এসএসসি ও এইচএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার খাতা নিজস্ব কারখানায় কড়া নিরাপত্তার মাধ্যমে ছাপানোর নিয়ম। অথচ কোনো ধরনের নিরাপত্তা ছাড়াই রাজধানীর সূত্রাপুরে যত্রতত্র ছাপা হচ্ছে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পাবলিক পরীক্ষার খাতা। ফলে তা অসাধু চক্রের হাতে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জানা যায়, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের ২০২৪ সালের এসএসসি ও এইচএসসির খাতা ছাপানোর কাজ পায় এশিয়া বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েটস। ৬ কোটি ৭৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকায় গত সেপ্টেম্বরে তারা ওএমআরসহ ৩০ লাখ খাতা ছাপানোর কাজ পায়। দরপত্রের শর্তে নিজস্ব কারখানায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে এ খাতা ছাপানোর কথা বলা হয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটি কাজ পাওয়ার পরই তা সাব-কন্ট্রাক্টে দিয়ে দেয়, যা দরপত্রের পুরোপুরি লঙ্ঘন। ওই সাব-কন্ট্রাক্টররা রাজধানীর বিভিন্ন প্রেসে উন্মুক্ত অবস্থায় পাবলিক পরীক্ষার এ খাতা ছাপানোর কাজ করছে।
সম্প্রতি এ সংক্রান্ত অভিযোগ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর জমা পড়ে। সেখানে বলা হয়, কুমিল্লা বোর্ডের ২০২৪ সালের পাবলিক পরীক্ষার খাতা ছাপানোর কাজ পেয়েছে এশিয়া বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েটস। কাজ সম্পাদনের পূর্বশর্তে বলা হয়েছে, নিজস্ব সিকিউরিটি ব্যবস্থায় ও নিজস্ব কারখানায় এসব খাতা ছাপানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অথচ সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে রাজধানীর সূত্রাপুরের আফতাব আর্ট প্রেসসহ একাধিক প্রেসে এ খাতা ছাপানোর কাজ চলছে। খোলাবাজারে উৎপাদনের কারণে অসাধু লোকজনের হাতে এ খাতা চলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। বর্তমান সরকারকে বিব্রত ও হেয়প্রতিপন্ন করতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এহেন কাজ করা হচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার সূত্রাপুরের আফতাব আর্ট প্রেসে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট একটি প্রেসে উন্মুক্তভাবে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের খাতা ছাপানো হচ্ছে। সেখানে কোনো ধরনের নিরাপত্তার বালাই নেই। রাস্তার পাসের এ প্রেসে লোকজন ঢুকছে, বের হচ্ছে। গতকাল দুপুরে ‘মেঘনা’ সেটের খাতার কাজ চলছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিককে প্রেসে পাওয়া যায়নি। কর্মচারীরা জানান, সোহেল নামের একজন খাতা ছাপানোর কাজ এ প্রেসে দিয়েছেন। এই প্রেস এশিয়া বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েটসের নয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, কুমিল্লার চেয়ারম্যান অধ্যাপক জামাল নাসের বলেন, ‘পরীক্ষার খাতা সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। নিজে কাজ করবে এমন শর্ত দিয়েই টেন্ডার দেওয়া হয়। অন্য কোথাও সাব-কন্ট্রাক্ট দিয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কুমিল্লা বোর্ড চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘আমরা তাদের কারখানা পরিদর্শন করে সমক্ষতা থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছি। তার প্রেসে কাজ বেশি থাকলে অন্য কাজ বাইরে দিতে পারত। এই খাতার কাজ কোনোভাবেই বাইরে দেওয়া যাবে না।’
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, পরীক্ষার উত্তরপত্রের ওএমআর সিট খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তাই এই খাতা যেন বাইরে না যায় তা নিশ্চিত করাটা খুবই জরুরি। এশিয়া বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েটসের ঢাকায় ভিন্ন প্রেসে কাজ চলছে বলে বোর্ডেও অভিযোগ জমা পড়েছে। বিষয়টি ইতিমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি খাতার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে কি না, তা যাচাই করাটা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
জানতে চাইলে এশিয়া বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েটসের স্বত্বাধিকারী আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সূত্রাপুরে যে প্রেসে কাজ চলছে সেটাও আমাদের। আমরা কোনো সাব-কন্ট্রাক্ট দিইনি। আর খাতা যেকোনো প্রেসে ছাপলে সমস্যা খোলাবাজারে ছাপা হচ্ছে পরীক্ষার খাতা কী? এটা দিয়ে ঠোঙা বানালেও সমস্যা কী? মূল হচ্ছে ওএমআর শিট, সেটা আমরা নিমতলীর নিজস্ব প্রেসে করছি। আপনারা নিমতলীর প্রেসে আসেন, দেখে যান।’
আবদুল মান্নানের কাছে নিমতলীর প্রেসের ঠিকানা চাইলে তিনি অন্য প্রসঙ্গে চলে যান। আবারও ঠিকানা চাইলে তিনি বলেন, ‘কুমিল্লা বোর্ডের লিখিত অনুমতি ছাড়া তো আপনাকে প্রেসে নিতে পারব না।’
অন্য একটি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করে বলেন, পরীক্ষার খাতা উৎপাদনের কাজ সাব-কন্ট্রাক্টে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এতে বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে। এমনকি ফল জালিয়াতিরও সুযোগ রয়েছে। আমরা সরেজমিন পরিদর্শনের পর সক্ষমতার প্রমাণ না পেলে অনেক সময়ই সর্বনিম্ন দরদাতাকেও কাজ দিই না। প্রয়োজনে দ্বিতীয় বা তৃতীয় দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়। কারণ এখানে নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে। যদি সাব-কন্ট্রাক্ট বা খোলাবাজারে কাজ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানকে ব্ল্যাকলিস্টের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট বাতিলেরও সুযোগ রয়েছে বোর্ডের।
