বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা দলগুলোর ডাকা হরতাল-অবরোধে গত ২৮ অক্টোবর থেকে গতকাল শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত রাজধানীতে ৬৪টি বাসে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়েছে। আর এ সময়ে যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানায় ৬৪টি মামলা হয়েছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন গতকাল ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।
এদিকে যানবাহন ও বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগসহ নাশকতার অভিযোগে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা দলগুলোর নেতাকর্মীদের ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা) আরও ৫৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এদিকে বিএনপি-জামায়াতের ডাকা তৃতীয় দফা অবরোধের শেষ সময়ে গতকাল ভোরে বরিশাল সদর উপজেলায় রাস্তার পাশে রাখা একটি বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
হরতাল অবরোধে যানবাহনে অগ্নিসংযোগের বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ড. খ. মহিদ উদ্দিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘২৮ অক্টোবর মহাসমাশের পর হরতাল ও অবরোধের ঘটনায় গত ১২ দিনে ঢাকা মহানগর এলাকায় ৬৪টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে পুলিশ জানতে পেরেছে যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দুষ্কৃতকারীরা যাত্রীবেশে গাড়িতে উঠে এবং সময়-সুযোগ বুঝে গাড়িতে আগুন দিয়ে নেমে যায়। গাড়ির পেছন থেকে খুব দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে এমন ধরনের দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে তারা। এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিভিন্ন এলাকা থেকে। ওই সময় তাদের কাছ থেকে পেট্রোল, গান পাউডার, তুলা, পুরনো কাপড় ইত্যাদি জব্দ করা হয়েছে।’
গ্রেপ্তারকৃতরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত কি না, জানতে চাইলে ডিএমপির এই শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলেন, ‘১২ জনই অবরোধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এদের দেখা যায় একজন আরেকজনকে নিয়োগ দিচ্ছে। আরেকজন আবার আরেকজনকে নিয়োগ করছে। তারা এগুলো করছে অবরোধের কর্মসূচিকে সাধারণ জনগণের মনে ভীতি সঞ্চার করার জন্য। যেন মানুষ রাস্তায় না নামে এবং স্বাভাবিকভাবে চলাচল না করে।’
অগ্নিসংযোগে গ্রেপ্তারকৃতরা টাকার বিনিময়ে এগুলো করেছে কি না, জানতে চাইলে খ. মহিদ উদ্দিন বলেন, তারা এ ধরনের দু-একটি অভিযোগ পেয়েছেন। সেগুলো পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করে দেখছেন। তাদের আসলে প্রলোভন দেখানো হয় যে, তারা যদি তাদের জায়গা ঠিক রাখতে চায় তবে সেটি প্রমাণ করতে হবে। কাজগুলো করে দিতে হবে।
নাশকতা যারা করছে তাদের ধরার ক্ষেত্রে কোনো তালিকা করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, ‘আমাদের আসলে পুলিশের পক্ষ থেকে যে যে উদ্যোগ নেওয়া দরকার, যেমন তাদের চিহ্নিত করা, ডকুমেন্টেশন করা, তাদের পেছনে কারা আছে, সেগুলো প্রতিটি নিয়ে আমাদের কাজ চলছে। আমরা চেষ্টা করছি প্রফেশনালি (পেশাদারিত্বের সঙ্গে) এগুলো করার জন্য।’
গ্রেপ্তার আরও ৪০ : রাজধানীর পল্টন এলাকায় গত ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ চলাকালে সংঘর্ষের সময় পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত অভিযোগে একজনকে আটক করেছে র্যাব। গ্রেপ্তার গোলাম মোস্তফা ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাভার উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। গতকাল র্যাব-৪-এর একটি দল তাকে আশুলিয়া থেকে আটক করে। র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, গোলাম মোস্তফা কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা ও পুলিশ কনস্টেবল আমিরুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে সাভারসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মারামারি, হত্যা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, নাশকতাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।
অন্যদিকে নাশকতার মামলায় যুবদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি রেজাউল কবীর পলকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১০ একটি দল। গতকাল দুপুরে রাজধানীর ধানম-ি এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয় বলে জানায় র্যাব। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয় দিয়ে পলকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ ছাড়া গতকাল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে নাশকতায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরও ২৭ জনকে র্যাব গ্রেপ্তার করেছে। রাজধানীতে দেড় শতাধিক টহল দলসহ সারা দেশে র্যাবের সাড়ে চার শতাধিক টহল দল মোতায়েন রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও সড়কগুলোতে র্যাবের রোবাস্ট টহল পরিচালিত হচ্ছে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নিরাপত্তা প্রদানে দেশের বিভিন্ন স্থানে দূরপাল্লার গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনে স্কর্ট দেওয়ার মাধ্যমে নিরাপদে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিচ্ছে র্যাব।
বরগুনার আমতলীতে বাস পোড়ানোর ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার রাতে ৬৮ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে। এ মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে আরও অনেককে। নাশকতার এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে নয়জনকে। তাদের গতকাল সকালে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টা দিকে আমতলীর আরপাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের আরপাঙ্গাশিয়া বাজারের দক্ষিণ পাশে সাকুরা পরিবহনের ওই বাসটি ভাঙচুর করে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।
বগুড়ার আদমদীঘিতে ককটেল বিস্ফোরণের মামলায় বিএনপির দুই কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলো শিবপুব গ্রামের বদের উদ্দিনের ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তাক এবং শিয়ালশন গ্রামের আনিছুর রহমানের ছেলে ফাহিম হোসেন।
কুমিল্লার লাকসামে উপজেলা জামায়াতের আমির হাফেজ জহিরুল ইসলামসহ দলটির ১৪ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল দুপুরে উপজেলার বাকই ইউপির জামিয়াতুস সুন্নাহ তাহফীজুল কুরআন মাদ্রাসা থেকে তাদের আটক করা হয়।
বরিশালে অবরোধের শেষ সময়ে বাসে আগুন : বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের চরআইচা গ্রামে রাস্তার পাশে রাখা মরিয়ম-ফাতেমা পরিবহনের বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের বন্দর থানার ওসি আবদুর রহমান মুকুল জানান, চরআইচা গ্রামের এআর খান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশে বাসটি থামানো ছিল। হঠাৎ করে ভোরে এলাকাবাসী বাসটিতে আগুন জ¦লতে দেখতে পেয়ে বিষয়টি পুলিশকে জানায়। বাসের মালিক হাবিবুর রহমান সোহেল জানান, আগুনে বাসের ভেতরে সিট ও সিলিং পুড়ে গেছে। শুধু কাঠামো টিকে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাসটি পুনরায় সচল করা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
নাশকতা মামলার আসামিকে আটকের পর ছেড়ে দিল পুলিশ : মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাসে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণ মামলার আসামি ছাত্রদলকর্মী শিমুল সরকার সাদ্দামকে (২৯) আটক করেও ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। গতকাল দুপুরে ভবেরচর বাজার এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। তবে তাকে থানা হেফাজতে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দেওয়া হয়। এ নিয়ে গজারিয়া উপজেলা জুড়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। ছাত্রদলকর্মী শিমুল গত ২৮ অক্টোবর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মিনিবাসে আগুন দেওয়া এবং ২০২২ সালে মহাসড়কে ককটেল বিস্ফোরণ ও ছাত্রলীগকর্মীদের মারধর করার ঘটনায় হওয়া মামলার এজহারনামীয় আসামি।
ভবেরচর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি লোকমান হোসেন সরকার দাবি করেন, ছাত্রদলকর্মী শিমুল সরকার সাদ্দামকে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর তদবিরের কারণে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে গজারিয়া থানার ওসি মোল্লা সোহেব আলী বলেন, ‘সাদ্দাম আসলে অপরাধী নয়। নাম বিভ্রাটের কারণে মামলায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। উপজেলা ছাত্রদল নেতা হানিফ প্রধান সাদ্দামের জায়গায় তার নাম এসেছে। সার্বিক দিক বিবেচনা করে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’
জামায়াত নেতাকে রক্তাক্ত করে রাস্তায় ফেলে গেল দুর্বৃত্তরা : নাটোরের সিংড়ায় এক জামায়াত নেতাকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে রক্তাক্ত করে রাস্তায় ফেলে গেছে দুর্বৃত্তরা। আহত জামায়াত নেতার নাম হাফেজ আবদুর রাজ্জাক। তিনি ছাতারদীঘি ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি ও করচমারিয়া গ্রামের বাসিন্দা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল দুপুর ২টায় জুমার নামাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে উপজেলার কালীগঞ্জ এলাকা থেকে অস্ত্র দেখিয়ে রাজ্জাককে মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়। পরে পার্শ্ববর্তী নন্দীগ্রাম উপজেলার একটি সড়কে তাকে চোখবাঁধা ও রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান পথচারীরা। নাটোরের পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘এমন একটি ঘটনা শুনেছি। বিষয়টির ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছে পুলিশ।’
* প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা
