেগ বেড়ে গিয়েছিল কিন্তু পরবর্তীকালে দুপুরের পর এর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যায় এবং সাগরে তা শক্তি হারিয়ে ফেলে। ফলে প্রবল ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলে সাধারণ ঘূর্ণিঝড় আকারে আঘাত করে। তবে মধ্যরাতে যখন আঘাত করবে তখন গতিবেগ ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত নেমে আসতে পারে।’

ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর, বিশ^ আবহওয়া সংস্থার আঞ্চলিক স্টেশনের সঙ্গে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বুলেটিনের এত পার্থক্য কেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা সবার বুলেটিন বিশ্লেষণ করে আমাদের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বুলেটিন প্রকাশ করেছি। তাই আমাদেরটা ঠিক আছে।’

কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ের সিগন্যাল দ্রুত বাড়ানো হয়েছে। গতকাল সকাল ৬টায় ৮ নম্বর বিশেষ বুলেটিনে দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর জন্য ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তারপর সকাল সাড়ে ৯টার বুলেটিনে তা ৭ নম্বর বিপদসংকেতে নিয়ে আসা হয়। এর আগে গত সোমবার সন্ধ্যা ৬টায় গভীর নিম্নচাপটিকে ঘূর্ণিঝড়ে ঘোষণা দেওয়া হয়। আর সোমবার দুপুর ১টায় ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল গভীর নিম্নচাপ। লঘুচাপ, নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড় ঘোষণা এবং সতর্ক সংকেতগুলো দ্রুত দেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘এটা ঠিক এবারের ঝড়টি অনেকটা ব্যতিক্রম ছিল। তাই হয়তো এমন হয়েছে।’

তবে আবহাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা একাধিক আবহাওয়াবিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় হামুন গভীর বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘসময় লঘুচাপ আকারে অবস্থান করছিল। লঘুচাপটি উপকূলের কাছাকাছি আসার পর হঠাৎ করে শক্তিশালী হয়ে যায়, আবার শক্তিশালী হওয়ার পর ফের শক্তি হারিয়েও ফেলে।

এ বিষয়ে কথা হয় ন্যাশনাল ওশেনোগ্রাফিক অ্যান্ড মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. মোহন কুমার দাশের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এবারের ঘূর্ণিঝড়টির প্রকৃতি একটু ভিন্ন। দীর্ঘসময় গভীর সাগরে থাকলেও ঘূর্ণিঝড় হিসেবে রূপ নিয়েছে উপকূলের কাছাকাছি এসে। তবে ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলে আঘাতের সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর কিংবা বিশ^ আবহাওয়া সংস্থার আঞ্চলিক স্টেশনের মধ্যে বড়জোর কয়েক ঘণ্টা এদিক-সেদিক হতে পারে। কিন্তু এ ঝড়ের ক্ষেত্রে ৬ থেকে ১২ ঘণ্টা পার্থক্য হয়ে গেল। এটাই ভাবনার বিষয়।’

তবে আবহাওয়াবিষয়ক উইন্ডি মডেল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড়টি বুধবার সকাল ৯টার মধ্যে চট্টগ্রামের অনেক নিচে (সাগরে) থাকতেই তা প্রায় বিলীন হয়ে যাবে। সাধারণ ঘূর্ণিঝড় আকারে তা কক্সবাজারের কুতুবদিয়া ও পেকুয়ার মধ্যবর্তী এলাকা দিয়ে উপকূলে প্রবেশ করবে। এ সময় প্রচুর বর্ষণ হতে পারে। একই পূর্বাভাস কিন্তু দিয়েছে ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বিশ^ আবহাওয়া সংস্থার আঞ্চলিক কেন্দ্র। অন্যদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর ১৩ নম্বর বিশেষ বুলেটিনে (মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায়) আবার বলেছে পরবর্তী ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার মধ্যে ঝড়টি উপকূল অতিক্রম করবে। সে হিসাবে রাত ৩টা পর্যন্ত সময় লাগছে।

এ বুলেটিনটির তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড়টি গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম থেকে ১৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার থেকে ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা থেকে ২২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা থেকে ১৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। এটি উত্তর-পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমেই দুর্বল হয়ে ঘূর্ণিঝড় আকারে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে উপকূল অতিক্রম করবে। এজন্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে ৭ নম্বর বিপদসংকেত এবং মোংলা ও পায়রাকে ৫ নম্বর বিপদসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে পাঁচ ফুট উচ্চতার বেশি জলোচ্ছ্বাস হতে পারে।

চট্টগ্রাম উপকূলে কী অবস্থা : সন্ধ্যা ৬টার দিকে বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাটে উপস্থিত থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাগর পুরোপুরি শান্ত। তখন ভাটা চলছিল। তবে উপকূলে বৃষ্টি হচ্ছিল। অন্যদিকে সন্ধ্যা ৭টায় বাঁশখালী উপকূলের একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানেও কোনো বাতাসের প্রবাহ নেই। সাগর পুরোপুরি শান্ত। তবে বৃষ্টি হচ্ছিল। কিন্তু আবহাওয়া অধিদপ্তরের বুলেটিন বলছে, সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৯টার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের মূল কেন্দ্র চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে উপকূল অতিক্রম করবে। তবে উপকূলে এর কোনো প্রভাব দেখা যায়নি।

কক্সবাজারে ৩ জন নিহত : গতকাল সন্ধ্যা ৭টার পরপরই কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানে হামুন। স্থানীয় কাউন্সিলর ওসমান সরওয়ার টিপু জানান, কক্সবাজার শহরে দেয়াল ধসে একজন এবং মহেশখালী ও চকরিয়ায় গাছচাপায় দুজন নিহত হয়েছেন।

আমাদের কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, কক্সবাজারে মারা গেছেন পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুল খালেক (৩৮)। অন্যদিকে মহেশখালী উপজেলার বড় মহেশখালী ইউনিয়নের মুন্সির ডেইল গ্রামে হারাধন নামে একজনের মৃত্যু হয়। চকরিয়া উপজেলার বদরখালীতে আসকর আলী নামে আরেকজন মারা গেছেন।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বেশ কিছু গাছপালা ভেঙে পড়েছে। তবে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত