ঘুম ভাঙছে নাশকতা প্রতিরোধ কমিটির

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৩, ০৩:৩৮ এএম

সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশ, হরতাল ও অবরোধের মতো কর্মসূচিতে সহিংসতার প্রেক্ষাপটে সক্রিয় করা হচ্ছে সন্ত্রাস ও নাশকতা প্রতিরোধ কমিটিকে। পুলিশ সদর দপ্তরের অনুরোধে সারা দেশে সন্ত্রাস ও নাশকতা প্রতিরোধ কমিটিগুলোকে নতুন করে সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত শনিবার বিএনপির মহাসমাবেশ কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। সংঘর্ষে পুলিশ কনস্টেবল ও যুবদলের এক নেতা নিহত হয়েছেন। রবিবার হরতালের পর মঙ্গলবার থেকে টানা ৭২ ঘণ্টা অবরোধের কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি-জামায়াত। এ সময়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে পুলিশসহ অন্তত সহস্রাধিক। সহিংসতার পাশাপাশি যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। চলতি অবস্থায় বাস-ট্রাকে আগুন জ¦লে উঠছে। সারা দেশেই এ ধরনের ঘটনা ঘটায় মানুষের মধ্যে আবার ২০১৩-১৪ সালের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, ২০১৩ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের নাশকতা প্রতিরোধ করতে ৬৪ জেলায় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটির কার্যক্রম এতদিন ছিল না। এখন সহিংসতার প্রেক্ষাপটে নতুন করে সক্রিয় করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাড়া-মহল্লায় যারা নাশকতা করছে বা করার পরিকল্পনা নিয়েছে, তাদের তালিকা করারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত আবারও দেশের শান্ত পরিবেশ অশান্ত করার চেষ্টা করছে। তারা পুলিশকে টার্গেট করে হামলা করছে। একজন কনস্টেবলকে কুপিয়ে মেরে ফেলেছে। যানবাহন ও পুলিশ বক্সে আগুন দিয়েছে।’ বিএনপি-জামায়াত ২০১৩ ও ’১৮ সালের মতো আবার নাশকতা শুরু করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তারা নির্বাচন ভ-ুল করতে চাচ্ছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নাশকতাকারীদের প্রতিরোধ করা হবেই। কিছুতেই তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। নাশকতা প্রতিরোধ কমিটিগুলো আরও সক্রিয় করতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, কিছুদিন আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, সচিব, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সন্ত্রাস নাশকতা প্রতিরোধ কমিটিগুলো আবারও সক্রিয় করতে হবে। পুলিশ-র‌্যাব, থানা, যানবাহন ও সরকারি স্থাপনায় হামলা চালালে পুলিশ ও র‌্যাবকে তাৎক্ষণিক অ্যাকশনে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গঠিত সন্ত্রাস ও নাশকতা প্রতিরোধ কমিটিতে বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতাদের নাম আছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করতে বলা হয়েছে। যদি কমিটিতে নাম পাওয়া যায়, তাহলে বাদ দিয়ে দিতে বলা হয়েছে। তাছাড়া কমিটিগুলোর বর্তমানে কী অবস্থায় আছে, তা পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। এজন্য জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের কাছে চিঠি পাঠানোর বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। যেসব স্থানে স্পর্শকাতর এলাকায় রয়েছে সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত সার্বক্ষণিকভাবে থাকবে। অপরাধ করার তথ্য নিশ্চিত হলে তাকে সাজা দেবে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

ওই বৈঠকে উপস্থিত থাকা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৬৪ জেলার ডিসি ও এসপিদের কাছে কয়েক দিন আগে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন বানচাল করতে সরকারবিরোধীরা নানাভাবে চক্রান্ত করছে। ইতিমধ্যে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামী নাশকতা শুরু করেছে।

এ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছি সন্ত্রাস ও নাশকতা প্রতিরোধ কমিটি সক্রিয় করতে। কমিটিগুলো হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে ডিসি ও এসপিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এক কথায় বলা যায়, ঘুম থেকে জেগে উঠছে কমিটির কর্মকান্ড।’

জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে গণসংযোগের মাধ্যমে জনমত সৃষ্টি করতে হবে। মহানগর, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘সন্ত্রাস ও নাশকতা প্রতিরোধ কমিটি’ গঠনের মাধ্যমে সেটি অধিকতর কার্যকর ও ফলপ্রসূ করা সম্ভব। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ে নির্বাহী কর্মকর্তার সভাপতিত্বে অবিলম্বে কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে। মহানগর এলাকায় স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। জেলা কমিটির সভায় আলোচনা করে পৌর ও ওয়ার্ড কমিটি, উপজেলা কমিটির সভায় আলোচনাপূর্বক ইউনিয়ন কমিটি গঠন করতে হবে। জেলা পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেলা ও উপজেলা কমিটির সভায় উপদেষ্টা হিসেবে অংশগ্রহণ করবেন। সংসদ সদস্যরা তাদের নিজ এলাকায় অবস্থান করলে তারা বিশেষ আমন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কমিটির সভায় উপস্থিত থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবেন। যাচাই-বাছাই করে কমিটির সদস্য চূড়ান্ত করতে হবে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তা করতে বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিতর্ক এড়াতে যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে কমিটিতে জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় গুরু, মসজিদের ইমাম, সাংবাদিক, উদ্যমী যুবক, শিক্ষার্থীসহ পরিচ্ছন্ন ইমেজের ব্যক্তিদের রাখতে বলা হয়েছে। ডিসি ও পুলিশ সুপারদের মাধ্যমে প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে পারবে। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখার অতিরিক্ত সচিব কাজের তদারকি করবেন। যারা সন্ত্রাস ও নাশকতা সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।

২০১৩ সালের ৬ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ‘সন্ত্রাস ও নাশকতা প্রতিরোধ কমিটি’ গঠনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন শাখা থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব ও সব বিভাগীয় কমিশনারকে কমিটি গঠনের নির্দেশনার পরিপত্র জারি করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত