চিন্তা-চেতনায় অগ্রসর এক আলোকিত আলেম

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৩, ১০:৪৮ পিএম

চিন্তা-চেতনায় অগ্রসর আলেমদের একজন মাওলানা মুহাম্মাদ সালমান। দীনি ও সাধারণ ধারার শিক্ষার সফল সমন্বয়ক হিসেবে তিনি পরিচিত। উম্মাহর বহুমুখী কল্যাণে কাজ করা প্রবীণ এই আলেমের দীনি দরদ প্রবাদতুল্য। সময়ের দরকারি সব কাজের সঙ্গে তিনি নানাভাবে যুক্ত। একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে সবার শ্রদ্ধার পাত্র। মনীষী এই আলেমকে নিয়ে লিখেছেন জহির উদ্দিন বাবর

শিক্ষাবিদ, লেখক, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, দীনের দাই-এ ধরনের নানা অভিধা যুক্ত হতে পারে মাওলানা মুহাম্মাদ সালমানের নামের সঙ্গে। তবে তার সবচেয়ে বড় গুণ হলো, তিনি সময়কে ধারণের ক্ষেত্রে অনেকের চেয়ে যোজন যোজন পথ এগিয়ে। একটি দরদি ও সংবেদনশীল অন্তরের অধিকারী। দীনের জন্য সারাক্ষণ অন্তরে জ্বলন অনুভব করেন। কীভাবে আলেমদের যুগ সচেতন করা যায়, জনসাধারণকে কীভাবে দীনের পথে আনা যায়-সেটা নিয়েই তিনি সারাক্ষণ ভাবেন। তার ভাবনাজুড়ে থাকে উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণ। ঢাকার মিরপুরের ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাদ্রাসা দারুর রাশাদের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল তিনি। এ ছাড়া নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছেন আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। মুফাক্কিরে ইসলাম সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহমাতুল্লাহি আলাইহির বিশিষ্ট খলিফা।

তার ভাবনার জগৎ গড়ে উঠেছে মূলত সদর সাহেব খ্যাত মুজাহেদে আজম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহির চিন্তাধারায়। তিনি সদর সাহেবকে না দেখলেও তার চিন্তাধারায় প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত। চিন্তাধারায় আল্লামা ফরিদপুরী (রহ.) যতটা উদার ছিলেন, সময়কে ধারণের ক্ষেত্রে যেমন অগ্রগামী ছিলেন, উম্মাহর জন্য যতটা দরদি ছিলেন-এর প্রায় সব গুণই মোটাদাগে মাওলানা মুহাম্মদ সালমানের মধ্যে পাওয়া যায়। সদর সাহেবের মতো তিনিও নিজের চেয়ে পরের কল্যাণ কামনায় বেশি ব্যস্ত। কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়াশোনার পর মাদ্রাসায় চলে আসার পেছনেও শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর ব্যক্তিত্বের প্রতি আকর্ষণ জোরালোভাবে কাজ করেছে।

মাওলানা মুহাম্মাদ সালমানের জন্ম ১৯৫০ সালে, সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ থানার পূর্ব নলতা গ্রামে। বাবার নাম বাহাদুর গাজী, মায়ের নাম ভাগ্য বিবি। তিনি নিজ গ্রামে পড়াশোনা শুরু করেন এবং ১৯৬৮ সালে নলতা হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন সাতক্ষীরা কলেজে এবং সেখানে প্রথম বর্ষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষ শেষ হওয়ার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন মাদ্রাসায় পড়বেন। কিন্তু তখন হুট করে কলেজ ছেড়ে মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়া এতটা সহজ ছিল না। কারণ স্কুল-কলেজ থেকে আসা ছাত্রদের জন্য ছিল না আলাদা কোনো ব্যবস্থা। একদম মাদ্রাসার শিশুশিক্ষার্থীদের সঙ্গে পড়াশোনা করতে হতো। একজন বয়স্ক ছাত্রের জন্য এটা ছিল খুবই বিব্রতকর। তা ছাড়া এত দীর্ঘ সময় ব্যয় করাও তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি ছুটে যান আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর প্রতিষ্ঠিত গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসায়। সেখানে তাকে আলাদা করে পড়ানোর মতো কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ছোট ছোট ছেলেদের সঙ্গেই তাকে পড়তে হয়। সব বাধা পেরিয়ে গওহরডাঙ্গায় পড়াশোনা চালিয়ে যান। তবে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে। মাঝে লালবাগ মাদ্রাসায় ভর্তি হলেও পড়াশোনা হয়নি। কিছুদিন ভারতের গঙ্গুহেও পড়েন। তখন নদওয়াতেও তার নিয়মিত যাতায়াত গড়ে ওঠে। সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.)-এর কাছে ইতিমধ্যে বায়াতও হয়ে যান। তার সঙ্গে ইতেকাফ এবং ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করেন। এভাবেই বিশ্ববিখ্যাত এই মনীষীর চিন্তাধারা তাকে প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত করে।

পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে মাওলানা সালমান কর্মজীবন শুরু করেন খুলনায়। সেখানে প্রথমে শিল্পশহর খালিশপুরে দারুল মোকাররম মাদ্রাসায় এবং পরে সেনহাটী জাকারিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসায় কয়েক বছর শিক্ষকতা করেন। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। প্রথমে আরজাবাদ মাদ্রাসায় শিক্ষক ছিলেন। পরে মিরপুর ১২ নম্বরে এসে মাদ্রাসা দারুর রাশাদ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে আগে থেকে একটি মসজিদ ছিল, সঙ্গে মক্তব। নিভৃত সেই এলাকায় শূন্য থেকে শুরু করে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করা সহজ ছিল না। তবে তিনি প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে চলতেই ভালোবাসতেন। এ জন্য শত বাধা মোকাবিলা করেই তিনি মাদ্রাসা গড়ে তোলেন এবং দেশে-বিদেশে ব্যতিক্রমধর্মী মাদ্রাসা হিসেবে পরিচিত করেন।

মাওলানা মুহাম্মাদ সালমান সময়োপযোগী ও অগ্রসর চিন্তাধারার কারণে সর্বমহলে প্রশংসিত। স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে মাদ্রাসায় এসে তিনি যেহেতু জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন, এজন্য শুরুতেই তিনি এই জটিলতা দূর করার কথা ভাবেন। সাধারণ লাইনে পড়াশোনা করা কোনো শিক্ষার্থী মাদ্রাসায় পড়তে চাইলে কীভাবে সহজে পড়তে পারে সেটা নিয়ে ভিন্ন কিছু করার পরিকল্পনা নেন। সেই চিন্তা থেকেই তিনি গড়ে তোলেন মাদ্রাসা দারুর রাশাদ। কওমি মাদ্রাসার যে সিলেবাস ১৬ বছরে পড়ানো হয় সেটা পাঁচ বছরের কোর্সে পড়ানোর ব্যবস্থা করেন। স্কুল-কলেজ থেকে পড়াশোনা করে আসা শিক্ষার্থীদের জন্যই মূলত খোলা হয় প্রতিষ্ঠানটি। এটাই দেশে এই ধারার প্রথম প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে এ ধরনের আরও অনেক প্রতিষ্ঠান হয়েছে, তবে এই ধারার পথিকৃৎ হলেন মাওলানা মুহাম্মদ সালমান। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য দারুর রাশাদ এখনো সেরাদের তালিকায়।

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের লেখালেখিতে যোগ্য করে গড়ে তুলতে আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.) ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় ‘ইদারাতুল মাআরিফ’ নামে একটি বিভাগ খুলেছিলেন। তবে সেটা খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। সেই চিন্তাধারা থেকেই মাওলানা সালমান তার প্রতিষ্ঠিত দারুর রাশাদেও চালু করেন ইদারাতুল মাআরিফ। ১৯৯৮ সালে চালু করা এই বিভাগে পড়াশোনা করে আজ অনেকেই লেখালেখির অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত। এখনো সেই বিভাগ চালু রয়েছে এবং লেখালেখি ও গবেষণামূলক বিভিন্ন জরুরি খেদমত আঞ্জাম দিচ্ছে।

‘ধর্মহীন কর্মশিক্ষা ও কর্মহীন ধর্মশিক্ষা’ উভয়টাকে জাতির জন্য অভিশাপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.)। সেই ভাবনা থেকেই মাওলানা সালমান সাধারণ ও দীনি শিক্ষার সমন্বিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়াস চালান। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার পর জামিয়াতুর রাশাদ নামে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সেই প্রতিষ্ঠান সাফল্যের সঙ্গে পথ চলছে। এই ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেকে করার চেষ্টা করলেও আশানুরূপ সফলতা পায়নি। তবে জামিয়াতুর রাশাদ এ ক্ষেত্রে অনেকটা অগ্রগামী। ইতিমধ্যে এখানকার শিক্ষার্থীরা একই সঙ্গে দাওরায়ে হাদিস এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করছে।

মাওলানা মুহাম্মাদ সালমান শিক্ষাধারা নিয়ে কাজ করলেও তার পছন্দের জায়গা লেখালেখি, বইপত্র, পত্রিকা-সাময়িক, শিল্প-সাহিত্য। তার লিখিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ত্রিশটি। তার তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হয়েছে অগণিত বই। লেখা কিংবা পড়া এই দুই কাজেই তাকে বেশি ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। যারা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত তাদের তিনি বাড়তি খাতির করেন। কেউ কিছু লিখেছেন, সেটা যে মানেরই হোক, তিনি তাতে উদ্বুদ্ধ করেন। নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে বই কিনে মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন। কেউ ভালো লিখলে তিনি হাদিয়া দেন, তার জন্য প্রাণভরে দোয়া করেন। নতুন লেখকদের লেখা রচনা বা বইপত্র ছাপার ক্ষেত্রেও তার প্রচেষ্টা চোখে পড়ার মতো। তার উদ্যোগে আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.) ও সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) সহ কয়েকজন বরেণ্য আলেমের স্মারক প্রকাশিত হয়। আলেমদের নিয়ে স্মারক করার রীতি তার হাত ধরেই শুরু হয়।

শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগই নন, তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও লেখালেখিকে পৃষ্ঠপোষকতা করে চলেছেন। আর রাশাদ পাবলিকেশনস নামে মাদ্রাসা দারুর রাশাদের অধীনে একটি প্রকাশনী রয়েছে, যেখানে নিয়মিত বিভিন্ন বইপত্র বের হয়। আল ইরফান পাবলিকেশনস নামে তার নিজেরও আরেকটি প্রকাশনী রয়েছে। কখনো লাভের মুখ না দেখলেও তিনি সেই প্রকাশনী থেকে অসংখ্য বইপত্র বের করেছেন। কোনো বই দরকারি মনে করলে সেটা বাজারে চলবে কি না তা না ভেবেই ছাপিয়ে ফেলেন। কেউ বই লিখেছেন কিন্তু প্রকাশ করতে পারছেন না, তার বইও এই প্রকাশনী থেকে ছাপা হয়ে থাকে। সেবা ও কল্যাণমূলক কাজের জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সাবিলুর রাশাদ ট্রাস্ট। এই ট্রাস্ট থেকেও নানামুখী খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। ভোগ-বিলাসের জীবন ত্যাগ করে বইপত্র ও লেখালেখিময় জীবনই তিনি উপভোগ করেন। এজন্য ব্যক্তিগত সহায়-সম্পত্তি নিয়ে তাকে কখনো খুব একটা ভাবতে দেখা যায় না।

‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ বলে বাংলা ভাষায় একটা প্রবাদ আছে। কিন্তু সেটা পারে কতজন? আমাদের সমাজে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানুষের সংখ্যাই বেশি। অন্যকে ঠকিয়ে নিজে বড় হওয়ার চেষ্টাই বেশি চোখে পড়ে। নিজে ভালো থাকার জন্য অন্যের সুখ কেড়ে নেওয়া মানুষের সংখ্যাও এই সমাজে কম নয়। চার দিকে এমন চরিত্রের মানুষদের দেখতে দেখতে আমরা যখন ত্যক্ত-বিরক্ত তখন মাওলানা সালমানদের মতো কিছু মানুষ আশার আলো হয়ে দেখা দেন। তাদের ছড়ানো আলোর কারণে এই সমাজ আজও অন্ধকারে তলিয়ে যায়নি। আলোর এই ফেরিওয়ালাকে আল্লাহ আরও বেশি আলো বিকিরণের তৌফিক দিন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত