১৯৫০-এর ঢাকা হাইকোর্ট

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:৪৪ এএম

১৯৫০-এর ঢাকা হাইকোর্ট : সবাই সেলেব্রিটি

১৯২১ সালের ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের সদস্য মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৫০ পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তার বেতন ধার্য হয় ৪৫০০ রুপি। সে সময় মাসিক ৪০০০ রুপি বেতনের সাতজন জজ হাইকোর্টে কর্মরত ছিলেন। তারা হচ্ছেন :

১. আর্নেস্ট চার্লস অরমন্ড (বার-অ্যাট ল’), নিয়োগের তারিখ ১৫ আগস্ট ১৯৪৭।

২. থোমাস হোবার্ট এলিস (আইসিএস), ১৫ আগস্ট ১৯৪৭।

৩. আমির উদ্দীন আহমদ, ১৫ আগস্ট ১৯৪৭।

৪. আমিন আহমদ (বার-এট ল’) ১৫ আগস্ট ১৯৪৭।

৫. এম এ ইস্পাহানি (বার-এট ল’) ৭ নভেম্বর ১৯৪৯।

৬. মুহাম্মদ ইব্রাহিম, ৭ নভেম্বর ১৯৪৯।

৭. ফজলে আকবর (বার-অ্যাট ল’) ৭ নভেম্বর ১৯৪৯।

প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের জন্ম মাদ্রাজে ১৮৯৫ সালে। তিনি তিনটি জেলায় ডিস্ট্রিক্ট জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৪৩-এর ফেব্রুয়ারিতে মাদ্রাজ হাইকোর্টে যোগ দেন। ভারত ভাগের পর তিনি পাকিস্তানে চলে আসার জন্য অপশন দেন। তিনি সিন্ধু হাইকোর্টে বিচারকের দায়িত্ব পালনের পর ঢাকায় প্রধান বিচারপতি হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান ফেডারেল সুপ্রিম কোর্টে যোগ দেন। এই দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ২২ ডিসেম্বর ১৯৫৪ থেকে ১৪ জুন ১৯৫৫ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন। তার সঙ্গে আলোচনা না করে পূর্ব পাকিস্তানের সরকার বদল করায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে গভর্নরের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং পাকিস্তান ফেডারেল কোর্টে ফিরে যান। ৩ মে ১৯৬০ তিনি পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং মাত্র ৯ দিনের মাথায় ১২ মে ১৯৬০ মৃত্যুবরণ করেন।

পাকিস্তান (অস্থায়ী সংবিধান) আদেশ ১৯৪৭ অনুযায়ী গঠিত হাইকোর্ট অব জুডিকেচার অব ইস্টবেঙ্গল-এর প্রথম প্রধান বিচারপতি আবু সালেহ মুহাম্মদ আকরাম ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৫০ সালে কর্মরত বিচারকের ব্যাচটিকে অসাধারণ কীর্তিমান বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। মোট ৮ জন বিচারপতির ৫ জন পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দুজন পাকিস্তান ফেডারেল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হয়েছেন।

থোমাস হোবার্ট এলিস (১৯৫৩-৫৪) : শাহাবুদ্দিন ছাড়া হাইকোর্টের অপর চার প্রধান বিচারপতি হচ্ছেন থোমাস হোবার্ট এলিস (১৯৫৩-৫৪), আমির উদ্দীন আহমদ (১৯৫৪-১৯৫৬), আমিন আহমেদ (১৯৫৬-১৯৫৯), এম এ ইস্পাহানি (১৯৫৯-১৯৬২) আর ফেডারেল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দুজন হচ্ছেন শাহাবুদ্দিন এবং ফজলে আকবর।

শাহাবুদ্দিন, টি এইচ এলিস এবং আমির উদ্দীন আহমদ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরও ছিলেন।

স্যার থোমাস হোবার্ট এলিসের জন্ম ইংল্যান্ডের লিডস-এ ১৮৯৪ সালে। ম্যানচেস্টার গ্রামার স্কুল এবং অক্সফোর্ড বিশ^বিদ্যালয়ের কুইনস কলেজে পড়াশোনা করে তিনি ১৯১৯ সালে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। কয়েকটি মহকুমায় এসডিওর দায়িত্ব পালন করার পর যশোর জেলার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ নিযুক্ত হন। ১৯৩৮ সালে  শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক প্রতিষ্ঠিত ঋণ সালিশী বোর্ডের তিনিই ছিলেন চেয়ারম্যান। তিনি ১৯৪৪-৪৭ কলকাতা হাইকোর্টের অতিরিক্ত জজ এবং ১৯৪৭-৫৩ সালে ঢাকা হাইকোর্টের জজ নিযুক্ত হন। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে একুশের গোলাগুলির তদন্ত সম্পাদনের জন্য তাকে কিছুদিনের জন্য অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি করা হয় (সেকালের ওএসডি ও একালের ওএসডির তফাৎটা বুঝুন!) ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৪’র সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনের পর ২৫ অক্টোবর থেকে ২২ ডিসেম্বর ১৯৪৪ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরও ছিলেন।

অবিবাহিত হোবার্ট এলিস রসিক ও খোশমেজাজের অধিকারী ছিলেন। গভর্নর হাউজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের একটিতে দাওয়াত পাওয়া একজন নারী অতিথি মেম সাহেবকে না আনার কারণ গভর্নরকে জিজ্ঞেস করলেন। গভর্নর জানালেন তিনি ব্যাচেলর।

গভর্নর সাহেবকে অপ্রস্তুত করে ঐ মহিলা বলেন : এ অবস্থায় রাতে আপনার ঘুম আসে কী করে? কিছুটা বিব্রত হলেও তিনি স্বাভাবিকভাবে জবাব দেন, ‘ম্যাডাম আমি একলা শুই এবং খুব আরামে ঘুমাই।’ (রাজভবন থেকে বঙ্গভবন-আবু জাফর)

এলিস গভর্নর থাকাকালেই ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান পত্রিকার একজন সাংবাদিক পূর্ব বাংলা ঘুরে, গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন তাতে উল্লেখ করেন ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশদের বিদায় হয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও পাকিস্তানের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখনো একজন ইংরেজ শাসকের অধীনে রয়েছেন। প্রতিবেদনটি কেন্দ্রীয় সরকারকে বিব্রত করে। তখন গভর্নর এলিসকে প্রত্যাহার করা হয়।

বিচারপতি আমির উদ্দীন আহমদ পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি, জন্ম ২২ ডিসেম্বর ১৮৯৫। ১ এপ্রিল ১৯৪২ তিনি ডেপুটি লিগ্যাল রিমেমব্র্যান্সার পদে যোগ দেন এবং ৬ জানুয়ারি ১৯৪৭ কলকাতা হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি নিযুক্ত হন। ভারত ভাগ হলে তিনি পাকিস্তান পছন্দ করে নেন এবং ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ অর্থাৎ স্বাধীনতা লাভের পরদিনই ঢাকা হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫১ রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি তিন বিচারকের একজন নির্বাচিত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি ছিলেন বাউন্ডারি কমিশনের চেয়ারম্যান। তিনি ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৫৪ ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৪ জুন ১৯৫৫ তিনি পূর্ব বাংলার গভর্নর হন। তিনি গভর্নর থাকাকালে এক ইউনিট স্কিমে প্রদেশের নাম ইস্ট বেঙ্গল থেকে বদলে ইস্ট পাকিস্তান- পূর্ব পাকিস্তান রাখা হয়। বহু ভাষাবিদ ও প-িত আমির উদ্দীন ৯ মার্চ ১৯৫৬ পাকিস্তান ফেডারেল কোর্টের বিচারপতি হন। ১৯ জানুয়ারি ১৯৬৫ তিনি ৬৯ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন।

রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করতে হয়। এটা ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল আকবরের নেতৃত্বে লিয়াকত আলী খান সরকারের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার ষড়যন্ত্র। মেজর জেনারেল আকবর ছিলেন চিফ জেনারেল স্টাফ। ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে আরও ছিলেন: এয়ার কমোডর এম কে জানজুয়া, মেজর জেনারেল নাজির আহমদ, ব্রিগেডিয়ার সাদিক খান, ব্রিগেডিয়ার এম এ লতিফ খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিয়াউদ্দিন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিয়াজ মুহাম্মদ আরবার, ক্যাপ্টেন খিজির হায়াত, মেজর হাসান খান, মেজর ইসহাক মুহাম্মদ, ক্যাপ্টেন জাফরুল্লাহ, মিসেস নাসিম শাহনেওয়াজ খান (মিসেস আকবর), কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, সৈয়দ সাজ্জাদ জহির এবং মুহাম্মদ হোসেন আতা। তাদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন হোসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ষড়যন্ত্র প্রমাণিত হয় এবং অনেকের দীর্ঘমেয়াদি কারাদ- হয়। এ সময় সেনাপ্রধান আইয়ুব খান সরকার অনুগত থেকে অভ্যুত্থান ষড়যন্ত্র রহিত করে নিজেই ১৯৫৮-র অক্টোবরে নীরব অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে দেশছাড়া করে নিজে ক্ষমতায় আসীন হন।

বিচারপতি আমিন আহমদ ফেনীর সোনাগাজীতে ১ অক্টোবর ১৮৯৯ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের অর্থনীতির স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ। কেমব্রিজ বিশ^বিদ্যালয় থেকেও অর্থনীতি ও আইনশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি নেন। ১৯২৪ সালে ইংল্যান্ডের গ্রে’স ইন থেকে ব্যারিস্টার হন। দেশে ফিরে কলকাতা বার-এ যোগ দেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রে অধ্যাপনা করতে থাকেন। ১৯৪৭ সালে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর পাকিস্তান চলে আসেন এবং ঢাকা হাইকোর্টে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৯ অবসরগ্রহণের আগ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির আসনে অভিষিক্ত করেছেন। তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ অ্যা পিপ ইটু দ্য পাস্ট। ৫ ডিসেম্বর ১৯৯১ তিনি ৯২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

বিচারপতি মির্জা আলি ইস্পাহানি (এম এ ইস্পাহানি), জন্ম ১৯০০ কলকাতায়। ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টার হয়ে ফিরে আসেন। ১৯৪৭-এ ঢাকায় এসে ৭ নভেম্বর ১৯৪৯ হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর পাকিস্তান চলে আসেন এবং ঢাকা হাইকোর্টে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। তিনি প্রাদশিক সরকারের আইন সচিবও ছিলেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত তিনি ঢাকা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ১৯৮২ সালে পরলোকগমন করেন।

বিচারপতি ইব্রাহিম ঢাকা হাইকোর্টের বিচারক, পাকিস্তানের ফেডারেল আইনমন্ত্রী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। তার জন্ম ১৮৯৪ সালে ফরিদপুরের সদরপুর। বরিশাল জিলা স্কুল এবং ঢাকা কলেজের ছাত্র। ইংরেজি ও আইনে ডিগ্রি নিয়েছেন। ১৯২৪-এ ঢাকা বার-এ যোগ দেন, ১৯২৪ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন শিক্ষকতাও করেন। ১৯৪৩ সালে ঢাকার অ্যাডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট জজ ছিলেন এবং ১৯৫০ সালে ঢাকা হাইকোর্টের জজ হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৫৬-তে ঢাকা হাইকোর্ট থেকে অবসর নেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর এবং ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের কেবিনেটে আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৩ অক্টোবর ১৯৬৬ তিনি পরলোকগমন করেন।

ফজলে আকবর (জন্ম ১৯০৩ : মৃত্যু জানা নেই) কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, লন্ডনের লিঙ্কনস ইন থেকে ১৯৬০ সালে ব্যারিস্টার হন। ১৯৪৩ সালে ডিস্ট্রিক্ট জজ, ১৯৪৭-এ ঢাকা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার এবং ১৯৪৯-এ হাইকোর্টের বিচারক হন। ১৯৬০ সালে তিনি পাকিস্তান ফেডারেল সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হন এবং ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ঢাকা হাইকোর্টের ইতিহাসে এমন  সেলেব্রিটি সমাবেশ আর কখনো ঘটেনি।

লেখক: সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত