অবরোধে সহিংসতার শঙ্কা পুলিশের

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৩, ০৫:০৬ এএম

বর্তমান সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ডাকা দেশজুড়ে টানা তিন দিনের অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। পুলিশের শঙ্কা, অবরোধের নামে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানো হতে পারে। সমাবেশ ঘিরে গত শনিবারের মতো বড় ধরনের সহিংসতা করতে পারে দল দুটির নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে এরই মধ্যে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। গতকাল সোমবারও পুলিশ সদর দপ্তরে ঊর্ধ্বতনদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক হয়েছে। ডিএমপিসহ পুলিশের সবকটি ইউনিটের প্রধানরা যাতে অংশ নেন।

জানা গেছে, গতকাল রাতে ইউনিট প্রধানদের কাছে বেশ কিছু বার্তা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। বার্তা পেয়ে রেঞ্জ অফিসের ডিআইজি, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও জেলা পুলিশ সুপাররা নিজ নিজ ইউনিটের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে বিফ্রিং করেছেন। দেশ জুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে পুলিশের বিশেষ শাখা। জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (ডিএসবি) মাধ্যমে অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে কাজ করা হচ্ছে।

এদিকে কোথাও কোনো নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা। বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি প্রস্তুত রয়েছেন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), র‌্যাব ও আনসার সদস্যরা। বিভিন্ন ব্যারাকে প্রস্তুত থাকবে রিজার্ভ পুলিশ। যাতে স্বল্প সময়ের নোটিসে তারা মুভ করতে (ঘটনাস্থলে যাওয়া) পারে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা গতকাল রাত থেকেই ঢাকাসহ সারা দেশে টহল দেওয়া শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

গত শনিবারের সহিংসতার ঘটনায় ৩৬টি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিএমপি। ওইসব মামলায় ১ হাজার ৫৪৪ জনের নাম উল্লেখ করাসহ অজ্ঞাতপরিচয়দের আসামি করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য, ছবি এবং ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে সহিংসতায় জড়িততের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।

অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার বিষয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের মানুষের জানমাল ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষাসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে যা যা করা দরকার, পুলিশ তা-ই করবে। কেউ যদি অবরোধের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, সড়ক বা রেলপথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাহলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে যেসব এলাকা সহিংসতাপ্রবণ সেখানে বাড়তি পুলিশ, দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন থাকবে। এ ছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিশেষ বার্তা পাঠিয়ে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও নাশকতার তথ্য থাকলে ৯৯৯-এ কল দেওয়ার জন্য জনসাধারণের প্রতি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’

পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (অপারেশন) আনোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দেশে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। কেউ যাতে কোনো অরাজকতা করতে না পারে সেজন্য বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ের পুলিশকে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা প্রস্তুতি কার্যকর করতে বলা হয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবরোধে আমরা সহিংসতার গন্ধ পাচ্ছি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও সহিংসতার আশঙ্কা করে প্রতিবেদন দিয়েছে। আইজিপির নেতৃত্বে ঊর্ধ্বতনরা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। শনিবার যে সহিংসতা হতে পারে, এ বিষয়টি আমরা আগে আমলে নিইনি। এ সহিংসতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অবরোধের কর্মসূচি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’

রাতেই নেমেছে বিজিবি : যেকোনো ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ করতে গতকাল রাত থেকেই ঢাকাসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে নিরাপত্তা দিতে মাঠে নেমেছে বিজিবি। মধ্যরাত থেকেই বিজিবি সব মহাসড়ক ও রাজধানীতে টহল শুরু করে। বিজিবির পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্নেল এএম জাহিদ পারভেজ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদার আলোকে মোতায়েনের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক বিজিবি প্লাটুন প্রস্তুত আছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে।’

৩০০ টহল টিম র‌্যাবের : র‌্যাব জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার থেকে তিন দিন জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষাসহ সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতে রাজধানীসহ সারা দেশে র‌্যাবের ব্যাটালিয়নগুলো নিজ নিজ অধিক্ষেত্রাধীন এলাকায় রোবাস্ট প্যাট্রল ও গোয়েন্দা নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা করতে রাজধানীতে ৮৭টিসহ ৩০০ টহল কার্যক্রম পরিচালনা করবে র‌্যাব।

মোতায়েন থাকবে ১২ হাজার আনসার : আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তর জানিয়েছে, বিএনপির অবরোধ কেন্দ্র করে সারা দেশের রেল ও সড়কপথে যোগাযোগ স্বাভাবিক রাখতে তৎপর থাকবে বাহিনীটি। রেললাইন, রেলস্টেশন, বাসস্টেশন ও সড়কপথ রক্ষায় দেশের ১ হাজার ৩৭১টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ১২ হাজার ১৪৫ আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবেন। রেললাইনে যাতে কোনো নাশকতা বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, এজন্য তারা দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া বাসস্টেশন, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে মোতায়েন থেকে সাধারণ মানুষের চলাচল নির্বিঘœ করতে দায়িত্ব পালন করবেন আনসার সদস্যরা।

অবরোধ কর্মসূচি প্রসঙ্গে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা গতকাল (রবিবার) সন্ধ্যায় জানতে পেরেছি আগামী তিন দিনের জন্য রেল, সড়ক ও নৌপথে অবরোধ কর্মসূচি আসছে। এ অবরোধে নাশকতার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তবে নাশকতা যে করবে, এটি কিন্তু সমসাময়িক সময়ের ঘটনা তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ, নাশকতার তাদের যে আচরণ তা বলা যায় অবিশ্বাস্য রকমের আচরণ। কাজেই সে শঙ্কা তো আমাদের আছেই। আমরা সেভাবে নিরাপত্তা পরিকল্পনাও নিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তবে ঢাকা মহানগর পুলিশ তাদের যে আইনি দায়িত্ব তা তারা প্রয়োগ করবে এবং নগরবাসীকে নিরাপদ রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা রাখবে। নগরবাসী কোনো ঘটনা দেখলে বা জানলে নিজ দায়িত্বের জায়গা থেকেও কারা করছে বা কোথাও কোনো সন্দেহজনক কিছু দেখলে পুলিশে জানাবেন।’

গত শনিবারের সহিংসতার ঘটনায় মামলার সংখ্যা বাড়তে পারে উল্লেখ করে মহিদ উদ্দিন বলেন, ‘ঘটনার দিন প্রধান বিচারপতির বাসভবন, জাজেজ কমপ্লেক্স, এমনকি পুলিশ হাসপাতালসহ অনেক স্থানে হামলা ও নাশকতা হয়েছে। এখানে বেশ কয়েকটি ঘটনাস্থল রয়েছে। এ ছাড়া অনেক সাধারণ মানুষ মামলা করেছেন। পুলিশ যে জায়গায় আহত হয়েছে, সেখানে তারা মামলা করছেন। কাজেই এখনই সঠিক মামলার সংখ্যা বলা কঠিন। তবে দুয়েক দিন পর হয়তো পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা বা চিত্রটি জানা যাবে।’

বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় রাজনীতিবিদদের বাসায় অভিযান ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, তাদের কাছে ব্যক্তি কোনো বড় বিষয় নয়, বিষয় হলো অপরাধ এবং অপরাধী। বিভিন্নভাবে অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশের কাজ হলো তদন্ত করা। আর তদন্তে যদি কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তবে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শনিবারের মহাসমাবেশে পুলিশের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় কোনো ভুল ছিল কি না, প্রশ্নের জবাবে মহিদ উদ্দিন বলেন, ‘মহাসমাবেশ আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। তাদের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল। কেউ কেউ হয়তো আরও অনাকাক্সিক্ষত পরিবেশ আশা করেছিল যে, পুলিশকে উসকানিতে ফেলে যদি বড় ধরনের কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটানো যেত। কিন্তু পুলিশ সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত