হঠাৎ জামায়াতের সমাবেশে সন্দেহ অবিশ্বাস

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২৩, ১০:০৪ পিএম

রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে দলীয় নেতাকর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের দৃষ্টি আজ ঢাকায়। কয়েক দিন ধরেই ২৮ অক্টোবর ঘিরে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। একই দিনে রাজধানীতে স্বল্প দূরত্বে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও মাঠের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি পাল্টাপাল্টি সমাবেশের ডাক দেওয়ায় রাজনীতিতে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর পাশাপাশি বিএনপির জোটসঙ্গী যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলো প্রেসক্লাব, পল্টন, বিজয়নগরসহ কয়েকটি পয়েন্টে সমাবেশ করবে। এখানেই শেষ নয়, জামায়াতে ইসলামী মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশের ডাক দেওয়ায় উত্তপ্ত রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। দলটি যুগপৎ আন্দোলনের আগে একই দিন মাঠে না থাকলেও, এই প্রথম মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। একেবারে কাছাকাছি স্থানে লাখ লাখ লোকের সমাগম নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাজ করছে। ফলে দেশের সব শ্রেণি-পেশার নানা বয়সী রাজনীতিসচেতন মানুষের মধ্যে একটাই প্রশ্নকী ঘটতে যাচ্ছে আজ? দেশের ইতিহাসে ২৮ অক্টোবর এমনিতেই একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিন। সেবার ২৮ অক্টোবর সামনে রেখে ঢাকা শহরে ছিল টানটান উত্তেজনা। আওয়ামী লীগ পল্টনে সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে এবং নেতাকর্মীদের লগি-বৈঠা নিয়ে আসতে বলে। বিএনপি ওই দিন নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে ও জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশের কর্মসূচি নেয়। এমন প্রেক্ষাপটে ঢাকা মহানগর পুলিশ পল্টন ময়দান ও আশপাশের এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকায় প্রায় ১৫ হাজারের মতো পুলিশ মোতায়েন করে। তারপরও সংঘাত থামেনি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয় বায়তুল মোকাররম এলাকায়। এতে জামায়াত-শিবিরের চার কর্মী ও ওয়ার্কার্স পার্টির এক কর্মী মারা যান। ওই দিন সারা দেশে নিহত হন ১১ জন।

২৮ অক্টোবর ঘিরে ফের দুপক্ষ মুখোমুখি। জনমনে নানা জল্পনা চলছে। কী হবে ২৮ অক্টোবর? কেন বিএনপি ২৮ অক্টোবরকে বেছে নিল? মাঠে না থাকা জামায়াত হঠাৎ করে কেন সমাবেশের ঘোষণা দিল? ১৭ বছর আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে কি এবার? দেশের রাজনীতিতে কি আরেকটি ২৮ অক্টোবর ঘটবে নাকি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সমাবেশ শেষ করবে? আশঙ্কা রয়েছে, যে কোনো পক্ষ থেকে কোনো হঠকারী কিছু করা হলে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে যেতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর এই পাল্টাপাল্টি সমাবেশ সাধারণ মানুষের মধ্যেও এক প্রকার ভীতি সঞ্চার করছে। যদিও দৃশ্যপটে জামায়াত ছিল না। আলোচনায় ছিল ২৮ অক্টোবর হেফাজতে ইসলামের ওলামা সম্মেলন, কিন্তু হেফাজত তাদের ওলামা সম্মেলন ২৫ অক্টোবর শেষ করে জল্পনায় জল ঢেলেছে। যদিও সংবাদ মাধ্যমগুলো বেশ ফলাও করে, মুখরোচক নানা পরিবেশনায় প্রচার শুরু করেছিল, ২৮ অক্টোবর হেফাজতের ওলামা সম্মেলন আর বিএনপির সমাবেশের নানা যোগসূত্র। কিন্তু হেফাজতের ২৫ তারিখ ওলামা সম্মেলন করে ফেলায় বিএনপির সঙ্গে হেফাজতের যোগসূত্রের নানা সমীকরণ এখন তৈরি হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সম্মেলনকে ঘিরে।

২০১৩ সালের পর আলোচনার বাইরে থাকলেও চলতি বছরের ১০ জুন ঢাকায় সমাবেশ করে আবারও আলোচনায় আসে জামায়াত। প্রায় এক দশক ধরে অনেকটা ‘নিষিদ্ধ’ থাকার পর হঠাৎ জামায়াতকে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া নিয়ে নানা কথা বাজারে ডালপালা ছড়ায়। কেউ বলেন, এটি আগামী সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে ‘সমঝোতার’ সূত্রপাত, অনেকের অভিমতএই সমাবেশ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতির ‘সুফল।’ গুঞ্জন রয়েছে, সরকারের সঙ্গে জামায়াতের একটা ‘সন্ধি সন্ধি ভাব’ অনেক আগেই উড়ে গেছে। জামায়াতের যে অংশটি এই সন্ধিমূলক সম্পর্কের কারিগর তারা নিচুতলার বা মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের তোপের মুখে এই পরিকল্পনা ত্যাগ করেছেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে দমন ও নিপীড়ন সহ্য করে কোনোভাবে টিকে থাকাকে তারা রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে গ্রহণ করে এর ফসল ঘরে তুলতে চায়। এমতাবস্থায় দলটি যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসির সাজা, জেল-জুলুম ও হুলিয়ার মুখে ‘শেষের সম্ভাবনা’ বিনষ্ট করতে নারাজ। তাই তারা যে কোনো মূল্যে শাপলা চত্বর না হোক, আশপাশে সমাবেশ করবেই।

জামায়াতের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, গত বছরের ডিসেম্বরে বিএনপি ২০-দলীয় জোট ভেঙে দিলে তখন থেকেই দলটি মাঠে নামার সুযোগ খুঁজছিল। ভিসানীতি সে সুযোগ এনে দেয়। কিন্তু সরকারের দমননীতিতে এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। সামনে নির্বাচন, বিএনপি তাদের এড়িয়ে চলছে। জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখবে বলেই বিএনপি ২০ দল ভেঙে দিয়ে নতুন জোট গড়েছে। ফলে জামায়াত রাজনীতিতে অনেকটাই আলোচনার বাইরে চলে যায়। এরই মাঝে ‘রিস্ক’ জেনেও তারা কর্মসূচি দিয়েছে অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে। সরকার ও প্রশাসনের চাপে ১৪ বছর ধরে জামায়াত প্রকাশ্য রাজনীতিতে বা সাংগঠনিক কার্যক্রমে নেই। দলীয় কার্যালয়গুলো বন্ধ ২০১১ সাল থেকে। এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে অন্যরা সুযোগ নিচ্ছে বা সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কয়েক মাস আগেই জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব নীতিগত সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, ঝুঁকি নিয়ে হলেও তারা প্রকাশ্য তৎপরতা শুরু করবেন। এরই মহড়া আজকের সমাবেশ। জামায়াতের তরফে বলা হচ্ছে, আজকের সমাবেশ সফল করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে তারা। ইতিমধ্যে সংগঠন বিভাগ, মহানগর, নগর, থানা ও ইউনিটসহ সর্বস্তরে মিটিং করছে। প্রশাসন অনুমতি না দিলেও যে কোনো মূল্যে সমাবেশ বাস্তবায়ন করবে দলটি। মতিঝিল জায়গা না পেলেও তার আশপাশে যে কোনো জায়গায় নিজেদের শক্তি জানান দেবে। কারণ এটা তাদের কাছে অনেকটা প্রেস্টিজ ফাইট ইস্যু। জামায়াত সমাবেশের জন্য ডিএমপির কাছে সহযোগিতা চেয়ে যে আবেদন করেছে তা নাকচ করে দিয়েছে প্রশাসন। এর পরই গণমাধ্যমে বার্তা পাঠায় দলটি। বার্তায় জানায়, ‘জামায়াতে ইসলামী সাংবিধানিক অধিকার অনুযায়ী ২৮ অক্টোবর রাজধানী ঢাকা মহানগরীর শাপলা চত্বরে শান্তিপূর্ণ মহাসমাবেশ বাস্তবায়নে সহায়তা চেয়ে পুলিশ কমিশনারকে লিখিতভাবে জানিয়েছে। পুলিশের দায়িত্ব হলো শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা, বাধা দেওয়া নয়।’

রাজনৈতিক এই চাপান-উতোর নতুন কিছু নয়। কিন্তু সংঘাত আর রক্তপাত ভিন্ন হিসাব। জামায়াতের সমাবেশ করার ঘোষণা ও তাদের সমাবেশ করতে না দেওয়ার কথা এবং এর প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিক তর্কের বাইরে সংঘাতের ইঙ্গিতবাহী। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। জামায়াত যদি আজকের দিনটি ১৭ বছর আগের ঘটনার বদলা হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে সেটা হবে তাদের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এবার জামায়াতকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কী করবে? সেটাই দেখবে আজ দেশবাসী।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত