সিন্ডিকেট বন্ধ করা সহজ নয়, এটা অনেক বড় বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপন কান্তি ঘোষ। তিনি বলেন, সিন্ডিকেট নিয়েই বাজার চলে। তবে সিন্ডিকেট যেন মাথাচাড়া না দিতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সুতরাং বাস্তবসম্মত কারণে অনেক কিছু করা যায় না।
শনিবার (১৮ নভেম্বর) ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে কোম্পানি আইন ১৯৯৪-এর সংস্কারবিষয়ক সেমিনারে এসব কথা বলেন।
এই সিনিয়র সচিব মনে করেন, দেশে যারা নতুন করে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চায়, তাদের সক্ষমতা বিবেচনায় সবাইকে ব্যবসার অনুমতি দেওয়া উচিত। যদিও কেউ ব্যবসা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তার প্রতিষ্ঠান এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে বাধা দেওয়া যাবে না।
সেমিনারের নির্ধারিত আলোচনায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট অব বাংলাদেশের সভাপতি মো. আব্দুর রহমান খান, জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসিস)-এর রেজিস্ট্রার (যুগ্ম সচিব) মো. আব্দুস সামাদ আল আজাদ, ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার মার্টিন হল্টম্যান, দি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টস অব বাংলাদেশ (আইক্যাব)-এর কাউন্সিল মেম্বার ও প্রাক্তন সভাপতি মো. শাহাদত হোসেন এবং ইউনিলিভার বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাভেদ আখতার অংশগ্রহণ করেন।
তপন কান্তি ঘোষ বলেন, কোম্পানি আইন সংশোধন নিয়ে কাজ চলছে। নির্ধারিত কমিটি চেষ্টা করে যাচ্ছে। ডিসেম্বরের মধ্যে তা শেষ করার কথা রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় থেকে খসড়া কোম্পানি আইনের ওপর বেশ কিছু দিক-নির্দেশনা দিয়েছে, যা নিয়ে কাজ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং দ্রুত তা বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। নতুন আইন পাস করতে ইউএসর সহায়তা নেওয়া হবে। সবকিছু অনলাইনভিত্তিক হবে। সেখানে পাসওয়ার্ড থাকবে। তা দিয়ে অফিসে না গিয়ে সেবা দেওয়া হবে। পাসওয়ার্ড খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা ফাঁস হলে ব্যবসা ধরা খাবে।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসার জন্য নির্দিষ্ট মানসিকতা থাকতে হবে। এসব রাতারাতি পরিবর্তন হবে না। এ জন্য কোম্পানি আইনে অতিরিক্ত পরিবর্তন না এনে ভারসাম্য থাকতে হবে। নয়তো শয়তানের আঁচড় পড়বে। এতে ব্যবসায়ী এবং গ্রাহক উভয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তপন কান্তি বলেন, একটি নতুন কোম্পানি গড়ে তুলতে যে কমপ্লায়েন্স দরকার অনেকেই তা রক্ষা করতে চান না। নামমাত্র ঠিকানা ব্যবহার করে কোম্পানির অনুমোদন চাওয়া হয়। তাদের দাবি, এখানে সহজায়ন করতে। এখানে সহজ করলে তো তারা সাধারণ মানুষের অর্থ মেরে দেবে। কেউ বাড়তি খরচ দেখাবে। যারা ব্যবসা করতে চায়, তাদের সবাইকে অনুমতি দিতে হবে, ব্যবসা করতে না পারলে বন্ধ হয়ে যাবে। বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে বাধা দেওয়া যাবে না। কোম্পানি আসবে চলবে নয়তো মারা যাবে। সিন্ডিকেট বন্ধ করা সহজ নয়, এটা অনেক বড় বিষয়। এসব নিয়ে বাজার চলে। তবে সিন্ডিকেট যেন মাথাচাড়া না দিতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সুতরাং বাস্তবসম্মত কারণে অনেক কিছু করা যায় না।
তিনি বলেন, কোম্পানি আইনে বেশি মাত্রায় ক্ষমতা আরোপ ও শাস্তির বিধান না থাকা প্রয়োজন, কারণ এতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আরজেএসসির কার্যক্রমে আরও অটোমেশন আনতে বর্তমানে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। অটোমেশন কার্যক্রম সম্পন্ন হলে সেবা প্রাপ্তির লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে আর জেএসসির শাখা অফিস স্থাপনের কোনো প্রয়োজন হবে না।
এ সময় ব্যবসায়ী সমাজের আস্থা বৃদ্ধি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যমান কোম্পানি আইন সংস্কার এবং বাস্তবায়নের তাগিদ দিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির সভাপতি ব্যারিস্টার সামীর সাত্তার বলেন, ব্যবসায়ী সমাজে আস্থা বৃদ্ধি ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিদ্যমান কোম্পানি আইনের সংস্কার এবং দ্রুত বাস্তবায়ন সময়ের দাবি। দেশে ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি করপোরেট খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকল্পে কোম্পানি আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, দীর্ঘদিনের পুরনো এ আইনটি বর্তমানে দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলা ও বেসরকারি খাতের সক্ষমতা বাড়াতে যথেষ্ট নয়। এ লক্ষ্যে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বাত্মক ব্যবহারের মাধ্যমে অটোমেশন কার্যক্রম বাস্তবায়ন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো এবং মেধাস্বত্ব আইনের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এ ছাড়া কোম্পানি আইনটি বৈশ্বিক আইনের সঙ্গে মিল রেখে ‘মার্জার’ এবং ‘একুইজেশন’কে অন্তর্ভুক্তির আহ্বান জানান ঢাকা চেম্বারের সভাপতি।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। তিনি বলেন, কোম্পানি আইনে ‘মার্জার’ এবং ‘একুইজেশন’কে অন্তর্ভুক্তির কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে কোনো কোম্পানির অবলুপ্তির প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘ ও ব্যয় সাপেক্ষ, তাই প্রস্তাবিত কোম্পানি আইনে বিষয়টি সহজীকরণে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া তিনি খসড়া আইনে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর)’ এবং ‘মধ্যস্থতা’কে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করেন এবং সেই সঙ্গে পাবলিক লিস্টেড কোম্পানি নয়, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে ‘ইন্ডিপেনডেন্ট ডিরেক্টর’ বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান।
মো. শাহাদত হোসেন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে সময়মতো বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজন, প্রতিষ্ঠান বিলুপ্তির প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও দীর্ঘসূত্রতা হ্রাস, এসএমইদের জন্য সর্বজনীন সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতকল্পে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ প্রদানের প্রস্তাব করেন।
মো. আব্দুর রহমান খান বলেন, কোম্পানি আইন আধুনিক ও যুগোপযোগী হলে ব্যবসা পরিচালন প্রক্রিয়া আরও সহজতর হবে। তাই আমাদের এ আইন দ্রুত সময়ের মধ্যে সংশোধন আবশ্যক, পাশাপাশি ২-৩ বছর অন্তর অন্তর আইনটির সংস্কার করার বিধান রাখা প্রয়োজন।
