আন্দোলনের পরিণতি জনকল্যাণকর

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:২৮ এএম

আওয়ামী লীগ মনে করছে, ২৮ অক্টোবর রাজনৈতিক শক্তির লড়াইয়ে তাদের জয় হয়েছে। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘গত ২৮ অক্টোবর কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা হয়ে গেছে। সেই খেলায় আমরা জিতে গেছি।’ স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে তাহলে সেদিন তারা খেলেছিলেন? তার দলের স্টাইকাররাই তাহলে প্রধান বিচারপতির বাসভবন, পুলিশ হাসপাতালে অফসাইডে গোল দিয়েছে! সাধারণ মানুষ ভেবেছিল, খেলোয়াড় সব বিএনপির। এটাই কি ওবায়দুল কাদেরের সেই ‘খেলা হবে’? সেই খেলাটা যে এ রকম বোঝা গেল, সেমিফাইনাল জিতে যাওয়ার ঘোষণায়। বিএনপিকে চাপে ফেলে নির্বাচনে আনার কৌশল কতটা কাজে দেবে, তা দেখার জন্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের ভাষায় ‘ফাইনাল’ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু বিপুল সমর্থক গোষ্ঠী আছে, এমন একটি রাজনৈতিক দলকে যে ধুয়েমুছে ফেলা যায় না, তার নজির আওয়ামী লীগ নিজেই। ২১ বছর তাদের ক্ষমতার বাইরে থাকতে হয়েছে, কেন থাকতে হয়েছে, কী কারণে থাকতে হয়েছে, তাদের এখন সেই পর্যালোচনা নেই। রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার করে রাজনৈতিক দলকে দমন করা শেষ অবধি রাজনীতির জন্য কল্যাণকর নয়।

দুই : নির্বাচনের আগে মানুষ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলবে, সেটা তো অস্বাভাবিক কোনো চাওয়া নয়। ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য থেকে যা বোঝা যায় তা হলো, দিল্লির সমর্থন থাকায় আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় থাকছে। এটা ছাড়া ‘চিন্তার কিছু নেই’ বলার আর মানে কী হতে পারে? এমন একটি কথা আমাদের দেশ ও মানুষের সার্বভৌমত্ব ও সম্মান নিয়ে কী মেসেজ দেয়? প্রতিবেশী দেশ যদি নির্ধারণ করে দেয় যে, এ দেশের ক্ষমতায় কে থাকবে তাহলে সরকারের স্বাধীনতা সম্পর্কে কী তাৎপর্য পাওয়া যায়? আর আমাদের নির্বাচনের যৌক্তিকতা কী? এমন প্রশ্ন ওঠা খুবই প্রাসঙ্গিক, আমরা ভোটাররা কোথায় আছি? কেন আমরা এই পরিস্থিতি মেনে নিতে বাধ্য হব? আমরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পেতে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিষয়ে আমাদের মত প্রকাশ করতে; যারা আগামীতে ক্ষমতায় আসতে চাইছে, তাদের পরিকল্পনা ও ভাবনার বিষয়ে আমাদের কথা জানান দিতে; যে বিষয়গুলো আমরা অপছন্দ করি, একই সঙ্গে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎকে যেভাবে দেখতে চাই, সে বিষয়ে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি জানাতে ৫ বছর অপেক্ষা করি। এসব তখনই সম্ভব হয়, যখন দেশের মানুষ একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে।

২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৩ জন সংসদ সদস্য ‘নির্বাচিত’ হন। ৩০০ আসনের সংসদের ক্ষেত্রে বলা যায়, সরকার গঠনে বেশিরভাগ সদস্যই একটি ভোটও না পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই তথাকথিত নির্বাচন ‘আইনত সঠিক’ ছিল। কিন্তু সেগুলো কি নৈতিকতার মাপকাঠিতে সঠিক ছিল? একে কি গণতন্ত্রের চর্চা বলা যায়? এই তো দুদিন আগে লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে উপনির্বাচনে ৫৭ সেকেন্ডে ব্যালেট পেপারে ৪৩ ভোট দেওয়ার যে ভিডিও ভাইরাল হলো, তাকে কি সুষ্ঠু নির্বাচনের আলামত বলা যায়? এবার নির্বাচনের ‘ফল’ নিয়ে বহিঃশক্তির সঙ্গে ‘দর-কষাকষি’ চলছে। এভাবেই কি বাংলাদেশে গণতন্ত্র কাজ করছে?

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর, দীর্ঘ প্রায় ৩৩ বছরে অবস্থার কোনোই উন্নতি হয়নি। বরং ক্রমেই তা অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। যে রাজনীতিক প্রতিপক্ষের প্রতি যত বেশি খিস্তিখেউড় করতে পারেন, তিনি তত বেশি বড় আর কর্মীবান্ধব নেতা! এ দীর্ঘ সময়ে দেশে অবকাঠামোগত অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু বন্ধ হয়ে গেছে মতপ্রকাশ তথা গণতন্ত্রের সব বাতাবরণ। মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রায় সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। অবস্থা এমনই এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকারি দলের বাইরের সবাই নিজেকে ‘নিজ বাসভূমে’ উদ্বাস্তু মনে করছেন। আমলাতন্ত্র থেকে বিচার বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায় এর বিস্তার ঘটেছে।

তিন : বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বা সরকার পতনের জন্য যে আন্দোলন করছে, দিন দিন সে আন্দোলন মোকাবিলা করা আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির দাবির যৌক্তিকতা আরও বেশি জোরালো হয়ে উঠছিল। শত উসকানি সত্ত্বেও বিএনপি সহিংসতার পথে যায়নি। জনসভাগুলোতে বিপুল লোকসমাগম ঘটিয়েছে। কোনো প্রকার সহিংসতা ছাড়া আন্দোলন এগিয়ে নিয়েছে। সরকার প্রতিনিয়ত কোণঠাসা হয়ে পড়ছিল, তা মুখে প্রকাশ না করলেও,  তাদের আচরণে-ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় বেশ বোঝা যাচ্ছিল। মনোবল হারাচ্ছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগ বারবার বলার চেষ্টা করছিল যে, বিএনপি একটি সন্ত্রাসী দল, তারা দেশের মানুষের জানমালের ক্ষতি করে। অবশেষে ২৮ অক্টোবর বিএনপি তাদের আন্দোলনকে আর অহিংস রাখতে পারেনি। সহিংস রূপ নিল বিএনপির আন্দোলন। এতে রাজনৈতিকভাবে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু বিএনপি যে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে, সেটি কি মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে? পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো আন্দোলনের ক্ষেত্রে মুখ থুবড়ে পড়ার নজির নেই।

আমরা যদি ভুলে না যাই, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরও একই দাবিতে লগি-বৈঠার আন্দোলন হয়েছিল। সে সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। সে আন্দোলনকে দমানোর চেষ্টা করেছিল তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পারেনি। জনগণ যদি স্বতঃস্ফূর্ত হয়, তাহলে কোনো আন্দোলনই বৃথা যায় না। কোনো না কোনো সময়ই তা ঘুরে দাঁড়াবে। সাময়িক আন্দোলন স্থবির হয়, সে আন্দোলন মানুষের ভেতর থেকেই চাঙা হয়। সেটাকে আটকানোর সাধ্য কারোর নেই।

চার : দ্রব্যমূল্যের উত্তাপকে ছাপিয়ে গেছে চলমান রাজনৈতিক উত্তাপ। মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে রাজপথে নামা পোশাকশ্রমিকরা নিজেদের দুঃসহ জীবনের কথা তুলে ধরে দুঃশাসন হটানোর আওয়াজ তুলে আন্দোলন করছেন। জনমত, সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ, হরতাল, অবরোধ সরকারকে তার কর্তৃত্ববাদী অবস্থান থেকে টলাতে পারছে না। অতীতের থেকে আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে সভা-সমাবেশ পণ্ড করা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, হামলা-মামলা, ভয়ের রাজত্ব কায়েম করা, হুমকি-ধমকি চলছে পুরনো কায়দায়। জীবন দিতে হচ্ছে মানুষকে। নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে অনেক পরিবার। সাধারণ মানুষের আর্থিক সংকটের মধ্যে জীবন-জীবিকা ব্যাহত হচ্ছে। চলতি সময়ে ‘দিন আনি দিন খাই’ মানুষের আয় আরও কমে গেলেও নিত্যপণ্যের দাম আবারও বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। দেশের অর্থনৈতিক সংকটের নানা উপসর্গ দৃশ্যমান হচ্ছে। এর মধ্যে কাজ শেষ না হলেও আরও ব্যয় বৃদ্ধি করে মেগা প্রকল্প উদ্বোধন ও নতুন নতুন প্রকল্প নেওয়া থেমে নেই। এসব উন্নয়ন সাধারণ মানুষের জীবন স্পর্শ করছে না। টানেলের আলোচনা পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে টানছে না।

যখন যে দল ক্ষমতায় আসছে, তারাই বিরোধী মত দমনে হয়ে উঠছে খড়্্গহস্ত। ফলে বাড়ছে দুর্নীতি, বাড়ছে অপশাসনের দৌরাত্ম্য। আর এ অবস্থারই অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে কর্র্তৃত্ববাদিতা। সরকারি দলের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব নেতার স্বরে এর সুর স্পষ্ট। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অজুহাতে সরকার যেভাবে দমনপীড়ন চালাচ্ছে, সেটা বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয় যে বিরোধী দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। সরকার উন্নয়নের যত সূচকই ছুঁয়ে যাক না কেন, এর কোনোটিই বিরোধীদের দমনে দায়ের করা মামলা সংখ্যার রেকর্ডের ধারেকাছেও নেই। কোনো পরিসংখ্যানের দরকার নেই। দেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী দলের বিরুদ্ধে মামলার যে উদাহরণ সামনে এসেছে, সেটাই প্রমাণ করে যে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সরকার ও আওয়ামী লীগের সব দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয়।

পাঁচ : ধারণা করা যায়, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিলেই বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো সবাই নড়ে-চড়ে বসবে। ‘সরকার পতনের একদফার আন্দোলনে’ আওয়ামী লীগ ভীত নয়। কিন্তু বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচনে এলে সেটা মোকাবিলা করা তাদের জন্য এর চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তা অবশ্যই দেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক হবে। অবশ্যই আমাদের ‘আইনত সঠিক’ নির্বাচন প্রয়োজন, কিন্তু সেটা একই সঙ্গে ‘বিশ^াসযোগ্য’ নির্বাচন হতে হবে। এটা কিন্তু বর্তমান আন্দোলনেরই পরিণতি এ কথা ভুলে গেলে বড় ধরনের ‘ভুল’ হবে। খুব শিগগিরই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। সাধারণ মানুষও ফিরে পাবে রাজনৈতিক স্বস্তি।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত