জমি দখল করতে এক মাসে ৪০ বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৭:১২ এএম

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের নাওড়া গ্রামের মানুষ এখন একধরনের আতঙ্কে রয়েছে। সেখানে জমি দখলের জন্য এক মাসে ৪০ বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের অনুসারীরা।

তারা জানান, এক মাস ধরে নাওড়া গ্রামে হামলা ও ভাঙচুর চালাচ্ছে রফিকের সন্ত্রাসী বাহিনী। হামলার শিকার বাড়ির মধ্যে রয়েছে কায়েতপাড়া ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক দুইবারের ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) মেম্বার মোহাম্মদ মোশাররফ ভূঁইয়াসহ তাদের পাঁচ ভাই এবং আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িঘর।

গতকাল শনিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে ভাঙচুরের তা-বের চিত্র পাওয়া গেছে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, কথা বলতে ভয় পান তারা। কারণ কথা বললে তাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসবে। তারা অভিযোগ করে জানান, এসব বাড়িঘর ভাঙার ঘটনা ঘটে রাতের আঁধারে। তারা ভয়ে থাকেন। আতঙ্কে বাইরে বের হন না। হামলাকারীরা দীর্ঘক্ষণ তা-ব চালালেও কেউ এগিয়ে আসে না। পুলিশও আসে না এখানে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম দীর্ঘ দিন ধরেই কায়েতপাড়া এলাকায় আধিপত্য ও দখলদারিত্ব করে আসছেন। তবে সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) গোলাম দস্তগীর গাজীর সঙ্গে মিলে সেই আধিপত্য আরও জোরদার করেছেন। তাই স্থানীয় থানা পুলিশ এসব হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। কোনো মামলা হলেও তদন্ত হয় না।

অভিযোগ রয়েছে, সরাসরি এসব হামলায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন রফিকের ভাই মিজানুর রহমান ও তার অনুসারী রাজু হাসান, জসীম উদ্দিন, দুলাল নাপিত, শফিকসহ বেশ কয়েকজন।

গতকাল দুপুরে নাওড়া গ্রামে গেলে এলাকাবাসী জানান, রফিক ও তাদের অনুসারীদের ভয়ে গ্রামের অনেক পরিবার ঘরছাড়া। যারা আছেন তারা আতঙ্কে থাকেন, কখন তাদের বাড়িতে হামলা হয়।

নার্গিস নামের এক নারী বলেন, ১৫ দিন আগে মোশাররফ মেম্বারের বাড়িতে হামলা চালায় রফিকের লোকজন। এ সময় বাড়িঘর, দরজা জানালাসহ সবকিছু ভেঙে দেয় তারা। রূপগঞ্জের বাইরে থেকে সন্ত্রাসী ভাড়া করে এসব তান্ডব চালানো হয়। হামলার সময় সন্ত্রাসীদের হাতে ছুরি, রাম দা, শাবল ও চাইনিজ কুড়াল ছিল। হামলার সময় ভয়ে পালিয়ে যাওয়া লোকজন এখনো বাড়ি ফিরতে পারেননি।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক চা-দোকানি বলেন, রফিককে সবাই ‘আন্ডা রফিক’ নামে চেনে। তার ভয়ে হামলা ও ভাঙচুরের কথা কেউ বলতে চায় না। রফিক একজন সন্ত্রাসী। বিশাল ‘ক্যাডার বাহিনী’ দিয়ে অল্প টাকায় নামমাত্র মূল্যে জোর করে জায়গাজমি দখল করতে এসব হামলা চালানো হয়।

এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীরা দাবি করেন, ‘রফিক বাহিনীর’ ভয়ে বাড়িছাড়া পরিবারের মধ্যে রয়েছে সুমেদ আলী, মোক্তার, আমারত, আজিজুল্লাহ, ফজলুলের পরিবারসহ কয়েকটি পরিবার।

সাবেক ইউপি মেম্বার মোশাররফ ভূঁইয়ার বাবা হাজী মোতালেব অভিযোগ করে জানান, হামলার সময় তিনি ও তার স্ত্রী বাড়িতে ছিলেন। ছেলে বাড়ি আসতে পারে না হামলা-মামলার ভয়ে। ১৫-২০ দিন আগে রফিকের শতাধিক অনুসারী তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। তখন তার গলায় ধারালো অস্ত্র ঠেকিয়ে ভাঙচুর চালায়।

মোশাররফের মা আনোয়ারা বেগম বলেন, এলাকায় তাদের অনেক জমি রয়েছে। তারা স্কুল ও কলেজও তৈরি করেছেন। এই এলাকায় জায়গা-জমির দাম বেড়ে গেছে। তাই তাদের সম্পত্তি দখলের জন্য এ রকম হামলা চালাচ্ছে রফিকের লোকজন। তাদের ভয়ে তার ছেলেমেয়ে কেউ বাড়িতে আসতে পারছে না।

মোশাররফের বড় ভাই আলী আজগর চৌধুরী। তিনি নিজেকে কায়েতপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, এক মাসে ৪০টির বেশি বাড়ি ভাঙচুর করেছে ‘রফিক বাহিনী’। শনিবার তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে। রূপগঞ্জ থানায় এসব হামলার অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার পাচ্ছেন না। পুলিশ মামলা নিচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘আগে রফিকের সঙ্গে আমাদের এখানকার এমপি গোলাম দস্তগীর গাজীর তেমন ভালো সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু এখন তাদের মধ্যে সখ্য হয়েছে। তারা এখন সমঝোতা করে এসব তা-ব চালাচ্ছে। সে কারণে আমাদের কথা কেউ শোনে না।’ তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

সাবেক ইউপি মেম্বার মোশাররফ ভূঁইয়া বলেন, গাজী পরিবারের সঙ্গে আঁতাত হওয়ার কারণে আগের চেয়ে রফিক বাহিনীর তান্ডব আরও বেড়ে গেছে। রংধনু গ্রুপের রফিক নামমাত্র মূল্যে, এমনকি কোনো টাকা না দিয়ে জায়গা জমি দখল করতেই এক মাস ধরে সন্ত্রাসী দিয়ে বাড়ি-ঘরে হামলা চালাচ্ছে। তাদের পাঁচ ভাইয়ের প্রায় ১০ কোটি টাকার  ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, রফিকের লোকজন প্রায়ই ভেকু নিয়ে এসে টার্গেট করা বাড়িঘর ভেঙে দিচ্ছে। ৫০টির বেশি পরিবার গ্রামছাড়া। তিনিও প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি খন্দকার আবুল বাশার টুকু জানান, ১৩ নভেম্বর ও ২৪ অক্টোবর তার বাড়িতে হামলা চালিয়েছে রফিকের লোকজন। রফিক আওয়ামী লীগের কেউ না। তার অভিযোগ, তাকে নৈরাজ্যে মদদ দিচ্ছেন গোলাম দস্তগীর গাজী। তিনি নিজে আওয়ামী লীগের কোনো নিয়মনীতি না মেনে পরিবারের সবাইকে বিভিন্ন পদ-পদবি দিয়ে লুটপাট করাচ্ছেন। একই সঙ্গে ‘রফিক বাহিনীর’ জমি দখল থেকে শুরু করে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ইন্ধন দিচ্ছেন।

বাড়িঘর ভাঙচুরের বিষয়ে জানতে রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল করেও সাড়া মেলেনি। তবে থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা জানান।

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৪০-৫০টি বাড়ি ভাঙচুর বড় ঘটনা। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে পুলিশ অবশ্যই জানত। এ বিষয়টি তাদের নলেজে নেই। তবে মাসখানেক আগে একটি দোতলা বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ করেছিল ৯৯৯ সেবার মাধ্যমে। সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ওই বাড়ির মালিককে অভিযোগ দিতে বললেও তারা কোনো অভিযোগ এখনো করেনি।’ তিনি আরও বলেন, বাড়ি ভাঙার বিষয়ে তাদের কাছে অভিযোগ করলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত