ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখনই শক্তিশালী ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সামনের বছরগুলোতে রোগটি আরও বড় আকারে আসার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, কোনো দেশে ডেঙ্গু শুরু হলে শেষ হয়ে যায় না। একে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কিন্তু দেশে রোগটি নিয়ন্ত্রণে জরুরি সমন্বিত উদ্যোগ ও জনসম্পৃক্ততা নেই।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিন (নিপসম) মিলনায়তনে বাংলাদেশ এপিডেমিওলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এমন আশঙ্কার কথা প্রকাশ করা হয়।
বৈঠকে নিপসম পরিচালক ও এপিডেমিওলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, কভিড নিয়ন্ত্রণের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ডেঙ্গু আমাদের জন্য জাতীয় সমস্যা। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে নেতৃত্ব দেওয়া না হলে সব মন্ত্রণালয়কে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করাটা কঠিন হবে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বেশি উদ্বেগ গ্রাম নিয়ে। সেখানে কী হবে, সেটাই চিন্তার বিষয়। কারণ সিটি করপোরেশন এলাকায় অনেক সচেতনতামূলক কাজ করা হয়েছে। শহরাঞ্চলের এডিস ইজিপ্টি মশা নিয়ে অনেক আলোচনা থাকলেও এডিস অ্যালবোপিকটাস নিয়ে কেউ ভাবছেই না। অথচ ধান গাছ, কলাগাছের পাতা, গাছের কোটর এমনকি কচু গাছের পাতায়ও এডিস অ্যালবোপিকটাসের লার্ভা হয়।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) এই সাবেক পরিচালক ও রোগতত্ত্ববিদ আরও বলেন, কোনো রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাই সব নয়। আগে এডিস মশা এবং ডেঙ্গুরোগী শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যাও কম ছিল। এখন সারা বাংলাদেশে ১৭ কোটি মানুষই সন্দেহজনক।
এই বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। সুতরাং সতর্কবাণী হিসেবে রোগতত্ত্বের মানুষ হিসেবে এই ফোরাম বলতে চায় এটা (ডেঙ্গুর প্রকোপ) বড় আকারে আসার আশঙ্কা রয়েছে যদি না আমরা এখনই শক্তিশালী, সমন্বিত পদক্ষেপ নেই। রোগতত্ত্ববিদদের এই সংগঠন সরকারকে যেকোনো প্রয়োজনে সহায়তা করতে তৈরি। ডেঙ্গুর জন্য আমরা একটা পরামর্শক কমিটি দেখিনি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এপিওডেমিলজি অ্যাসোসিয়েশন তৈরি, জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিতে বৈজ্ঞানিক তথ্য, তত্ত্ব, বিশ্লেষণ-যেকোনো ধরনের তথ্য দিতে আমরা তৈরি আছি।
বৈঠকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, ২০০০ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত গত ২৩ বছরে ডেঙ্গুতে যত আক্রান্ত হয়েছে, এবার এই নভেম্বরের মধ্যে তার চেয়ে সোয়া গুণ রোগী বেশি ও প্রায় দ্বিগুণ বেশি মৃত্যু হয়েছে। এবার আক্রান্ত রোগীদের ৬০ শতাংশ পুরুষ। কিন্তু ডেঙ্গুতে মারা গেছে ৫৮ শতাংশ নারী। এবার আক্রান্তদের ৬২ শতাংশের বেশি বয়স ৩০ বছরের নিচে। কিন্তু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃতদের ৬৪ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের বেশি।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে ডেঙ্গু বিস্তারের সম্পর্ক তুলে ধরে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ২০০০-২০১০ সালে দেশে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১১-২০২২ সাল পর্যন্ত গড় তাপমাত্রা ২৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এক দশকে তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি ডেঙ্গুরোগ সৃষ্টিকারী এডিস মশার বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখে।
এবার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা কম বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পরামর্শক ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এসএম আলমগীর। তিনি বলেন, রোগটি নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত কোনো টাস্কফোর্স হয়নি। একটি জরুরি সভা হয়নি। কোনো দেশে ডেঙ্গু শুরু হলে এটি শেষ হয়ে যায় না। তবে একে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আমাদের দেশে নিয়ন্ত্রণে জরুরি সমন্বিত উদ্যোগ ও জনসম্পৃক্ততা নেই। সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে তেমন করে সহযোগিতাও চাওয়া হয়নি। উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে আমরা সহযোগিতা করতে সব সময় প্রস্তুত।
বৈঠকে আইসিডিডিআরবির গবেষক ডা. শফিউল আলম বলেন, ‘ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে হলে এই রোগের জীবাণুবাহী মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে হবে। মশা নিধনে লার্ভিসাইডিং ভালো কাজে আসবে। তবে দীর্ঘদিন একই কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে ফেলে। ফলে জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিটিআই ভালো সমাধান।’
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নানা স্তরের উদ্যোগ দরকার। এটা শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের একার কাজ নয়। এটা এখন সারা বছরের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাই এর নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও বহুমাত্রিক পদক্ষেপ দরকার।
বৈঠকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ডা. মো. আখতারুজ্জামান, অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরীসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন।
