চায়নাম্যান কুলদীপ রহস্যময় থিকশানা

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৩, ০১:৫১ এএম

২০১৭ থেকে ২০১৯; অভিষেকের পর এই সময়টায় সাদা বলের ক্রিকেটে ভারত দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন কুলদীপ যাদব। এরপর হুট করেই যেন হারিয়ে ফেলেন ছন্দ। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ থেকে ভুগতে থাকেন ফর্ম খরায়। এক পর্যায়ে দল থেকে বাদও পড়তে হয় বাঁহাতি এই রিস্ট স্পিনারকে। তখন আত্মবিশ্বাস নেমে গিয়েছিল তলানিতে। ‘কখনো কখনো মনে হয় এটা কী হচ্ছে? আবার মাঝে মাঝে মনে হয় আমি আর আগের কুলদীপ নই। কখনো আবার মনে হয় আমি একই রয়েছি’, কঠিন সময়টায় ভাবনাগুলো এমন ছিল কুলদীপের। নিজেকে নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকলেও হাল ছাড়েননি তিনি। লড়াই করে গেছেন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেকে নতুন করে গড়েছেন। ঘরোয়া ক্রিকেটে বল হাতে আলো ছড়িয়ে আদায় করে নিয়েছেন জাতীয় দলে জায়গা। বিশ্বকাপেও ভারতের বোলিং আক্রমণের মূল হাতিয়ারের একজন কুলদীপ।

হতে চেয়েছিলেন পেসার। ক্যারিয়ারের শুরুটা করেছিলেনও সেভাবে। কিন্তু কুলদীপকে ভিন্ন কিছু করার পরামর্শ দেন তার কোচ কপিল পান্ডিয়া। গুরুর কথা মেনে শুরু করেন বাঁহাতি রিস্ট স্পিন। একটা সময় পর কুলদীপেরও মনে হতে শুরু করে, চায়নাম্যান হিসেবে ক্যারিয়ারে সাফল্য পাবেন। কারণ বোলিংটা যে ভালোই হচ্ছিল তার। লেংথের ওপর ছিল চমৎকার নিয়ন্ত্রণ, সঙ্গে বৈচিত্র্য তো ছিলই। ভারতে তার মতো প্রতিভার কেউ ছিল না তখন। ২০১২ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ পেয়ে নজরে আসেন আরও ভালোভাবে। দুই বছর পরের যুব বিশ্বকাপে দুর্দান্ত বোলিংয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখতে আরও তিন বছর অপেক্ষা করতে হয় তাকে, ২০১৭ সালে তিন সংস্করণেই হয়ে যায় অভিষেক। টেস্টে নিয়মিত হতে না পারলেও ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে দলের গুরুত্বপূর্ণ স্পিনার হয়ে ওঠেন তিনি।

২০১৯ বিশ্বকাপ থেকেই কুলদীপের ফর্ম পড়তির দিকে। ওই আসরে ৭ ম্যাচে ৫৬.১৬ বোলিং গড়ে উইকেট নেন কেবল ৬টি। ছন্দহীন স্পিনারের ওপর আস্থাও হারাতে থাকে ভারত। শুরুতে সুযোগ পাচ্ছিলেন অনিয়মিতভাবে, পরে জায়গাই হারিয়ে ফেলেন দলে। এমনকি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্সের একাদশেও জায়গা হারান তিনি। দল বদলে ২০২২ সালে দিল্লি ক্যাপিটালসে যোগ দিয়ে সুসময় ফিরে আসে তার ক্যারিয়ারে। জাতীয় দলেও সুযোগ পেয়ে নিজেকে মেলে ধরতে থাকেন তিনি। বিশেষ করে, চলতি বছর তো যেন উড়ছেন ২৮ বছর বয়সী কুলদীপ। এখন পর্যন্ত ২৩ ওয়ানডেতে তার শিকার ৪৩ উইকেট, ওভারপ্রতি রান খরচ পাঁচের নিচে। ফর্ম ধরে রেখেছেন তিনি বিশ্বকাপেও। তার বাঁহাতের বিষাক্ত ঘূর্ণিতে কুপোকাত হয়েছেন জস বাটলার, ডেভিড ওয়ার্নার, গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের মতো ভয়ংকর ব্যাটসম্যানরা। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভারতকে এনে দিচ্ছেন উইকেট। এখন অবধি আসরে ৬ ম্যাচে তার শিকার ১০টি।

বিশ্বকাপে দুর্বার গতিতে ছুটে চলা ভারতের আজ লড়াই শ্রীলঙ্কার সঙ্গে। স্বাগতিকদের জয়রথ চালিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে কুলদীপকে। আরেকবার বল হাতে নিজেকে মেলে ধরতে হবে তার। আর লঙ্কানদের বিপক্ষে তো তার পারফরম্যান্স দুর্দান্ত। এখন পর্যন্ত ১১ ওয়ানডে খেলে উইকেট নিয়েছেন ১৮টি। রান দিয়েছেন ওভারপ্রতি পাঁচের নিচে। মুম্বাইয়ের ব্যাটিং স্বর্গে লঙ্কান ব্যাটসম্যানদের থামাতে কুলদীপের কাছেই বেশি প্রত্যাশা থাকবে ভারতের। নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ আরেকটি ম্যাচে দিতে পারেন কি না তিনি, সেটাই এখন দেখার।

উড়তে থাকা ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মাটিতে নামিয়ে আনতে শ্রীলঙ্কার মূল অস্ত্র হবেন মাহিশ থিকশানা। নতুন কিংবা পুরনো বল, যেকোনো সময়ই বোলিং করতে পারদর্শী এই অফ স্পিনার। অনেকটা দূর থেকে দৌড়ে এসে হাতের আঙুলের টোকায় ব্যাটসম্যানদের পরাস্ত করেন তিনি নিয়মিত। তার ক্যারম বলের সঙ্গে জোরের ওপর করা বল রীতিমতো ভীতির কারণ ব্যাটসম্যানদের জন্য। ভারতকে হারাতে হলে জ্বলে উঠতে হবে ২৩ বছর বয়সী এই ক্রিকেটারকে। চলতি বিশ্বকাপে অবশ্য দেখা যাচ্ছে না তার বোলিংয়ের ধার। পাঁচ ম্যাচ খেলে এখন পর্যন্ত উইকেট নিয়েছেন মোটে তিনটি। তবে ছন্দ খুঁজে পেলে লঙ্কান এই ‘রহস্য’ স্পিনার যেকোনো ব্যাটসম্যানের জন্যই হয়ে উঠতে পারেন বিভীষিকার নাম।

স্কুল ক্রিকেটে আলো ছড়ানো থিকশানা ন্যাশনাল ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে কোচদের নজর কাড়েন দ্রুতই। প্রায় একই বোলিং অ্যাকশন, নিয়ন্ত্রণ, বাউন্স ও বৈচিত্র্যের জন্য শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটে তাকে বলা হতো ‘নতুন অজন্তা মেন্ডিস’, ‘আরেক রহস্য স্পিনার’ আরও কত কি! ক্যারিয়ারের এক পর্যায়ে সাবেক স্পিনার মেন্ডিসকে মেন্টর হিসেবেও পান তিনি। তার জন্য সমস্যা হয়ে ওঠে অতিরিক্ত ওজন। ২০১৮ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাননি তিনি ফিটনেস পরীক্ষায় উতরাতে না পেরে। ওই সময়ে তার ওজন নাকি ১১৭ কেজির মতো ছিল! এরপর ফিটনেস নিয়ে কাজ করেন থিকশানা। অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখেন তিনি। মাঝে শ্রীলঙ্কা আর্মিতেও যোগ দেন। সেখানে আর্মি ক্রিকেট দলের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেকে শ্রীলঙ্কার প্রথম স্পিনার হিসেবে নেন ৪ উইকেট।  সময়ের সঙ্গে সাদা পোশাকের দুই সংস্করণেই লঙ্কানদের মূল্যবান সম্পদ হয়ে ওঠেন। চলতি বছরটা তার দারুণ কাটছে, বিশেষ করে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে। এই সংস্করণে ২০২৩ সালে ২০ ম্যাচ খেলে নিয়েছেন ৩৪ উইকেট। ভারতের বিপক্ষে এখন পর্যন্ত কেবল একটি ওয়ানডে খেলার সুযোগ হয়েছে তার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত