সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশে^র ভূরাজনৈতিক পটভূমি কতটা বদলে গেছে এবং পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক রশি-টানাটানি কতটা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিয়ামক হয়ে উঠেছে, তা চলমান সংকট, সংঘাত ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশি^ক বিভেদকে বাড়িয়ে তুলছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সান ফ্রান্সিসকোর বে এরেনায় মিলিত হয়েছেন। গত ১৫ নভেম্বর এই দুই ক্ষমতাশালী প্রেসিডেন্টের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো মুখোমুখি সাক্ষাৎ হলো। আশা ছিল ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ, তাইওয়ান, ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং নির্বাচনে হস্তক্ষেপের মতো অনেক বিষয়ই উঠে আসবে এ বৈঠকে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এশিয়ার গুরুত্ব রয়েছে। আবার ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া থেকে সাময়িক সময়ের জন্য ইউরোপের দিকে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই গুরুত্বটা নিরাপত্তা ও অর্থনীতি দুই ইস্যুতেই বুঝতে হবে। প্রকৃতপক্ষে আইপিইএফ জোট গঠনের ঘোষণার মধ্যে আর যে বিষয় এখানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, সেটি হলো কোয়াড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পরিপূর্ণভাবে সন্তুষ্ট নয়। এর কারণ হচ্ছে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যে অর্থনীতি ও নিরাপত্তা দুটিই ভূরাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। বাইডেন যখন নিরাপত্তা থেকে এশিয়ার বাজারের দিকে নজর ঘোরাচ্ছেন, তখন চীন বিপরীত পথে হাঁটতে শুরু করেছে। তারা অর্থনীতি থেকে নিরাপত্তার দিকে ঝুঁকছে। চীনের মহাপরিকল্পনায় দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক আধিপত্য ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। কয়েক দশক ধরে চীন তাদের বিশাল অর্থনীতির সুযোগে অনেকগুলো দেশের প্রধান ব্যবসায়ী অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
এ বছরের শুরুতে দুই দেশের সম্পর্কে ফাটল ধরে। যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে যে, চীন তাদের আকাশে একটা স্পাই বেলুন পাঠিয়েছে। পরে মার্কিন যুদ্ধবিমান সেটি দক্ষিণ ক্যারোলিনার উপকূলে ভূপাতিত করে। এর আগে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সেই সময়ের হাউজ স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান সফর করেন, যার জেরে দুই দেশের মধ্যে সামরিক যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় চীন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বাইডেন এই সম্পর্ক আবার পুনরায় স্থাপনে সংকল্পবদ্ধ। কিন্তু চীনকে খুব একটা আগ্রহী তাতে মনে হচ্ছে না। তবে লক্ষ্য হলো প্রতিযোগিতার বিষয়টি সামলানো, কোনো সংঘাতের ঝুঁকি যাতে তৈরি না হয় সেই ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিশ্চিত করা যেন যোগাযোগটা অব্যাহত থাকে। বাইডেন-শির বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (অ্যাপেক) সম্মেলন চলাকালে। চীনের দিক থেকে আগ্রহের শীর্ষে ছিল তাইওয়ান প্রসঙ্গে আলোচনা, যেখানে সামনের বছরের শুরুতে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এই স্বশাসিত দ্বীপ দেশটিকে নিজেদের অংশ বলে মনে করে চীন। শি হয়তো নিশ্চয়তা চাইবেন যুক্তরাষ্ট্র যেন কোনোভাবেই তাইওয়ানের এই স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন না করে। অন্যদিকে বাইডেন তাইওয়ানের আশপাশে বেইজিংয়ের সামরিক তৎপরতা নিয়ে মার্কিনি উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
চীনে প্রযুক্তি রপ্তানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরে বেইজিংয়ের আঞ্চলিক দাবি নিয়ে উত্তেজনাও ছিল আগ্রহের বিষয়। বিশ্লেষকদের অনুমান এই বৈঠক থেকে মাঝারি কিছু হয়তো অর্জিত হবে যেমন দুদেশের সামরিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন এবং চীনের তৈরি ফেনটানিলের আসা বন্ধ হবে। কিন্তু কোনো পক্ষই এমন কোনো অভাবনীয় অগ্রগতির আশা করছে না, যা দুদেশের সম্পর্ক নতুন করে শুরু করতে সাহায্য করবে এটা মূলত স্থিতিশীলতা ও বোঝাপড়া বজায় রাখা। সেন্টার ফর দ্য স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জুড ব্ল্যানশেট বলেন, শি এই বিষয়টি গত মার্চে পরিষ্কার করেছেন, যখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চীনকে ঘিরে ফেলা ও দমন করার অভিযোগ আনেন। আর যখন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত জি ফেং সম্পর্কের উন্নতির দিকে ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন, একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিশ্চয়তাও চাইছেন। বেইজিং জানতে চায় যে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের সিস্টেম বদলাতে চায় না, কোনো শীতল যুদ্ধেরও অবতারণা করবে না, তাইওয়ানের স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন করবে না বা চীন থেকে বিচ্ছিন্ন করার কোনো লক্ষ্য তাদের নেই, হংকং ফোরামে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় তিনি এমন মন্তব্য করেন। বাইডেন প্রশাসন বলছে যে, তারা আক্রমণাত্মক চীনা আচরণকে মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে, যা আন্তর্জাতিক নিয়মনীতিকে লঙ্ঘন করে। বেলুন কাণ্ড ঘিরে উত্তেজনা প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্রের চেষ্টাও চোখে পড়ার মতো। গত জুন থেকে এ পর্যন্ত তারা তিনজন কেবিনেট সদস্যকে বেইজিং পাঠিয়েছে, যার মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেনও আছেন।
ব্লিঙ্কেন গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য সফর হঠাৎ করেই বাতিল করেন এই অভিযোগে যে, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে চীনের গুপ্তচর বেলুন ওড়ানোর সিদ্ধান্তটা অগ্রহণযোগ্য ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গত জুন মাসে যখন সফরটি অনুষ্ঠিত হয়, তিনি শি’র সঙ্গে খুবই জোরালো আলোচনা হয়েছে বলে বর্ণনা করেন। আর এই সম্মেলন তার সেই কূটনীতিরই ফল। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের কূটনীতিকরা প্রায় প্রতিটি আলোচনায় চীনের সঙ্গে সামরিক যোগাযোগ পুনরায় শুরুর ওপর জোর দিয়েছেন, কিন্তু কোনো সাফল্য তাতে আসেনি। ঘুরেফিরে সেই স্পাই বেলুন প্রসঙ্গ উঠে আসে এবং যোগাযোগ স্থাপনের আলোচনা থমকে যায়, বলেছেন একজন মার্কিন কর্মকর্তা। বেশ কিছু মার্কিন গণমাধ্যমের খবর শি প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে বৈঠকের পর, সান ফ্রান্সিসকোয় মার্কিন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত নৈশভোজে যোগ দেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, ৪০ হাজার ইউএস ডলারের বিনিময়ে একজন অতিথি চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একই টেবিলে বসার সুযোগ পাবেন। আর জনপ্রতি টিকিটের মূল্য শুরু হয়েছে দুই হাজার ডলার থেকে। শি-বাইডেন বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন চীনের ভাইস-প্রিমিয়ার হি লিফেংয়ের সঙ্গে এক বৈঠকে বসেন। এই বৈঠক সামনে রেখে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস তাদের সম্পাদকীয়তে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে সংকট দূর করা ও কাটিয়ে ওঠার ভার চাপিয়ে দিয়েছে বাইডেনের ওপর। গ্লোবাল টাইমসের ৮ নভেম্বরের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ওয়াশিংটনে একটা অপশক্তি আছে যারা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের উন্নয়ন চায় না এবং যখনই কোনো জটিলতা তৈরি হয় তখনই তারা বেশি কার্যকর ভূমিকা নেয়।
গাজায় চলমান ইসরায়েলি আগ্রাসনের মধ্যেই বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠক করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বৈঠকে গাজা ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, তাইওয়ানসহ বেশ কিছু ইস্যুতে আলোচনা করেন বাইডেন ও শি। এ সময় দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের সামরিক যোগাযোগ পুনরায় শুরু করতে একমত হন দুই নেতা। দুই দেশের সম্পর্ক দায়িত্ববোধের সঙ্গে পরিচালনা করতে জোর দেন বাইডেন। অন্যদিকে বেইজিং ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অভিহিত করে তা এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এখন থেকে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি ফোনে যোগাযোগের পথ সহজ হলো বলে জানান দুই নেতা। এ সময় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধে চীনের সহায়তা চান বাইডেন। আহ্বান করেন ইরানের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের প্রভাব ব্যবহার করার। মূলত গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে চলমান হামলা মোকাবিলায় চীনের দ্বারস্থ হতে এক প্রকার বাধ্য হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, পৃথিবী দুটি রাষ্ট্রের সফলতা অর্জনের জন্য যথেষ্ট বড়। জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতি নিয়ে চীনের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনোই সংঘাতে রূপ নেওয়া প্রত্যাশিত নয়। পাশাপাশি বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়েও জিনপিংয়ের সঙ্গে সফল আলোচনা হয়েছে বলে জানান বাইডেন।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক