জয়রথ অটুট রেখে ঘরের মাঠে আরও একটি বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে গেল ভারত। বিরাট কোহলির রেকর্ড গড়া ৫০তম সেঞ্চুরি আর ভারতীয় বোলারদের মধ্যে মোহাম্মদ শামির সেরা নৈপুণ্য গড়ার দিনে কিউইদের ৭০ রানে হারিয়েছে ভারত। ভারতের গড়া ৩৯৭ রানের পাহাড়ে চড়তে গিয়ে ৭ বল বাকি থাকতে নিউজিল্যান্ডের ইনিংস থামে ৩২৭ রানে।
মহেন্দ্র সিং ধোনি বেশ কয়েকবার বলেছেন, তার জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত বিশ্বকাপ জয় নয়। অস্ট্রেলিয়ায় লম্বা সফর শেষে দেশে ফিরে জিভাকে কোলে নেওয়া নয়। ২০১১-এর ২ এপ্রিল, নুয়ান কুলাসেকারাকে বিখ্যাত সেই ছক্কাটা মারার প্রায় আধঘণ্টা আগে উইকেটে দাঁড়িয়ে আছেন। ওয়াংখেড়েতে হাজার তিরিশেক দর্শক সবাই একসঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’ গাইছেন। সেই ধ্বনির অনুরণন হচ্ছে, সমবেত স্বরের কম্পনটা মাঝের ২২ গজেও বুঝতে পারছিলেন ধোনি। কালকের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামেও ১২ বছর আগের পরিস্থিতি। বিরাট কোহলি ৫০তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করেছেন। দুই ইনিংসের মধ্যে শচীন টেন্ডুলকার ও ডেভিড বেকহ্যাম কথা বলে গেলেন। গ্যালারিতে আনুশকা শর্মা বসেছেন ক্রিকেটারদের স্ত্রীদের সঙ্গে। ক্যামেরা ঘোরালেই তারার দেখা মিলছে। সিদ্ধার্থ মালহোত্রা, কিয়ারা আদভানি, রনবীর কাপুরদের দেখা গেল; একদিকে রজনীকান্তকেও বসে থাকতে দেখা গেছে। মুকেশ আম্বানিও চলে এসেছেন, নীতা তো আছেনই। হাজার তিরিশেকের নীল সাগরে চুনোপুঁটি কম, রাঘববোয়ালই বেশি।
স্কোরবোর্ডে আগে ব্যাট করে ৪ উইকেটে ৩৯৭ রান তুলেছে ভারত। জবাবে শুরুতেই ডেভন কনওয়ে এবং রাচিন রবীন্দ্রকে হারিয়ে ফেলার পর কেন উইলিয়ামসন আর ড্যারেল মিচেলের ব্যাটে লড়ছে নিউজিল্যান্ড। জুটিটা যত বড় হচ্ছে, ততই গ্যালারির আওয়াজ কমছে। এমন সময় জাসপ্রিত বুমরার করা ২৯তম ওভারের চতুর্থ বলে ৫২ রান করা কেন উইলিয়ামসন মিডউইকেটে ক্যাচ তুলে দিলে বলটা হাত ফসকে ফেলে দেন মোহাম্মদ শামি। ওয়াংখেড়ের গুঞ্জন মুহূর্তেই স্তব্ধ। তাহলে কি ফিরে আসছে ২০১৯, সেদিনও তো হাফসেঞ্চুরি করেছিলেন উইলিয়ামসন।
বিলেত আর ঘরের মাঠের পার্থক্যটা বোঝা গেল কাল। সাময়িক স্তব্ধতার পর ফের গ্যালারি থেকে শুরু হলো সমবেত সংগীত। এবার ১৯৮৩-এর বিশ্বকাপ জয় নিয়ে বানানো সিনেমা ‘৮৩’-এর ‘লেহরা দো’ চলল গ্যালারিতে। দেশপ্রেম, ক্রিকেট, রাজনীতি, জাতীয় পতাকাÑ সব মিলেমিশে একাকার হয়ে এমন অনুপ্রেরণা জোগাল শামিকে, যে এরপর বল হাতে পেয়ে সেই উইলিয়ামসনকেই আউট করলেন! গ্যালারি থেকে যে সমবেত সংগীত উৎসাহ জোগাল শামিকে, তাতে ভর করেই যেন বোলিংয়ে পেলেন নতুন শক্তি। লেগস্টাম্প দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া বলটা বাউন্ডারি মারার মতোই ছিল, উইলিয়ামসন মেরেও ছিলেন। কিন্তু শামির বল খুব জোরালো নয় আর উইলিয়ামসন মানুষটাও ঠিক দানবীয় আকৃতির নন। তাই বলটা আকাশে উঠলেও দূরত্ব পাড়ি দেয়নি খুব বেশি, বাউন্ডারি লাইনে সহজেই লুফেছেন সূর্যকুমার যাদব। এক বল পর টম ল্যাথামকে লেগ বিফোড় উইকেটের ফাঁদে ফেললেন শামি। জোড়া শিকারে পরিস্থিতি ভারতের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এলেন, বিদায় করে দিলেন নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ককে। প্রবল স্নায়ুচাপের ম্যাচে ক্যাচ ফেলার পর যেভাবে ফিরে এলেন শামি, সেটা হয়তো আবেগের ওয়াংখেড়ে বলেই সম্ভব। এরপর মিচেল ও ফিলিপসের ৭৫ রানের জুটিতে স্বপ্ন বুনেই চলছিল কিউইরা। বুমরার বলে ৪১ রানে ফিলিপস আউট হলে তাতে ছেদ পড়ে। আর শেষ পেরেকটা ঠোকা হয়ে যায় ড্যারিল মিচেলের উইকেটে। ১১৯ বলে ৯ চার ও ৭ ছয়ে ১৩৪ রান করে তবেই ফেরেন মিচেল। গতকাল শামি শুধু ফিরেই আসেননি। বল হাতে যা করেছেন তা অনবদ্য। ৫৭ রানে ৭ উইকেট শিকার করে ভারতীয় বোলারদের মধ্যে ওয়ানডেতে গড়েছেন সেরা নৈপুণ্য। তার পেসতোপের সামনে পড়েই ৭ বল বাকি থাকতে ৩২৭ রানে অলআউট হয় কিউইরা।
সেমিফাইনাল মাঠে গড়ানোর আগে ব্রিটিশ গণমাধ্যমের খবর, ভারতকে সুবিধা দিতে উইকেট বদলে ফেলেছে আইসিসি। টসের সময় রোহিত শর্মা নাকি মুদ্রাটা এত জোরে আর দূরে ছোড়েন, প্রতিপক্ষ অধিনায়ক দেখতেই পাননি কী উঠেছে, হেড নাকি টেল। ম্যাচ রেফারি যা বলেন তাই মানতে হবে। কোহলির বিপক্ষে রিভিউতে বলের গতিপথ পাল্টে যায়, ভারতকে ভিন্ন বল দেওয়া হয়; ষড়যন্ত্রতত্ত্বে বিশ্বাসীরা কত কথাই তো বলছেন! তবে সত্যি কথাটা হচ্ছে, মুম্বাইয়ের ব্যাটিং স্বর্গে ভারত সেই ব্যাটিংটাই করেছে, যেভাবে করতে হয় বড় সংগ্রহ গড়তে। বিশ্বকাপে রোহিত নিয়েছেন পার্ল হারবারে বোমা ফেলা সেই জাপানি ‘কামিকাজি’ পাইলটদের ভূমিকা। শুরুতেই রোহিত প্রতিপক্ষের বোলিং আক্রমণটা তছনছ করে দেবেন, নিজের উইকেটের তোয়াক্কা না করে। এই রোহিতের কাছে ডাবল সেঞ্চুরি নয়, ডেস্ট্রাকশন চাইছে দল। ওদিকে শুভমান গিল লম্বা খেলবেন। রোহিত গেলে হাল ধরবেন বিরাট কোহলি। তিনি হচ্ছেন নিউক্লিয়াস, তাকে ঘিরেই রচনা করা হবে ব্যাটিংয়ের চক্রব্যূহ। শেষদিকে দ্রুত রান তুলবেন শ্রেয়াস আইয়ার, লোকেশ রাহুল, সূর্যকুমাররা। এই ছকেই ৯ ম্যাচের ৯টিতেই জিতে সেমিফাইনালে এসেছে ভারত। ওয়াংখেড়ের ছোট বাউন্ডারিতে এই পরিকল্পনা ফেল করার কথা নয়, করেওনি। রোহিতের ২৯ বলে ৪৭, শুভমান গিলের ৮০*, বিরাট কোহলির ১১৭ আর শ্রেয়াস আইয়ারের ১০৫ রানের সঙ্গে লোকেশ রাহুলের ২০ বলে ৩৯ রানে ভারতের সংগ্রহ ৪ উইকেটে ৩৯৭ রান। টিম সাউদি ৩ উইকেট নিয়েছেন, তবে খরচ করেছেন ১০০ রান।
গত বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল ভারতকে। এবার তাদেরকে হারিয়েই ২০১১ বিশ^কাপের পর ঘরের মাটিতে আরও একটি ফাইনালে গেল ভারত।
