১৩ বছর আগে মিরপুর পাইকপাড়া স্টাফকোয়ার্টার এলাকায় সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় হেফাজতে নেওয়া হয় দুই কিশোরকে। আদালতের মাধ্যমে দুজনকে পাঠানো হয় গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়নকেন্দ্রে। মামলার নথিতে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়নপত্র অনুযায়ী ঘটনার সময় একজন একাদশ শ্রেণির ও অপরজন নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিল। কয়েক মাস পর তারা জামিন পায়। ২০১০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর দায়ের হওয়া এ মামলায় ওই বছরের ২৬ ডিসেম্বর ১৪ জনকে সাক্ষী করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ঢাকার শিশু আদালতে (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮) চলমান এ মামলায় এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র চারজন। দেড় বছরে আর কোনো সাক্ষী আসেননি। শিশু অবস্থায় আইনের সংঘাতে আসা দুজনের একজনের বয়স প্রায় ৩০ ও অপরজনের ২৮ বছর। পরিপূর্ণ যুবক হলেও তাদের এখনো হাজির করা হচ্ছে (অন্য মামলায় কারাগারে) শিশু আদালতে।
২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর রাজধানীর দারুস সালাম থানার বাগবাড়ি মসজিদ এলাকায় একটি লাশ পাওয়ার ঘটনায় ৩১ অক্টোবর ১৪ ও ১৫ বছর বয়সী দুই শিশুকে হেফাজতে নিয়ে আদালতের মাধ্যমে শিশু উন্নয়নকেন্দ্রে পাঠায় পুলিশ। পরে দুজন জামিন পায়। ২০১৬ সালের ৩১ জুলাই ছয়জনকে সাক্ষী করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ৮ বছরের বেশি সময়ে চলা এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন চারজন। ইতিমধ্যে একজন ২৩ বছর, অপজন ২২ বছরের যুবক হয়েও তারা নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন একই শিশু আদালতে।
শিশু আদালতে এমন অনেক মামলার বিচার নিষ্পত্তি (শিশুকে প্রথম আদালতে হাজিরের দিন থেকে) হচ্ছে না আইনে নির্ধারিত ৩৬০ দিনের (নিষ্পন্ন না হলে আরও ৬০ দিন) সময়ে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও আদালতের কর্মচারীরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মামলা নিষ্পত্তিতে বিচারকদের আন্তরিকতা ও তৎপরতা থাকলেও সাক্ষীর গরহাজিরায় শত শত মামলা অনিষ্পন্ন অবস্থায় থাকে।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৯৯টি শিশু আদালতে গত অক্টোবর পর্যন্ত খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই, চুরি, মারামারি, হত্যাচেষ্টা, বিস্ফোরক ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে ৩৮ হাজার ৪২৭ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ ছাড়া দেশ রূপান্তরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঢাকার ৯টি শিশু আদালতে গত অক্টোবর পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন; যার বেশিরভাগ দায়ের হয়েছে ২০১০ থেকে ২০২২ সালে এবং বিচারকাজ চলছে ২ থেকে ১৩ বছর ধরে। শিশু আইন, শিশু আদালত ও শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম ও পরিস্থিতি নিয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, মানবাধিকার ও শিশু অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, আপত্তি বহু পুরনো। তাদের মতে, শিশুরা সংবেদনশীল। অন্যদিকে নানা কারণে শিশু-কিশোরদের অনেকে অপরাধে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। সংগত কারণে তাদের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি, সংশোধনের মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসা এবং অপরাধ থেকে নিবৃত্ত করার চেষ্টাকে আরও গতিশীল করা বাঞ্ছনীয়।
যা আছে শিশু আইনে : শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ব্যক্তিরা শিশু। দেশের প্রতিটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অধিক্ষেত্র হিসেবে শিশু আদালত হিসেবে বিচার কার্যক্রম করবে। শিশুর বিরুদ্ধে দ-বিধি বা অন্যান্য আইনের ধারায় অভিযোগ গঠন হলেও শিশু আইনের দিকনির্দেশনা মেনে বিচারকাজ হবে শুধুই শিশু আদালতে। তবে দ-বিধির ৮২ ধারা অনুযায়ী, ৯ বছর বয়স পর্যন্ত কোনো শিশুর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ শাস্তিযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে না। শিশুর বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ বা ডাকাতি এ রকম গুরুতর অভিযোগ প্রমাণ হলেও শিশু আদালত তাকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের আটকাদেশ দিতে পারবে। জামিন নামঞ্জুর কিংবা রায়ে আটকাদেশের আদেশ হলে শিশুকে রাখতে হবে উন্নয়নকেন্দ্রে। তবে আটকাদেশে থাকাকালে কোনো শিশুর বয়স ১৮ বছর পার হলে তাকে আর উন্নয়নকেন্দ্রে না রেখে রাখতে হবে কারাগারে। আটকাদেশের বাকি সাজা তাকে কারাগারে ভোগ করতে হবে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ব্লাস্টের ট্রাস্টি অ্যাডভোকেট জেড আইন খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশু আদালতগুলোতে এখন সুবিচারের নামে সুনির্দিষ্টভাবে অবিচার হচ্ছে। ৩৬০ দিনের জায়গায় যদি ১০ বছর লাগে তাহলে এটা অবিচার ছাড়া আর কী? এই সময়ে ওই শিশু ও তার পরিবারের আর্থিক, মানসিক ক্ষতি এবং সামাজিক অবক্ষয় যা হওয়ার তা তো হয়েই যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘বিচারের গতি কেন নেই, এর জন্য তো জবাবদিহি থাকতে হবে। পর্যাপ্ত বিচারক ও এজলাস নেই। বিশেষ মামলার ক্ষেত্রে বিচারকদের প্রশিক্ষণও হয় অপ্রতুল। কীভাবে দ্রুত ও নিষ্পত্তি হবে এ জন্য সুনির্দিষ্ট বিধান থাকা উচিত।’
মামলার ফাইল বাড়ে সাক্ষীর গরহাজিরায় : ২০১৮ সালের অক্টোবরে শিশু আইন সংশোধন ও সরকারি বিধিমালা জারির পর ২০১৯ সাল থেকে আইনের সংঘাতে আসা শিশুর বিচার হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে (এর আগে প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালতগুলো শিশু আদালত হিসেবে গণ্য হতো)। ঢাকায় শিশু আদালত রয়েছে ৯টি। সম্প্রতি সব কটি শিশু আদালতের মামলার হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনা ও আদালত সংশ্লিষ্টদের থেকে তথ্য নিয়েছে দেশ রূপান্তর। এতে দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত চলমান রয়েছে ৩ হাজার ৮৬৫ মামলা। এর মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এ ৩৮২টি, ট্রাইব্যুনাল-৯-এ ৫৬২টি, ট্রাইব্যুনাল-১-এ ২১১টি, ট্রাইব্যুনাল-৭-এ ৪৩১টি, ট্রাইব্যুনাল-৪-এ ৫৫১টি, ট্রাইব্যুনাল-৫-এ ৪১৮টি, ট্রাইব্যুনাল-৬-এ ৪১৭টি, ট্রাইব্যুনাল-৩-এ ৫৭৬টি এবং ট্রাইব্যুনাল-২-এ বিচারাধীন মামলা রয়েছে ৩১৩টি। এ ছাড়া শুধু পাঁচটি শিশু আদালতে ট্রাইব্যুনালে-১, ৪, ৭, ৮ ও ৯-এ অন্তত ২ থেকে ১৩ বছর পর্যন্ত বিচারাধীন ১ হাজার ৭১১ মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী বা আপস মীমাংসায় মামলা নিষ্পত্তিতে গতি বেড়েছে। বিপরীতে অনিষ্পন্ন মামলাও বাড়ছে।
প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লিখিত মামলায় দুজনের পক্ষে এখন কোনো আইনজীবী নেই বলে জানা গেছে। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এর বিশেষ পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) মো. রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু পুরনো স্পর্শকাতর মামলা আছে, যেগুলোতে সাক্ষী আসে না। সমন পাঠিয়েও সাক্ষীদের খোঁজ মেলে না। স্পর্শকাতর হওয়ায় এসব মামলা নিষ্পত্তির আবেদনও করা যায় না। অনেক মামলায় আইনজীবীও থাকে না। তখন তাৎক্ষণিক রাষ্ট্রপক্ষে তাদের হয়ে আইনজীবী দিয়ে হাজিরা ও শুনানির তারিখ নিতে হয়। নানা জটিলতায় মামলাও অনিষ্পন্ন থাকে।’
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিশুদের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে এ কারণে যে তারা সংবেদনশীল এবং আগামীর ভবিষ্যৎ। যেকোনো কারণেই অনেক শিশু আইনের সঙ্গে সংঘাতে এসে পড়েছে। এখন তাদের সংশোধন করে মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সাক্ষীদের আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রপক্ষ ও পুলিশের এবং সাক্ষীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে।’
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা আসলে দুর্ভাগ্যজনক যে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা আমাদের দেশে একটা চিরাচরিত দৃশ্য হয়ে গেছে। এর প্রভাব এখন শিশু আদালতেও পড়েছে। তবে শিশুদের মামলা এত দিন ধরে পড়ে থাকা অবশ্যই অস্বাভাবিক। এডিআর (বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) বা যেভাবেই হোক দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।’
