বেশি সুদে ঋণ নিচ্ছে সরকার

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৩, ০৯:০৪ এএম

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য টাকা ছাপিয়ে সরকারকে ঋণ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে দৈনন্দিন খরচ মেটাতে যেতে হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে। অপরদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচন নীতির কারণে ব্যাংকগুলোও তারল্য সংকটে ভুগছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের ট্রেজারি বিলের সুদের ধার দিনদিন বেড়েই চলছে। তবুও বেশি সুদে নিচ্ছে সরকার। ইতিমধ্যে ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদ সাড়ে ১০ বছরের মধ্যে রেকর্ড করেছে। আর গতকাল বৃহস্পতিবার ১৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলেও রেকর্ড দর উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গতকাল বৃহস্পতিবার ১৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলে রেকর্ড ৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ সুদে বিক্রি হয়েছে। সরকার এই দরে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৫ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। যদিও সরকারের চাহিদা ছিল আরও বেশি। আর গত সোমবার ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলে সর্বোচ্চ সুদ উঠেছে ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ। ১৮২ দিন মেয়াদি বিল লেনদেন হয়েছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ সুদে। ২০১৩ সালের মার্চের পর যা সর্বোচ্চ।

গত বছরের নভেম্বর মাসে ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলে ৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ ছিল সুদহার। সরকারি বিলের সুদহার এভাবে বাড়তে থাকায় গ্রাহক পর্যায়ে সুদ হার আরও বাড়বে।

গত সোমবার সরকার ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের বিপরীতে ঋণ নিয়েছে ৫২৬ কোটি টাকা। আর ১৮২ দিন মেয়াদি বিলের বিপরীতে নিয়েছে ২৯০ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে টাকা ছাপিয়ে ঋণ দিচ্ছে না। এ জন্য সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। এ কারণে বিলের বিপরীতে সুদের হার বাড়ছে। আর স্বল্পমেয়াদি ঋণে সরকারের আগ্রহের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকার মনে করছে দ্রুত সময়ের মধ্যে আর্থিক পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে। সে ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিলে সরকারকে দীর্ঘদিন ধরে বেশি সুদ বহন করতে হবে। তাই সরকার স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিচ্ছে।

চলতি বছরের জুলাই থেকে ৯ শতাংশ সুদহারের সীমা তুলে দিয়ে নতুন ব্যবস্থা চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ৬ মাসের গড় সুদের (স্মার্ট) সঙ্গে সাড়ে ৩ শতাংশ হলো সর্বোচ্চ সুদের সীমা। গত মাসে স্মার্ট ছিল ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আগের মাসে যা ৭ দশমিক ২০ শতাংশ ছিল। গত জুলাই মাসে ছিল ৭ দশমিক ১০ শতাংশ। ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় সুদ বেড়ে যাওয়ায় স্মার্ট বাড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমানে সরকারের ২ বছর মেয়াদি বিলে ১০ দশমিক ৯০, ৫ বছর মেয়াদি বিলে ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ, ১০ বছর মেয়াদি বিলে সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ১০ শতাংশ সুদ রয়েছে। সবশেষ গত মঙ্গলবার সরকার ১০ বছর মেয়াদি বিল থেকে ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।

ঢাকা ব্যাংকের এমডি এমরানুল হক বলেন, ট্রেজারি বিলের সুদ যদি ১০ শতাংশের বেশি থাকে, তাহলে ঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত হবে। ঋণের সুদ বৃদ্ধির কারণে আমানতের সুদও বাড়বে। ক্রমবর্ধমান ঋণের সুদহার চলমান মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সহায়তা করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের মার্চে ১৮২ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার ছিল ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ। ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের সুদহার ছিল ১১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। এর পরের মাসে তা কমে ৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং ১০ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে আসে।

এরপর সুদ হারে ওঠা-নামা দেখা গেলেও কখনো এর ওপরে ওঠেনি। এরপর ২০১৩ সালের অক্টোবরে ১৮২ দিন মেয়াদি বিলের সুদহার ১০ শতাংশের নিচে তথা ৯ দশমিক ৫৩ শতাংশে নেমে আসে। ওই বছরের ডিসেম্বরে ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদহার কমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ২৫ শতাংশে। এরপর কোনো মাসেই ট্রেজারি বিলের সুদহার দুই অঙ্কের ওপরে ওঠেনি। কিছুদিন আগেও ট্রেজারি বিলে ৩ থেকে ৫ শতাংশ সুদে লেনদেন হতো। সম্প্রতি বাড়তে বাড়তে তা এ পর্যায়ে এসেছে।

ব্যাংকাররা জানান, সরকারি ঋণ চাহিদা মেটানো হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির কারণে বাজার থেকে টাকা উঠে আসছে। সব মিলিয়ে অনেক ব্যাংক এখন তারল্য সংকটে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাত যেন বিপদে না পড়ে সে জন্য প্রতিদিনই বাংলাদেশ ব্যাংক বড় অঙ্কের ধার দিচ্ছে। গত বুধবার কয়েকটি ব্যাংকে ধারের পরিমাণ ছিল ২৩ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা। আর গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তঃব্যাংক ধারের পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এক দিন মেয়াদি ধার ছিল তিন হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। এই ধারে সুদ ছিল ৮ দশমিক ১৯ শতাংশ। আন্তঃব্যাংক রেপোসহ বিভিন্ন উপায়ে ধারের সুদ দাঁড়ায় ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত