মেজর আখতারসহ ভোটের দৌড়ে বিএনপির ৪ নেতা

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৩, ০৩:২৭ এএম

বিএনপি থেকে পাঁচবারের বহিষ্কারকৃত নেতা সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জন কিশোরগঞ্জন্ড২ আসন থেকে আবার নির্বাচন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ইতিমধ্যে তিনি মনোনয়নপত্রও কিনেছেন। অন্যদিকে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মোহাম্মদ শোকরানাসহ তিন সাবেক নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র কিনেছেন।

কিশোরগঞ্জন্ড২ আসন থেকে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান মনোনয়নপত্র কেনায় এলাকায় বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। কেউ বলছেন তৃণমূল বিএনপি, কেউ বলছেন আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন। তবে তিনি জানিয়েছেন, বিএনপি যদি নির্বাচনে যায়, তাহলে বিএনপির প্রার্থী হিসেবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। যদি বিএনপি নির্বাচনে না যায় তাহলে সময়ই বলে দেবে কী করা উচিত। এর আগে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি এ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়া উপজেলা নিয়ে কিশোরগঞ্জন্ড২। এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ। তিনি নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেন। এবার কিশোরগঞ্জন্ড২ আসনে নির্বাচন করার জন্য আওয়ামী লীগের ১১ জন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আখতারুজ্জামান রঞ্জনের মনোনয়নপত্র নেওয়ার বিষয়টি আওয়ামী লীগন্ডবিএনপি দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে।

মনোনয়নপত্র কেনার বিষয়ে আখতারুজ্জামান রঞ্জন বলেন, ‘কটিয়াদী নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে আমি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করে রেখেছি। বিএনপি যদি নির্বাচনে যায়, তাহলে বিএনপির প্রার্থী হিসেবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই। যদি বিএনপি নির্বাচনে না যায় তাহলে সময়ই বলে দেবে কী করা উচিত। তবে মনোনয়নপত্র কেনার ক্ষেত্রে একটু এগিয়ে থাকতেই এ কাজটি করে রেখেছি।’

বিএনপি দলের নেতাকর্মীরা বলেন, আখতারুজ্জামান রঞ্জন প্রথম বহিষ্কৃত হন ১৯৯৬ সালে। সে সময় জাতীয় সংসদের একটি অধিবেশন থেকে বিএনপি ওয়াকআউট করে। সেদিন তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত না মেনে সংসদে থেকে যান। এর কিছুদিন পরই দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। দ্বিতীয়বার বহিষ্কৃত হন তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকার ইস্যুতে। তখন বিএনপি এই সরকার পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছিল। ওই সময় তিনি টিভি টকশোতে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জনগণের। বিএনপির উচিত ওই দাবি মেনে নেওয়া।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির দুন্ডএকজন নেতা বলেন, আখতারুজ্জামান স্পষ্টবাদী মানুষ। মাঝেমধ্যে দলের বিপক্ষে বেফাঁস কথাবার্তা বলা ছাড়া দলে অন্য কোনো রকম বদনাম নেই তার। রাজনীতিতে তাকে রহস্যজনক নেতা মনে করা হয়। কখন তিনি দলে ফেরেন, আবার কখন বহিষ্কৃত হন, তা বোঝা কঠিন। এবার কোন দলের প্রতিনিধি হয়ে মনোনয়ন চান তা এখনো স্পষ্ট নয়। পাঁচবার যেহেতু দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন, সুতরাং আবার দলে ফিরবেন না, এমন কথাও বলা যায় না। আর কিশোরগঞ্জন্ড২ন্ডএর সাবেক সংসদ সদস্য তিনি। ফলে তার এলাকায় প্রভাব রয়েছে। তবে তারেক রহমানকে ‘বেয়াদব’ বলে তৃতীয়বার বহিষ্কৃত হন। আর চতুর্থবার বহিষ্কৃত হন দলীয় জ্যেষ্ঠ নেতাদের সমালোচনা করে। সর্বশেষ তাকে বহিষ্কার করা হয় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনে দলীয় নেতাদের ব্যর্থতার বিষয়টি সামনে এনে।

এদিকে এ আসন থেকে নৌকার প্রার্থী হতে ১১ জন মনোনয়ন ফরম কিনেছেন বলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন। তারা হলেন বর্তমান সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ, সাবেক সংসদ সদস্য ও পাকুন্দিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক সোহরাব উদ্দিন, কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ আফজল, পাকুন্দিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রেণু, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মোখলেছুর রহমান, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি বা উপমহাপুলিশ পরিদর্শক আবদুল কাহার আকন্দ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক দীন মোহাম্মদ নূরুল হক, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান এ কে এম দেলোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তানিয়া সুলতানা, শিল্পপতি মো. মকবুল হোসেন ও মাহবুবুল হক।

বগুড়ার তিন আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হচ্ছেন বিএনপির সাবেক তিন নেতা : আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে নির্বাচন কমিশন থেকে মনোনয়নপত্র নিয়েছেন বগুড়ার বিএনপির সাবেক তিন নেতা। তারা হলেন বগুড়ান্ড১ (সারিয়াকান্দিন্ডসোনাতলা) আসন থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য ও আলোচিত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শোকরানা, বগুড়ান্ড৭ (গাবতলীন্ডশাজাহানপুর) আসন থেকে সদর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও শাজাহানপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সরকার বাদল এবং বগুড়ান্ড২ (শিবগঞ্জ) আসনে জেলা বিএনপির সাবেক মহিলাবিষয়ক সম্পাদক ও শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বিউটি বেগম। তাদের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে বগুড়ান্ড১ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছিলেন মোহাম্মদ শোকরানা। ২০১৯ সালের ৯ অক্টোবর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণে দলের সব পদ থেকে পদত্যাগ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই নেতা।

আরও জানা যায়, যুবলীগের প্রতিষ্ঠাকালে বগুড়ার নেতৃত্বে ছিলেন শোকরানা। ১৯৯৯ সালে তারেক রহমানের হাতে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যসহ জেলা বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বহুল আলোচিত ডাল কেলেঙ্কারি ও ত্রাণের কম্বল মজুদ করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। একই বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি যৌথবাহিনী শোকরানার ১৫টি গুদাম থেকে সাড়ে ৫ হাজার টন (১৮ হাজার বস্তা) মসুর ডাল ও বিপুল পরিমাণ ত্রাণের কম্বল জব্দ করে। ওই সময় তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়। সেই মামলাটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলাটির বিচারকাজ শুরু হলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালের ২১ নভেম্বর সেই মামলা প্রত্যাহার করা হয়।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে শোকরানা বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কারচুপি করবে না। কারণ, বিএনপি যেহেতু নির্বাচনে আসছে না। ভোটগ্রহণ স্বচ্ছ হবে। তবে বিএনপি নির্বাচনে এলে কারচুপি হতে পারে বলে এবং তখন বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইব।’

এদিকে বগুড়ান্ড৭ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী সরকার বাদল নব্বইয়ের দশকে বিএনপিতে যোগ দেন ও ২০০৩ সালে তিনি সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি হন। পরে সদর উপজেলার কিছু অংশ নিয়ে শাজাহানপুর উপজেলা গঠিত হলে ২০১৪ সালে বিএনপির সমর্থনে শাজাহানপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে বগুড়ান্ড৭ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়ে পাননি। সর্বশেষ ২০২২ সালে বগুড়ান্ড৬ (সদর) আসনের উপনির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তিনি স্বতন্ত্র নির্বাচন করেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে সরকার বাদল বলেন, ‘সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করলেও কিছু নেতার কারণে তিনি দলে কোণঠাসা। কোনো দলের হয়ে নয় বরং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

এদিকে বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক মহিলাবিষয়ক সম্পাদক বিউটি বেগম বগুড়ান্ড২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ২০১৪ সালে দলের সমর্থনে তিনি শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হন। ফলে ২০১৯ সালের ৩ মার্চ তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়।

নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে বিউটি বেগম বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই জাতীয় নির্বাচনে ভোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অনেক দল থেকেই যোগাযোগ করা হচ্ছে, দেখা যাক, সময়ই বলে দেবে।

এ বিষয়ে জেলা বিএনপি সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও নির্বাচনের তফসিল বাতিলের দাবিতে এক দফার আন্দোলন চলছে। তাই ঘোষিত নির্বাচন তফসিলের বিরুদ্ধে ও বর্তমান সরকারের অধীন কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না বিএনপি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যারা মনোনয়নপত্র তুলেছেন বা তুলবেন, তারা দলের কেউ নন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই দলীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত