রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে অধিকাংশ ইসলামি দল। বিশেষ করে সরকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই এমন ইসলামি দলগুলোও এখন নির্বাচন প্রশ্নে চুপ। তারা পরিস্থিতি কোন দিকে যায় সেদিকে সতর্ক নজর রাখছে। বিএনপির নেতৃত্বে সরকারবিরোধী আন্দোলন ও কর্মসূচির পরিণতি কী হয় তা দেখে তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। রাজপথে সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে অধিকাংশ দলের অনুপস্থিতি লক্ষ করা গেছে।
এ মুহূর্তে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও ইসলামী আন্দোলন ছাড়া অন্য ইসলামি দলগুলো মাঠে তেমন সক্রিয় নয়। উল্লিখিত দল দুটি নির্দলীয় জাতীয় সরকারের অধীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে রাজপথে রয়েছে। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ওপর সরকারের কড়া নজরদারি থাকায় সরকারবিরোধী আন্দোলনে জড়ানোর ব্যাপারে তারা বেশ সতর্ক। যদিও অধিকাংশ ইসলামি দলের নেতারাই মনে করেন, খাদ্যদ্রব্যের অস্বাভাবিক হারে মূল্য বাড়ায় ক্ষমতাসীনদের ওপর মানুষ চরম ক্ষুব্ধ এবং বিরক্ত। এমন প্রেক্ষাপটে প্রলুব্ধ হয়ে কোনো কোনো দল সরকারের সহযোগী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিলে তারা নীতিনৈতিকতার প্রশ্নে মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
জানা গেছে, আগামীকাল শনিবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ডাকা সংলাপে অধিকাংশ দলই অংশ নেবে না।
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ইসলামি দল ১০টি। এগুলো হলো বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (এর দুটি অংশ। একটি নিবন্ধিত), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (এর দুটি অংশ। একটি নিবন্ধিত), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল)।
এসবের মধ্যে কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক দল হচ্ছে ইসলামী আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও খেলাফত মজলিস। চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন ছাড়া বাকি পাঁচটি দল হেফাজতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাজনৈতিক দল না হলেও যেহেতু সংগঠনটির নেতারা বিভিন্ন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাই বিভিন্ন মহলের নজর তাদের ওপর বেশি বলে মনে করছে হেফাজতের অনেক নেতা।
সংগঠনের নেতাকর্মীরা যাতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে না জড়ায় সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে বলে সংগঠনটির নেতাদের দাবি। আবার খেলাফত আন্দোলন ছাড়া বাকি ৫টি দল (ইসলামী আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও খেলাফত মজলিস) একসময় বিএনপির সঙ্গে জোটে ছিল। নানামুখী চাপে দলগুলোর কোনোটিই এখন বিএনপির সঙ্গে নেই। তবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও ইসলামী ঐক্যজোট নামে দুটি খণ্ডিত অংশ বিএনপির সঙ্গে আছে। এদের ইসিতে নিবন্ধন নেই।
জানা গেছে, সরকারের জোটে থাকা তরিকত ফেডারেশন বাদে নিবন্ধিত দলের কোনোটিই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত করেনি। তারা দ্বাদশ জাতীয় সংসদের তফসিলের ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। পরে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেবে।
ইসিতে নিবন্ধিত খেলাফত মজলিসের একাংশের মহাসচিব আহমেদ আব্দুল কাদের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে নেই। তবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে আমরা নির্বাচন চাই। সেজন্য আমরা নানা কর্মসূচি পালন করছি।’ ইসির ডাকা সংলাপে তার দল অংশ নেবে না বলেও জানান তিনি।
সরকারবিরোধী আন্দোলনে বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও ইসলামী আন্দোলন ছাড়া অন্য কোনো ইসলামি দল মাঠে তেমন সক্রিয় নয়। উল্লিখিত দল দুটি নির্দলীয় জাতীয় সরকারের অধীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে মাঠে আছে। জামায়াতে ইসলামী ২৮ অক্টোবর রাজধানীর আরামবাগে এক দফার দাবিতে বিএনপি-ঘোষিত মহাসমাবেশে অংশ নিয়েছে। বিএনপির হরতাল ও তিন দিনের অবরোধ কর্মসূচিতেও সমর্থন দিয়েছে। আগামী ৫ ও ৬ নভেম্বর বিএনপির অবরোধ কর্মসূচিতেও তারা সমর্থন দেবে।
আজ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের উদ্যোগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মহাসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে সংসদ ভেঙে দিয়ে জাতীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতির প্রবর্তন ও ব্যর্থ নির্বাচন কমিশন বাতিলের দাবিতে বাদ জুমা এ সমাবেশ হবে। সমাবেশ থেকে নির্বাচন কমিশন ঘেরাও, দেশব্যাপী বিক্ষোভের কর্মসূচিও আসতে পারে বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সব সময় নির্বাচনের পক্ষে। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমাদের দলের প্রার্থীর ওপর হামলা ও নানা জায়গায় ভোট কারচুপির পর এ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দ্বারা সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না, সেটি একেবারে পরিষ্কার। তাই আমরা এখন আন্দোলনে মনোযোগী। আমরা এ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাব না। আমরা জাতীয় সরকারের দাবিতে মাঠে আছি।’
দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া উপকমিটির সহকারী সমন্বয়কারী শহিদুল ইসলাম কবির জানান, ইসির ডাকা সংলাপে তারা অংশ নেবেন না।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট নয় সাধারণ মানুষ, তারা ক্ষমতাসীনদের ওপর ক্ষুব্ধ, বিরক্ত। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের সহযোগী হয়ে নির্বাচনে গেলে নীতিনৈতিকতার প্রশ্নে মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে, এমন কয়েকটি ইসলামি দল রয়েছে। তবে তারা নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষে। একই সঙ্গে সরকারের নেতিবাচক দিকগুলোও তুলে ধরার পক্ষে তারা। নিবন্ধিত এমন একটি ইসলামি দল ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ।
দলটির চেয়ারম্যান সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সংলাপে যাব। নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিয়েছি। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা সভা-সমাবেশ, বিবৃতির মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য কমাতে সরকারকে বলছি। কিন্তু তারা সিন্ডিকেট ভেঙে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। যেটা ভালো সেটা আমরা সমর্থন করি। কিন্তু যেটি নেতিবাচক তার সমালোচনাও আমরা করব।’
