তিনি ছিলেন জলবায়ু ন্যায্যতার প্রতীক

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৩, ০৭:২৯ এএম

স্বল্প পরিসরে হলেও প্রফেসর সালিমুল হকের কাজের সঙ্গে আমার যুক্ত থাকার সুযোগ হয়েছে। বাংলাদেশে জলবায়ু ন্যায্যতার আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি। দীর্ঘ তিন দশক ধরে তিনি পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করেছেন। জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর হয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেন-দরবারে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা ও উন্নত দেশকে জবাবদিহি করার ক্ষেত্রে তার যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। অনেক ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষ হয়ে যারা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেনদরবার করতেন তাদের উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করতেন তিনি। তার দীর্ঘ কর্মজীবনে জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ ও গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে কাজ করেছেন। জানা যায়, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে তিনি পরামর্শকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত আন্তঃসরকারি প্যানেলের (আইপিসিসি) অভিযোজন সম্পর্কিত প্রতিবেদন তৈরিতে তার কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল। এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশমনের পাশাপাশি অভিযোজন একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।

অভিযোজন করতে পারার একটা সীমা আছে তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতি তহবিল গঠন সম্পর্কিত আলোচনায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি সক্রিয় প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তিনি মনে করতেন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর ক্ষয়ক্ষতি তহবিল থেকে সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার আছে। উন্নত দেশগুলোর কাছে জলবায়ু অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি তহবিল গঠন কখনো অগ্রাধিকার ছিল না। প্রফেসর হক এক্ষেত্রে সবসময়ই সচেষ্ট ছিলেন। তাদের প্রচেষ্টার ফলে ২৭তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন, শারম-আল-শেখে বিশ্ব-নেতারা জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতি তহবিল গঠনে একমত হন। তিনি ছিলেন আসছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন (কপ-২৮) প্রেসিডেন্সির একজন উপদেষ্টা এবং তিনি এই সম্মেলনে ক্ষয়ক্ষতি তহবিল সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রত্যাশায় ছিলেন।

জাতিসংঘের নবগঠিত বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা বোর্ডের বাহ্যিক সদস্য ছিলেন প্রফেসর সালিমুল হক। বিজ্ঞানের জগতে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার পেছনে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি তালিকা গত বছর প্রকাশ করে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’। দশজনের এই সংক্ষিপ্ত তালিকায় তার নাম ছিল। ৭১ বছর বয়সে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইইউবি-এর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইসিসিসিএড)-এর পরিচালক ছিলেন। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে বিষয়গত ধারণার পাশাপাশি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতা তার কাজের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবিলায় তিনি সর্বদা নতুন নতুন ধারণা নিয়ে আসতেন এবং সে পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে কীভাবে ক্ষমতায়ন করা যায় সে নিয়ে ভাবতেন। ক্ষয়ক্ষতি তহবিল নিয়ে তার কাজ শুধু  জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিই নয়, অর্থনীতি-বহির্ভূত ক্ষয়ক্ষতিকেও আলোচনায় গুরুত্ব দিয়েছেন। গবেষণার ফলাফল ও গণমানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পত্র-পত্রিকায় জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করতেন। এর মাধ্যমে তিনি যেমন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু সম্পর্কিত বিতর্কগুলো আলোচনায় রাখতেন এবং তেমনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে তথ্য-উপাত্ত সহকারে তুলে ধরতেন।

তার সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ততার সময় দেখেছি বিভিন্ন ধরনের সংগঠনের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রে তিনি কতটা সংবেদনশীল। তিনি সবসময় যুব ও প্রান্তিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করতে চাইতেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তাদের ভূমিকাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তিনি যুব সংগঠনগুলোকে সাহায্য করতেন যাতে তারাই জলবায়ু ন্যায্যতার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। তার কাজের অন্যতম ক্ষেত্র ছিল কীভাবে এই যুবদের দক্ষতা বাড়ানো যায়। তিনি যুবদের সবসময় জলবায়ু ন্যায্যতার আন্দোলনে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তাদের অভিযোজন ও প্রশমন সম্পর্কিত উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণের জন্য পরামর্শ দিতেন ও এজন্য উৎসাহ দিতেন। কথা হচ্ছিল এমন একজন যুব জলবায়ু ন্যায্যতার আন্দোলনের কর্মী, ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের নির্বাহী সমন্বয়কারী, সোহানুর রহমানের সঙ্গে যিনি প্রফেসর হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন, তিনি বলছিলেন, ‘সালিম স্যার জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ক্ষতিপূরণের লড়াই করে গেছেন। তেমনি তিনি স্থানীয় মানুষের নেতৃত্বে যাতে অভিযোজন হতে পারে সেই ধারণারও একজন দিকপাল ছিলেন। উনি যেভাবে যোগাযোগ রক্ষা করতেন সেটা ছিল অবিশ্বাস্য। উনি সবাইকে অনুপ্রাণিত করতেন বিশেষ করে তরুণ ও শিশুদের। দারুণ রকমের আশাবাদী মানুষ ছিলেন তিনি। তার মৃত্যুতে আমরা আমাদের জলবায়ু সুবিচার আন্দোলনের এক বড় সমর্থককে হারালাম।’

জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত আলোচনায় প্রফেসর সালিমুল হকের অন্যতম অবদান হচ্ছে অভিযোজন প্রক্রিয়ায় স্থানীয়করণ সম্পর্কিত ধারণার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তিনি সবসময় মনে করতেন অভিযোজন হতে হবে স্থানীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে এবং এজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে যথেষ্ট বিনিয়োগ করা দরকার। এই প্রক্রিয়ায় তিনি অভিযোজনে স্থানীয় কমিউনিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কাঠামোগত অসাম্য দূর করা, স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু সম্পর্কিত ঝুঁকি বিশ্লেষণ আরও বেশ কিছু বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

সালিমুল হক বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতেন। জলবায়ু ন্যায্যতা আদায়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছেন একশনএইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির, তিনি স্মৃতিচারণ করছিলেন, ‘প্রফেসর সালিমুল হক এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি বিশ্বকে জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুত্ব এবং একে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখতেও ভূমিকা পালন করেছেন। যদিও তার মতো ব্যক্তিত্বকে কোনো একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা কঠিন কারণ তার জ্ঞান ও চিন্তার পরিধি ছিল বিশাল। তিনি জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত শুধু সমস্যাই না এর সমাধানকে বিশ্বের কাছে বিশেষ করে রাজনীতিবিদদের কাছে নিয়ে যেতে পেরেছেন। বিশ্ব-নেতাদের কাছে উন্নয়নশীল বিশ্বের দাবিকে তুলে ধরতে পেরেছেন। তার সঙ্গে কাজের মাধ্যমে আমি তাকে ন্যায্যতার প্রতীক হিসেবেই জেনেছি। তিনি তার চিন্তা দিয়ে আমাদের পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তিনি বলতেন পরিবর্তন সম্ভব। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি প্রফেসর হক একজন দেশপ্রেমিক ছিলেন যিনি এই বিশ্বকে ভালোবাসতেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত ভূমিকার মাধ্যমে তিনি তার প্রমাণ রেখে গেছেন।’

বর্তমান সময়ে প্রফেসর সালিমুল হকের মতো মানুষের প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি, তার এই চলে যাওয়া বাংলাদেশ তো বটেই, উন্নয়নশীল বিশ্ব, এমনকি পৃথিবীর জলবায়ু ন্যায্যতা আদায়ের আন্দোলনের ক্ষেত্রে এক অপূরণীয় ক্ষতি।

লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত