সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়

প্রধান সহকারীর ঘুষ লাখে দশমিক ৩ শতাংশ!

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৩, ০২:৫১ এএম

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় যেন ঘুষ-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেন ছাড়া এই অফিসে রেজিস্ট্রি হয় না কোনো দলিল। এছাড়া অফিস খরচের নামে আলাদাভাবে ঘুষ নেন কার্যালয়ের প্রধান সহকারী দিদারুল আলম। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দলিল নিবন্ধনে প্রতি লাখে দশমিক ৩ শতাংশ ঘুষ দিতে হয় তাকে। হেবা, দানপত্র, অংশনামা ও অসিয়তনামা নিবন্ধনে ঘুষ নেওয়া হয় মৌখিক চুক্তিতে। ঘুষের বড় একটি অংশ পান সাব-রেজিস্ট্রার পারভীন আক্তার। তার হয়ে দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম করে যাচ্ছেন কার্যালয়ের প্রধান সহকারী দিদারুল আলম। সম্প্রতি এই দিদারুল আলমের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর সাব-রেজিস্ট্রারের অনুপস্থিতিতে ২০টি দলিল নিবন্ধন করেছেন দিদারুল। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর গতকাল বুধবার (২৫ অক্টোবর) সকালে হাটহাজারী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয় পরিদর্শনে যান চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার মিশন চাকমা।

জানতে চাইলে মিশন চাকমা বলেন, ‘প্রধান সহকারী দিদারুল আলমের বিরুদ্ধে সাব-রেজিস্ট্রারের অনুপস্থিতিতে গত ১৫ অক্টোবর একাধিক দলিল রেজিস্ট্রির অভিযোগ পেয়েছি। আমি সশরীরে আজ সকালে হাটহাজারী সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে গিয়ে ১৫ অক্টোবর সম্পাদিত দেখানো পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, হেবা ঘোষণা, দানপত্র, সাফ কবলাসহ অন্তত ২০টি দলিল জব্দ করেছি। এসব দলিলে সাব-রেজিস্ট্রার পারভীন আক্তারের অনুস্বাক্ষর আছে। কমিশনে নেওয়া একটি দলিলে সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর আছে। তার (সাব-রেজিস্ট্রার) অনুপস্থিতিতে দলিল নিবন্ধনের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছি। আগামী রবিবারের মধ্যে দিদারুল আলমকে সাময়িক বরখাস্ত করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ 

জানা গেছে, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা একটি মামলায় গত ১৮ অক্টোবর থেকে সিলেট কারাগারে বন্দি আছেন হাটহাজারী উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার পারভীন আক্তার। এর আগে গত ১৬ অক্টোবর জেলা রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে ছুটি নেন তিনি। কিন্তু তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ১৫ অক্টোবর সকাল ৭টা ৩৭ মিনিট থেকে রাত ১০টা ৪১ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড পর্যন্ত পারভীন আক্তারের অবস্থান ছিল ঢাকার একটি আবাসিক এলাকায়। পরের দিন ১৬ অক্টোবর সকাল ৯টা ১০ মিনিট ১২ সেকেন্ডে তার অবস্থান পাওয়া যায় সিলেটের সুরমা টাওয়ারে।

অভিযোগের বিষয়ে প্রধান সহকারী দিদারুলের বক্তব্য জানতে গতকাল বেলা ১টার দিকে হাটহাজারী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে যান এই প্রতিবেদক। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। সাব-রেজিস্ট্রারের এজলাসের সামনে বসে ছিলেন দুই কর্মচারী। এজলাসের পশ্চিম পাশের কক্ষে এক নারীসহ তিনজন নকলনবিশ কাজ করছিলেন। ১৫ অক্টোবর রেজিস্ট্রি হওয়া দলিলের টোকেন বই দেখতে চাইলে তাদের একজন পরিচয় গোপন রেখে বলেন, ‘বড় মিয়া (দিদারুল আলম) সব কিছু আলমারিতে তালা মেরে রেখেছেন। তিনি ঠিকমতো অফিসে আসছেন না। তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’

এরপর এই প্রতিবেদক একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল দিলেও রিসিভ করেননি দিদারুল আলম। 

জানা গেছে, দুর্নীতি-অনিয়মের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গত সোমবার থেকে নিয়মিত অফিসে আসছেন না প্রধান সহকারী দিদারুল আলম। অন্যদিকে গত ১৬ অক্টোবর থেকে সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় বিপাকে পড়েছেন সেবাপ্রার্থীরা। গতকাল দুপুরে সরেজমিনে হাটহাজারী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে গিয়ে শুনশান নীরবতা দেখা গেছে। অনেকেই দলিল রেজিস্ট্রি করতে এসে কাউকে না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। আহমদ উল্লাহ নামে এক যুবক বলেন, ‘আমার একটা দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর। সেটির নকল নিতে গত তিন দিন ধরে আসছি। কিন্তু অফিসে কাউকে পাচ্ছি না।’

আরেক ভুক্তভোগী হাটহাজারী উপজেলার চারিয়া এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহিম। তিনি বলেন, ‘জমি বিক্রি করে ছেলেকে বিদেশ পাঠাব। এক ব্যক্তির সঙ্গে বায়না করেছি। কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রার না থাকায় জমি বিক্রি করতে পারছি না। কবে সাব-রেজিস্ট্রার আসবেন তা-ও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।’

জানা গেছে, হাটহাজারী সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে অসাধু দলিল লেখকদের যোগসাজশে মোটা অঙ্কের ঘুষের মাধ্যমে চলছে দলিল রেজিস্ট্রির কাজ। এতে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন জমির ক্রেতা-বিক্রেতারা। সরকারি কর আদায়ের নামে প্রতিদিন হাতিয়ে  নেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকা। গত ৮ অক্টোবর উপজেলার দক্ষিণ পাহাড়তলী মৌজার দুই শতাংশ জমি আবুল মনছুর নামের এক ব্যক্তিকে রেজিস্ট্রি করে দেন দুবাই প্রবাসী ফতেয়াবাদ এলাকার বাসিন্দা নাজিম উদ্দিন। প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকার দলিল নিবন্ধন করতে প্রধান সহকারী দিদারুলকে তিন হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে বলে দাবি করেন নাজিম উদ্দিন। এছাড়া সাব-রেজিস্ট্রার পারভীন আক্তারের বিরুদ্ধে সরকার নির্ধারিত রাজস্ব ফাঁকি দিতে জমির শ্রেণি পরিবর্তন, প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য বা মৌজা মূল্য কম দেখিয়ে বিভিন্ন দলিল রেজিস্ট্রির অভিযোগও আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত