সম্প্রীতির আহ্বান, অসুর ও অশুভ শক্তির বিনাশ আর দেশ ও মানুষের কল্যাণ প্রার্থনায় শেষ হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। গতকাল মঙ্গলবার বিজয়া দশমীর দিনে দর্পণ বিসর্জন ও প্রতিমা নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনের এ উৎসবের সমাপ্তি হয়।
সারা দেশে ৩২ হাজারের বেশি পূজামন্ডপে দেবীকে বিদায়ের হাহাকার একই সঙ্গে আসছে বছরে আবারও দেবীকে পূজা আর আরাধনার আকুতি ছিল ভক্তদের মধ্যে। গতকাল বিজয়া দশমীর দিনেও পূজামন্ডপগুলোতে মানুষের ভিড় ছিল। সকালে দশমী বিহিত পূজা শেষে দর্পণ বিসর্জন হয়। এরপর বিকেলে প্রতিমা নিরঞ্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সব আনুষ্ঠানিকতা।
এর আগে গত ১৪ অক্টোবর মহালয়ার দিনে দেবীর আবাহন ও আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের পুণ্যলগ্ন শুরু হয়। এরপর গত শুক্রবার ষষ্ঠী তিথিতে বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস ও পূজার্চনার মধ্য দিয়ে সূচনা হয় উৎসবের। এরপর শনিবার মহাসপ্তমী, রবিবার মহাষ্টমী ও কুমারীপূজা এবং সোমবার মহানবমী এবং মঙ্গলবার উদযাপিত হয় মহানবমী। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের হিসাবে এবার রাজধানীসহ সারা দেশে ৩২ হাজার ৪০৮টি স্থায়ী ও অস্থায়ী মন্ডপে দুর্গাপূজা হয়েছে। রাজধানীতে হয়েছে ২৪৪টি মন্ডপে।
শুভ বিজয়া দশমীতে রাজধানীর ঢাকেশ^রী জাতীয় মন্দিরসহ দেশ জুড়ে প্রতিটি পূজাম-প ধর্মীয় আচারের পাশাপাশি নানা আনন্দ আয়োজনে মুখর ছিল। ঢাকেশ^রীতে সকালে দশমী বিহিত পূজা, দেশ, জাতির কল্যাণ ও অশুভ শক্তির বিনাশ কামনায় প্রার্থনা, দর্পণ বিসর্জন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বিকেলে শোভাযাত্রাসহযোগে বুড়িগঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন শেষ হয়।
রাজধানীর বুড়িগঙ্গা, সদরঘাটের ওয়াইজঘাট, পুরান ঢাকার পোস্তগোলার শ্মশানঘাট ও লালকুঠির ঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় যেখানে প্রতিমা বিসর্জন করা হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে।
বিকেল সাড়ে ৩টায় বুড়িগঙ্গার বীণাস্মৃতি স্নানঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দেয় পূজা উদযাপন কমিটি। এর মাধ্যমে দেবীকে বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এ সময় সেখানে মন্ত্রপাঠ করতে দেখা যায় পুরোহিতদের। সময় গড়ার সঙ্গে সঙ্গে রায়সাহেব বাজার থেকে সদরঘাট পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে ঢাকার বিভিন্ন মণ্ডপের প্রতিমা সদরঘাট আসতে থাকে এবং ঢাকের বাদ্য আর গান-বাজনাসহকারে সারিবদ্ধভাবে একে একে বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রতিমা বিসর্জন হতে থাকে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, ঢাকেশ্বরী থেকে শুরু করে প্রতিমা বিসর্জনযাত্রা শহীদ মিনার, হাইকোর্ট, পুলিশ হেডকোয়ার্টার, গোলাপ শাহ মাজার, কোর্ট এলাকা হয়ে সদরঘাট পৌঁছায়।
বিভিন্ন ঘাটে রাত ১২টা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ২৪৪টি মণ্ডপের প্রতিমা একে একে বিসর্জন দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ।
পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা, র্যাব ও আনসার বাহিনী, কোস্টগার্ডের ডুবুরি দল, ফায়ার সার্ভিস ও নৌ-পুলিশ কঠোর নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসব পালন করেছে নগরবাসী। বিসর্জনেও বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, আজ বুধবার পর্যন্ত দেশব্যাপী পূজাম-পগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দেশের অন্যান্য বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা ও গ্রামপর্যায়ে আয়োজকদের নিজ নিজ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতায় প্রতিমা বিসর্জন হয়।
আমাদের কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে দুই শতাধিক প্রতিমা বিসর্জন দিয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভক্ত-পুণ্যার্থীরা।
খুলনার ডুমুরিয়া থেকে আসা পর্যটক বাবু ম-ল বলেন, ‘পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দুদিন আগে কক্সবাজার এসেছি বিসর্জন দেখার জন্য।’
স্থানীয় মংসেন রাখাইন বলেন, ‘এটা আমাদের ধর্মীয় উৎসব না হলেও লাখো মানুষের সমাগম আর ভক্তদের শেষ মুহূর্তের প্রার্থনা দেখতে এসেছি।’
কক্সবাজার জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ আয়োজিত বিসর্জনের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়াসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য, পৌর মেয়র রাজনৈতিক নেতা, জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
