বিশেষ সমাবর্তনে বিশেষ নয়ছয়

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৩, ০৯:৫০ এএম

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মরণোত্তর ডক্টর অব লজ ডিগ্রি দিতে গত ২৯ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সমাবর্তনে স্মারক ক্রেস্ট ও কোটপিন সরবরাহে নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। ক্রিয়েটিভ প্লাস ও হাতবাক্স নামের দুটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

নকল ও নিম্নমানের উপাদানে এসব সামগ্রী তৈরি করা হলেও বাছবিচার ছাড়াই গ্রহণ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা ও ঢাবি ছাত্রলীগের বর্তমান-সাবেক কয়েকজন নেতা এ কান্ডে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।

সূত্র জানায়, বিশেষ সমাবর্তনের ২০ হাজার অতিথির স্মারকসামগ্রীর জন্য গত আগস্টে দরপত্র আহ্বান করে ঢাবি কর্তৃপক্ষ। সমাবর্তনের ক্রেস্ট তৈরির জন্য পাঁচটি ও কোটপিন তৈরির জন্য ছয়টি প্রতিষ্ঠান দর প্রস্তাব করে। কিন্তু দরপত্রের নিয়ম ভেঙে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে আর্থিক সুবিধা নিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা বাড়িয়ে ক্রেস্ট তৈরির কাজ দেওয়া হয় তৃতীয় দরদাতা ক্রিয়েটিভ প্লাসকে। অথচ দরপত্রের শর্তই পূরণ করতে পারেনি এ প্রতিষ্ঠান।

সমাবর্তনের জন্য বিদেশি স্বচ্ছ অ্যাক্রিলিক দিয়ে ৬ ইঞ্চি বাই ৪ ইঞ্চি বাই ২৪ মিলিমিটার সাইজ এবং ৪ রঙের ইউভি প্রিন্টে ক্রেস্ট তৈরির কথা বলা হয়। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন তথ্য। ক্রেস্টে বিদেশি অ্যাক্রিলিকের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে দেশি নকল অ্যাক্রিলিক। মাপেও গরমিল রয়েছে। দেশি নকল অ্যাক্রিলিক সাধারণত ২১-২৪ মিলিমিটার হয় বলে নিশ্চিত করেছে নকল উপাদানের জোগালি প্রতিষ্ঠান ফেমাস প্লাস্টিক।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্রিয়েটিভ প্লাস নকল অ্যাক্রিলিক সরবরাহ করেছে ফেমাস প্লাস্টিক থেকে। তারা একটি নকল অ্যাক্রিলিক শিটের দাম চেয়েছে ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ক্রেস্ট তৈরির কাজে স্বনামধন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, একটি নকল অ্যাক্রিলিক শিট দিয়ে ৮০টি ক্রেস্ট বানানো যায়। এ হিসাবে প্রতিটি ক্রেস্টে শুধু অ্যাক্রিলিকের দাম পড়ে ১৫৭ টাকা। কাটিং, ইউভি প্রিন্ট এবং ভ্যাট-ট্যাক্স মিলে ৬৫ টাকা খরচ পড়তে পারে বলে ওই প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। এ হিসাবে একটি ক্রেস্ট তৈরিতে ২২৫ াটাকার মতো খরচ হওয়ার কথা। কিন্তু ক্রেস্টপ্রতি ক্রিয়েটিভ প্লাস নিয়েছে ৪২৫ টাকা। প্রতি ক্রেস্টে অন্তত ২০০ টাকা মুনাফা করেছে তারা। বিশেষ সমাবর্তনের ২০ হাজার ক্রেস্টে প্রায় ৪০ লাখ টাকা বেশি নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

বিশেষ সমাবর্তনের জন্য ২০ হাজার কোটপিনও তৈরি করার সিদ্ধান্ত হয়। দরপত্র আহ্বান করা হলে ছয়টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব জমা দেয়। যাচাই-বাছাই শেষে ‘হাতবাক্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। ২০ হাজার কোটপিনের দাম ১৭ লাখ টাকা দাবি করা হলে দরকষাকষির পর ১৫ লাখ টাকায় কাজ নেয় হাতবাক্স। প্রতিটি কোটপিনের দাম পড়ে ৭৫ টাকা। কোটপিনের সাইজ বৃত্তাকারে ১.৩ ইঞ্চি পুরুত্বের।

বিশেষ সমাবর্তনে দেওয়া কোটপিন যাচাই করতে এটির প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোটপিন পরিমাণে বেশি হলে ৪০ টাকা দামে দেওয়া যায়। ভ্যাট ও টেন্ডার সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যয় ধরে প্রতি পিসের দাম ৫ টাকা বাড়তে পারে। কোটপিনে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান লোহা ব্যবহার করেছে। কিন্তু তামা ব্যবহার করলে যে দাম পড়ত সে দামই রেখেছে। তামা ব্যবহার না করায় তাদের খরচ কম পড়েছে।

ক্রেস্ট-দুর্নীতির সঙ্গে অনেকে জড়িত হলেও অনুসন্ধানে বিশেষভাবে উঠে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. গিয়াস উদ্দিন আহমেদের নাম। তিনি এ কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলে জানা গেছে। কাজ না পাওয়ায় অন্য একটি প্রতিষ্ঠান তার ওপর ক্ষিপ্ত। তারা গিয়াস উদ্দিনকে চাপ দিলে তিনি টাকা ফেরত দিতে চান। কিন্তু টাকা না নিয়ে তারা সমাবর্তনের কাজটি দাবি করে। পরে অবশ্য বিষয়টির মীমাংসা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাবির প্রকৌশল দপ্তরের এক প্রকৌশলী বলেন, ‘এ কাজে ক্রিয়েটিভের কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও অবৈধভাবে তাদের কাজটি পাইয়ে দিয়েছেন গিয়াস উদ্দিন। তিনি দুটি পক্ষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। পরে ঝামেলা হলে এক পক্ষকে টাকা ফেরত দেন।’ কাজটি ক্রিয়েটিভকে পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে ছাত্রলীগের সুমন। ছাত্রলীগের যেসব নেতাকর্মী দরপত্রে অংশ নেন, সেসব দরপত্রে জমা দেওয়া নথিপত্র ঠিক থাকে না।

ক্রিয়েটিভ প্লাসের সঙ্গে জড়িত ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় দপ্তরবিষয়ক উপসম্পাদক শেখ নকিবুল ইসলাম সুমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়েটিভ প্লাসের কাজগুলো করে থাকি। তবে টেন্ডার অনুযায়ী আমার কাজে কোনো ফাঁকফোকর নেই। নকল উপাদানের প্রশ্নই উঠে না। মান ও মূল্য ঠিক রেখেই আমরা ক্রেস্ট ডেলিভারি দিয়েছি।’

দরপত্র ওপেনিং কমিটিতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. গিয়াসউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ কাজের শুরু থেকে আমি ছিলাম এটা ঠিক, তবে কোনো আর্থিক সুবিধা নিইনি। যারা দরপত্র পায় না তারা নানা অভিযোগ তুলে থাকে। টেন্ডার চূড়ান্ত করার জন্য যে কমিটি থাকে, তারাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ, হিসাব পরিচালক ও একাধিক ডিনের সমন্বয়ে একটি কমিটি টেন্ডার ওপেন করার পর চূড়ান্ত বিষয়ে সিন্ডিকেটে সুপারিশ করার জন্য একটি কমিটিও রয়েছে। কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে এটি ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশন দেখে। তাদের মাধ্যমেই কমিটির কাছে দরপত্রগুলো আসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী কমিটি কাজগুলো বিতরণ করে পরে বুঝে নিয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনই মূলত এসব বিষয় দেখভাল করে।’

সার্বিক বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোনকল ধরেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত