সাত বছরের বেশি সময় আগে রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিসান বেকারিতে জঙ্গি হামলা ও হত্যাযজ্ঞের মামলায় সাত জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে উচ্চ আদালত। দণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আপিলের দুই আবেদনই নামঞ্জুর করে গতকাল সোমবার বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়।
সাজাপ্রাপ্তরা হলো মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, মো. আসলাম হোসেন সরদার ওরফে মোহন, মো. আবদুস সবুর খান হাসান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, রাফিউল ইসলাম, মো. হাদিসুর রহমান, মো. শফিকুল ইসলাম খালেদ এবং মামুনুর রশীদ রিপন। দেশ-বিদেশে আলোচিত হলি আর্টিসান হামলার ঘটনায় হওয়া মামলায় প্রায় চার বছর আগে আসামিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিল ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল। হাইকোর্ট বাংলায় দেওয়া রায়ে বলে, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ এর ধারা ৬ (১) (ক) (আ) ধারার অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আপিলকারীদের আইনের ৬(২) (আ) ধারায় বর্ণিত সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। আমৃত্যু কারাদণ্ডের ব্যাখ্যায় আদালত বলে, ‘আলোচ্য মামলায় দেশি-বিদেশি ২০ নাগরিকসহ ২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে যে নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাতে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া বর্ণিত নিষ্ঠুরতম হত্যাকাণ্ডটি জনসাধারণের মনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টিসহ জননিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘিœত করেছে।’
আপিল বিভাগের ‘আতাউর মৃধা ওরফে আতাউর বনাম রাষ্ট্র’ মামলার নজিরের ১৭৯ প্যারায় বর্ণিত পর্যবেক্ষণের বিষয়টি উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলে, ‘আপিলকারীদের আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।’ আসামিদের প্রত্যেককে এ সাজাসহ ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে ৫ বছর করে কারাদণ্ডের রায় দেয় হাইকোর্ট। এ ছাড়া বিচারিক আদালতে একই আইনের ৭ ধারায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয়জনকে (মামুনুর রশীদ রিপন ছাড়া) দোষীসাব্যস্ত করে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং পৃথক দুই ধারায় সাতজনকে দেওয়া পাঁচ বছর ও ছয় মাসের কারাদণ্ড বহাল রাখে হাইকোর্ট। এ মামলায় আসামিদের দেওয়া সব দণ্ড একসঙ্গে চলবে বলে রায়ে বলা হয়।
২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর ‘আতাউর মৃধা বনাম রাষ্ট্র’ মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বলে, যাবজ্জীন সাজা মানে ৩০ বছর কারাদণ্ড। তবে কোনো আদালত আমৃত্যু কারাদণ্ড দিলে আসামিকে বাকি জীবন জেলে থাকতে হবে।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে নিষিদ্ধ ঘোষিত জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) একটি অংশ আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হলি আর্টিসান বেকারিতে হামলা চালায়। এ সময় দেশি-বিদেশি ২০ জনকে হত্যা করে সশস্ত্র জঙ্গিরা। এ ছাড়া জঙ্গিদের ছোড়া গ্রেনেডে দুই ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা মারা যান। একপর্যায়ে যৌথবাহিনীর ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামে কমান্ডো অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। ওই ঘটনার সময় বেকারিটির একজন শেফ মারা যান। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল এক রায়ে অভিযুক্ত সাত জঙ্গিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেয়। এ ছাড়া পৃথক দুটি ধারায় সাতজনকে ১০ ও ৫ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেয় আদালত। ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর সর্বোচ্চ দণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরপর ২০২০ সালের ১৭ আগস্ট এ মামলায় পেপারবুক প্রস্তুত হয়।
আইনজীবীদের তথ্য অনুযায়ী, ডেথ রেফারেন্সের পাশাপাশি আসামিদের পক্ষে হাইকোর্টে সাতটি আপিল হয়। এর মধ্যে বিচারিক আদালতের রায়ের পর আসামি আসলাম সরদার, হাদিসুর, শফিকুল ইসলাম খালেদ ও মামুনুর রশীদ রিপন সাজা থেকে খালাস চেয়ে আপিল করে। অন্য তিন আসামি জাহাঙ্গীর, রিগ্যান ও আবদুস সবুরের পক্ষে জেল আপিল হয়। চলতি বছর ৩ মে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি শুরু হয়। এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবীদের শুনানির মধ্য দিয়ে গত ১১ অক্টোবর শুনানি শেষ হয়। মোট ২৬ কার্যদিবস শুনানি শেষে রায়ের জন্য তারিখ ধার্য হয়। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বশির আহমেদ। আসামিপক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মো. আরিফুল ইসলাম ও মো. আমিমুল এহসান জোবায়ের। জেল আপিল করা তিন আসামির পক্ষে শুনানিতে ছিলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী এসএম শফিকুল ইসলাম।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬ (১) (ক) (অ) ধারায় সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল বিচারিক আদালত। সাজা কমার ব্যাখ্যায় রায়ের বরাতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বশির আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় বিচারিক আদালত আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু হাইকোর্ট বলেছেন, এই আসামিদের কেউ ঘটনাস্থলে সরাসরি উপস্থিত থেকে এ হত্যাকা-ে অংশগ্রহণ করেনি। তারা সহযোগী আসামি হিসেবে ছিলেন। ফলে আসামিদের সাজা কমিয়ে তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ অপরাধের একমাত্র সাজা মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল। আমরা এ রায় নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলব। সরকার যদি বলে তাহলে আমরা অবশ্যই আপিল করব।’
অন্যদিকে সাজাপ্রাপ্ত শফিকুল ইসলাম খালেদের আইনজীবী আমিমুল এহসান জোবায়ের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসামিরা কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। আমরা আশা করেছিলাম আসামি খালাস পাবেন। হাইকোর্ট সাজাটা কমিয়ে আমৃত্যু সাজা দিয়েছেন। এখন আসামির স্বজনরা যদি যোগাযোগ করেন, তাহলে আপিল বিভাগে আপিল করা হবে।’
