মঙ্গলবার বিকেলে বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় ঢোকামাত্রই উত্তর গ্যালারিতে বিশাল এক প্ল্যাকার্ডে চোখ আটকে গেল। তাতে বড় করে লেখা ‘দ্য গডফাদার’। পাশে শোভা পাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় দলের স্প্যানিশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরার বিশাল এক ছবি। ৩৯ বছর বয়সী কোচের শ্যোন দৃষ্টি নিবদ্ধ সামনের দাবার কোর্টে। সেখানে প্রস্তুত তার ১১ সৈনিক। অভিনব এই প্ল্যাকার্ড নিয়ে মাঠে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রায় আড়াইশো লাল-সবুজ সমর্থক। তাদের সবার গায়ে কালো টি-শার্ট। জানতে মন চাইল কারা এরা? এই মরা ফুটবলকে কেন এভাবে সমর্থন দিচ্ছেন? কেনই বা কাবরেরাকে গডফাদার বলে ডাকতে শুরু করেছেন? একটু খবর নিতেই জানা গেল, এরা বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের ফ্যান গ্রুপ। নাম বাংলাদেশি ফুটবল আলট্রাস। সদস্যসংখ্যা আড়াইশো ছাড়িয়েছে বেশ কিছুদিন হলো। যখনই বাংলাদেশ মাঠে নামছে, তখন তাদের গ্যালারিতে সরব ও অভিনব উপস্থিতি। এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন মেহেদী হাসান অভির কাছে জানতে চাওয়া, কাবরেরাকে কেন গডফাদার নামে ডাকা? এই তরুণের সাফ জবাব, ‘কাবরেরা এসে আমাদের অগোছালো দলটিকে ভয়ডরহীন ফুটবল খেলতে শিখিয়েছেন। ফুটবলের এই দুঃসময়ে এমন একজন জাদুকরের দরকার ছিল আমাদের। এখন বাংলাদেশ কাউকে ভয় পায় না। লড়াই করে চোখে চোখ রেখে। আমাদের দলকে বদলে দেওয়া কোচকে তাই আমরা গডফাদার নাম দিয়েছি।’
সমর্থকদের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে ম্যাচ শেষে সদলবলে প্রতিটি গ্যালারির সামনে গেছেন কাবরেরা। উত্তর গ্যালারির সামনে গিয়ে ঠিকই বাংলাদেশি ফুটবল আলট্রাসদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এসেছেন স্প্যানিশ কোচ। স্পেনে জন্ম, বেড়ে ওঠা বলেই ফুটবল মাঠে সমর্থকদের গুরুত্বটা বোঝেন। তাই এই ম্যাচের আগে বাংলাদেশি ফুটবল আলট্রাস গ্রুপের প্রতি জানিয়েছিলেন মাঠে আসার উদাত্ত আহ্বান। অভি বলেন, ‘মালদ্বীপের বিপক্ষে ম্যাচের পর এক ভিডিও বার্তায় কোচ অনুরোধ করেছিলেন যেন আমরা সামনের সব ম্যাচে মাঠে থাকি এবং একইভাবে দলকে সমর্থন করি। কোচ যখন এভাবে অনুরোধ করেন, তখন তাকে তো আর নিরাশ করা যায় না। তাই তার প্রতি আমাদের সমর্থন জানাতেই এই প্ল্যাকার্ড নিয়ে এসেছিলাম। দল এখন যে রকম ফুটবল খেলছে, ভবিষ্যতে দলের প্রতি আমাদের সমর্থন অটুট থাকবে।’
২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ বনাম নেপাল প্রীতি ম্যাচ দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশি ফুটবল আলট্রাসের। প্রথম দিনেই তারা পেয়েছিল ব্যাপক সাড়া। প্রায় পৌনে দুইশো তরুণ এক হয়ে বাংলাদেশকে সমর্থন জানায়। এরপর দিন যত যাচ্ছে বাড়ছে সদস্যসংখ্যা। অভির বিশ্বাস, কাবরেরার অধীনে বাংলাদেশ যেভাবে উন্নতি করছে, তাতে অল্প সময়ের মধ্যেই সংখ্যাটা কয়েক হাজার হয়ে যাবে। ইউরোপের মাঠগুলোতে যেমনটা হয়, ঠিক সেভাবেই বাংলাদেশকে গ্যালারি থেকে অনুপ্রেরণা জোগায় এই সংগঠন। লাল-সবুজ ধোঁয়া তুলে তারা একাত্ম হন জামালদের সঙ্গে। নানা রকম সেøাগানে তারা সাহস জোগান ফুটবলারদের। মঙ্গলবার তাদের এক প্ল্যাকার্ডে দেখা গেল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলার হামজা চৌধুরীকে লাল-সবুজের জার্সিতে দেখার ইচ্ছে।
মঙ্গলবার ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে গডফাদার ডাকনামের কথা শুনে স্মিত হাসলেন কাবরেরা। যদিও এখনই নিজেকে অতটা ওপরে রাখতে চান না কোচ; বরং যতটুকুই উন্নতি হয়েছে, তার সব কৃতিত্ব তিনি দিয়ে দিচ্ছেন শিষ্যদের। অথচ হেড কোচ হিসেবে ক্যারিয়ারের শুরুটা মোটেই মসৃণ হয়নি এই স্প্যানিশের। অনামি একজনকে হুট করেই জাতীয় দলের দায়িত্বে নিয়ে আসায় কম সমালোচনা সইতে হয়নি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকেও। গত বছর জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর টানা ছয় ম্যাচে দলকে জেতাতে না পারায় তার সামর্থ্য নিয়েও উঠেছিল প্রশ্ন। এক বছরের মেয়াদ শেষে তাকে বিদায় করে দেওয়ার কথাও বলেছেন অনেকে। তবে বাফুফে আস্থা হারায়নি। আরও এক বছরের জন্য কাবরেরাকে দেওয়া হয় দায়িত্ব। অনেক চাপ সয়ে কাবরেরার নিজের পরিকল্পনায় অবিচল থেকেছেন। তার ঠিক আগের কোচের মতো বছরের বেশিরভাগ সময় নিজ দেশে কাটানোর পথে না হেঁটে কাবরেরা ছুটে গেছেন দেশের নানা প্রান্তে, যেখানেই হয়েছে ঘরোয়া ফুটবল। নিজে পরখ করে ফুটবলারদের বেছে নিয়েছেন। কোচের দল গঠন নিয়েও একসময় উঠেছিল প্রশ্ন। তবে সবকিছু পাশ কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত কাবরেরা সাফল্যের খোঁজ পেয়েছেন গত জুলাইয়ে ভারতে অনুষ্ঠিত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে। তার অধীনে অন্য ব্র্যান্ডের ফুটবল খেলে বাংলাদেশ ১৪ বছর পর সাফের সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল। ফাইনালে যাওয়া না গেলেও বাংলাদেশ পেয়েছিল ভয়ডরহীন ফুটবল খেলার আত্মবিশ্বাস। সেটাকে সঙ্গী করেই মালদ্বীপকে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের প্লে-অফে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এখন খেলছে বাছাইয়ের দ্বিতীয়পর্ব।
কোচ হিসেবে এখনো বড় কোনো সাফল্য পাননি কাবরেরা। তবে তিনিই শেখ মোরসালিন, রাকিব হোসেন, বিশ্বনাথ ঘোষ, মোহাম্মদ হৃদয়, মোহাম্মদ সোহেল রানা, ইশা ফয়সাল, শাকিল হোসেন, হাসান মুরাদ, রফিকুল ইসলামদের হৃদয়ে বুনে দিয়েছেন নির্ভীক ফুটবলের মন্ত্র। একটু আগেভাগে হলেও কাবরেরাকে ভক্তদের দেওয়া ‘দ্য গডফাদার’ নামটা প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাবে, যখন বাংলাদেশ সত্যিকারের শক্তিশালী দল হয়ে উঠবে। তখন কিন্তু আলট্রাসরাই বুক ফুলিয়ে বলবেন, ‘আমরা সঠিক লোক খুঁজে নিতে ভুল করিনি।’
