বিশ্বের অনেকের চোখ-কান আটকা পড়ে ভারতের একটি সুড়ঙ্গের খবরে। টানা ১৭ দিন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন তারা। ৪১ শ্রমিককে নিরাপদে, অক্ষত অবস্থায় উদ্ধারে হাতুড়ি-শাবল-গাঁইতি থেকে শুরু করে বড় ধরনের অগার মেশিন পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়। উদ্ধার তৎপরতায় যুক্ত হন বিশেষজ্ঞরা। শ্রমিকদের উদ্ধারে দক্ষযজ্ঞ লেগে যায়। অবশেষ সফল হয় সবাই। বদ্ধ টানেল থেকে মুক্ত আকাশে ফিরে আসেন শ্রমিকরা।
‘প্রাণ বাঁচানো সবচেয়ে ভালো কাজ’
ভারতের উত্তর কাশীর সিল্কিয়ারা সুড়ঙ্গ দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। সেখানে সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সুড়ঙ্গ খোঁড়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। সেই সুড়ঙ্গে কাজ করার সময় বিপর্যয় নেমে আসে গত ১২ নভেম্বর। ধস নেমে সুড়ঙ্গের ভেতর আটকা পড়েন ৪১ শ্রমিক। প্রায় ৬০ মিটার ধ্বংসস্তূপের পেছনে আটকে পড়েন তারা।
শ্রমিকরা সুড়ঙ্গে আটকা পড়ার পরপরই উদ্ধারকাজে নামে ভারতের বিভিন্ন সংস্থা। বিদেশ থেকে আনা হয় যন্ত্র। এ ধরনের বিপর্যয়ে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা বিশেষজ্ঞরাও যুক্ত হন। বিশ্বের নজর ঘুরে গিয়েছিল হিমালয়ের পাদদেশের এই এলাকায়।
সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, শ্রমিকদের পরিণতি কী হয় তা নিয়ে আশা-নিরাশার দোলাচলে বিশ্ববাসীর কাছে বিরাট দুঃসংবাদ হয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা অগার ড্রিলিং মেশিনের অকার্যকর হয়ে পড়ার খবর। আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধার করতে প্রথম ১৬ দিন একাধিক উপায় নেওয়া হয়। প্রথমে সুড়ঙ্গের ভেতরে জমে থাকা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে, তারপর বড় বড় মাটি কাটার যন্ত্র নিয়ে এসে চেষ্টা হয়েছিল শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর।
বড়মাপের যে যন্ত্রটি দিয়ে ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে একটা বড় পাইপ গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল, তার ব্লেড একেবারে শেষ অংশে এসে ভেঙে যায়। তখন আরও প্রায় ৬০ মিটারের মতো ধ্বংসস্তূপ পার হয়ে তবেই শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হতো।
এর আগে যন্ত্র দিয়ে মাটি কাটার সময়ে কম্পনের কারণে বেশ কয়েকবার নতুন করে ধস নামে সুড়ঙ্গের ভেতরেই। ওই ব্লেড আর কোনোভাবে সারানো সম্ভব হয়নি, এটা নিশ্চিত হওয়ার পর ডাক পড়ে একদল শ্রমিকের, যারা কোদাল-বেলচার মতো যন্ত্র দিয়ে হাতে মাটি কেটে সুড়ঙ্গ তৈরি করে।
এ ধরনের সুড়ঙ্গকে বলে ‘র্যাট হোল’। আর এ কাজ যারা করেন, তাদের ‘র্যাট হোল মাইনার’ বলা হয়। র্যাট হোল অর্থাৎ ইঁদুর যেভাবে গর্ত খোঁড়ে।
যে ১২ জন খনিশ্রমিক উত্তর কাশীর সুড়ঙ্গে ‘ইঁদুর-গর্ত’ খুঁড়েছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম মুন্না। উদ্ধারকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি সংবাদমাধ্যমে ভাগ করে নিয়েছেন অনন্য অভিজ্ঞতা।
এক সাক্ষাৎকারে মুন্না বলেন, ‘মানুষের প্রাণ বাঁচানো জীবনের সবচেয়ে ভালো কাজ। ৪১ জনকে বাঁচাতে গিয়ে তাদের একজন যদি মরেও যায়, সেটা কোনো বড় বিষয় নয়। কারণ ওই ৪১ জীবনের ওপর আরও অনেকগুলো জীবন নির্ভর করে আছে।’
তিনি আরও বলেন, আমাদের বলা হয়েছিল ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। আমরা ঠিক ২৬ ঘণ্টার মাথায় শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাই। সোমবার সারারাত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আরও গভীরে ঢুকি। শেষমেশ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আমিই প্রথম ওদের কাছে পৌঁছাই। ওরা যে কী আনন্দিত হয়েছিল আমাকে দেখে। ওদের কাছে থাকা একটা চকলেট দিয়েছিল। জানতে চাইছিল যে আমি কী চাই? আমি বলেছিলাম, আপনাদের সুস্থ অবস্থায় বের করে নিতে চাই শুধু।
যেভাবে সুড়ঙ্গযাপন
উদ্ধার হওয়া শ্রমিকরা জানান, সুড়ঙ্গের ভেতরে বিশেষ কোনো সমস্যা হয়নি তাদের। কারণ ভারত সরকার তাদের প্রয়োজনমতো সামগ্রী পাঠিয়েছে। তাদের একজন নেগি বলেন, একটা কঠিন সময়ে সবাই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছে, তার নির্দেশ মতো চলেছে আর কেউ ভেঙে পড়েনি।
উদ্ধার হওয়া এক শ্রমিক শাবাব আহমেদ বলেছেন, আমরা সবাই একসঙ্গে খাওয়া-থাকা করেছি এই কদিন। রাতের খাওয়ার পরে একটু হাঁটাহাঁটি করতাম আমরা। সুড়ঙ্গের ভেতরে তো আড়াই কিলোমিটার জায়গা ছিল, তাই দমবন্ধ লাগেনি আমাদের। আমরা ভেতরে শুধু খাওয়াদাওয়া করছি, মর্নিং ওয়াক আর যোগব্যায়ামও করতাম আমরা।
আবার সুড়ঙ্গ মুখ থেকে উদ্ধারকারী দলের নির্দেশও পালন করতেন শ্রমিকরা। অক্সিজেন পাঠানোর পাইপটি ঠিকমতো লাগানোর সময়ে হোক বা খাবার, পানি, ওষুধ বা অন্যান্য সামগ্রী যা পাঠানো হচ্ছিল আরেকটি পাইপ দিয়ে, সেসব হিসাব করে জমিয়ে রাখা সবই করেছেন ভেতরে আটকে থাকা শ্রমিকরা।
ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা সুবোধ কুমার ভার্মা সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেন, প্রথম ২৪ ঘণ্টা কিছুটা ভয়ে পেয়েছিলাম আমরা। কিন্তু তারপর বাইরে থেকে কাজু-কিশমিশ আর জল পাঠানো শুরু হলো, অক্সিজেন আসতে লাগল। দিন-দশেক পরে ভাত, ডাল, রুটি পেতে থাকি আমরা। গোড়ার দিকে না হলেও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কথা বলার পর মনোবল আরও কিছুটা বেড়ে গিয়েছিল শ্রমিকদের।
উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা শ্রমিক অখিলেশ বলেন, প্রথমে মোবাইলের চার্জ জমিয়ে রাখার জন্য তারা শুধু সময় দেখার জন্য ফোন ব্যবহার করতেন। কিন্তু পরে তাদের মোবাইল চার্জারও পাঠানো হয়। তারপর তারা মোবাইলে গেমও খেলতেন। এতে তাদের কিছুটা মনোরঞ্জন হতো।
থাইল্যান্ডের গুহায়
বিশ্বে সুড়ঙ্গ ধসের আরও অনেক ঘটনা আছে। যেগুলোতে নিমর্ম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। যেমন ২০০০ সালে অস্ট্রেলিয়ার একটি টানেলে ১৫৫ জনের মৃত্যু হয়। যারা পুরোপুরি দগ্ধ হয়। পরের বছর ২০০১ সালে সুইজারল্যান্ডের একটি টানেলেও দুর্ঘটনা ঘটে। সেখানে কয়েকজনের মৃত্যু হয়। তবে কাছাকাছি সময়ে সবচেয়ে আলোচিত আটকে পড়ার ঘটনাটি হলো থাইল্যান্ডের গুহায় একদল ফুটবল খেলোয়াড়ের আটকে পড়া।
সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, ২০১৮ সালে থাইল্যান্ডে গুহায় বেড়াতে গিয়ে নিখোঁজ হয় ১২ খুদে ফুটবলার ও তাদের কোচ। পরে জানা যায়, তারা গুহায় আটকা পড়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তের কাছে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ থাম লুয়াং গুহা থাইল্যান্ডের দীর্ঘতম গুহা। কম চওড়া আর অনেক প্রকোষ্ঠ থাকায় গুহার ভেতরে চলাচল করা কঠিন ছিল। ওই গুহায় ঢোকার পর ওই বছরের ২৩ জুন নিখোঁজ হয় ১২ খুদে ফুটবলার ও তাদের কোচ। খুদে ফুটবলারদের বয়স ১১ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। আর তাদের সহকারী কোচ এক্কাপোল জানথাওংয়ের বয়স ২৫ বছর। তারা মু পা নামের একটি ফুটবল দলের সদস্য। নয় দিন সেখানে আটকে থাকার পর ২ জুলাই ব্রিটিশ ডুবুরি রিচার্ড স্ট্যানটন ও জন ভলানথেন তাদের সন্ধান পান। পর্যায়ক্রমে ১০ জুলাই তাদের উদ্ধার করা হয়।
গাঢ় অন্ধকারে হেঁটে, কাদা মাড়িয়ে, কখনো চড়াইয়ে উঠে, আবার কখনো পানির নিচ দিয়ে সাঁতরে ওই কিশোরদের বের করে আনা হয়। উদ্ধারের প্রয়োজনে বাইরে থেকে ওই ফুটবল দলের অবস্থানস্থল পর্যন্ত দড়ি বাঁধা হয়। উদ্ধারের সময় প্রত্যেক কিশোরকে অক্সিজেন মাস্ক পরানো হয়, দড়ি দিয়ে বাঁধা হয় সামনে থাকা ডুবুরির সঙ্গে। একজন গুহায় বাঁধা দড়ি এবং অক্সিজেনের বোতল নিয়ে যান খুদে ফুটবলারদের কাছে। কোনো সমস্যা হলে সহায়তার জন্য তাদের পেছনে ছিলেন আরেকজন ডুবুরি। গুহার সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাটি ‘টি-জংশন’ নামে পরিচিত। এই এলাকা এতটাই সংকীর্ণ যে, এখানে ডুবুরিদের অক্সিজেন ট্যাংকও খুলে ফেলতে হয়। এই এলাকার আগে ‘চেম্বার-থ্রি’ নামের প্রকোষ্ঠে বেস ক্যাম্প বানানো হয়। সর্বশেষ ধাপটি অতিক্রমের আগে এখানে কিছু সময় বিশ্রামের ব্যবস্থা রাখা হয়।
যেভাবে বেঁচে ছিল তারা
খবরে জানা যায়, তাদেরই একজনের জন্মদিন উপলক্ষে পার্টি করতে তারা গুহার ভেতরে যায়। কিন্তু পরে প্রবল বৃষ্টির কারণে গুহার ভেতরে পানি ঢুকতে শুরু করলে তারা আশ্রয়ের জন্য অনেক গভীরে চলে যায়। জন্মদিন উপলক্ষে তারা খাবার কিনে নিয়ে গিয়েছিল। গুহার ভেতর আটকা পড়ার পর সেসব খেয়ে বেঁচেছিল। তবে ফুটবলারদের কোচ অন্যদের ভাগে কম পড়বে বিবেচনায় কিছু খেতে রাজি হননি। তাদের সন্ধান পাওয়ার পর বাইরে থেকে খাবার দেওয়া শুরু হয়। যার মধ্যে ছিল সহজে হজম হয় এ রকম খাবার, শক্তিদায়ক মিনারেল ও ভিটামিন মেশানো খাবার।
যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় গুহা উদ্ধার কমিশনের সমন্বয়কারী আনমার মির্জা বলেন, বেশিরভাগ গুহাই প্রাকৃতিকভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারার জন্য উপযুক্ত। গুহার ভেতরে বাতাস ঢুকতে ও বের হতে পারে। গুহার যেসব জায়গায় লোকজন যেতে পারে না সেখানেও বাতাস প্রবাহিত হয়।
কিন্তু তারপরও যত দিন গড়িয়েছে বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা তত কমে গেছে। বলা হচ্ছে, কিশোররা যেখানে আশ্রয় নিয়েছিল, সেখানে অক্সিজেনের স্বাভাবিক মাত্রা হওয়ার কথা ছিল ২১ শতাংশ। কিন্তু সেটা নেমে গিয়েছিল ১৫ শতাংশে। পরে তাদের কাছে অক্সিজেন পৌঁছে দিয়েছিল ডুবুরিরা। থাই নেভির সাবেক একজন ডুবুরি গুহার গভীরে অক্সিজেনের বোতল সরবরাহ করে ফেরার পথে নিজেই অক্সিজেনের অভাবে মারা যান।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, কিশোরদের শান্ত রাখতে একটা বড় ভূমিকা ছিল তাদের কোচের। মানসিক চাপ মোকাবিলায় তিনি তাদের মেডিটেশন করিয়েছেন গুহার ভেতরে। ফুটবল কোচ হওয়ার আগে তিনি ছিলেন একজন বৌদ্ধভিক্ষু। একই সঙ্গে গুহার বাতাস যাতে বেশি ব্যবহার করা না হয়ে যায় সে বিষয়েও সচেতন ছিলেন তিনি।
ওই উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া ব্রিটিশ গুহা বিশেষজ্ঞ ভের্ন আন্সওয়ার্থ বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘আমার জন্য এখনো এই জায়গাটি বেশ আবেগের। অনেকে মনে করেন, ১৩ জনের সবাইকে জীবিত উদ্ধার করে আনতে পারাটা অলৌকিক একটা ব্যাপার। আমার ধারণা, সারা পৃথিবীর মানুষ একটি খারাপ ফলাফলের ধারণা করছিল। কিন্তু আমরা কখনো হাল ছাড়িনি। ডুবুরিরা যা করেছেন, তা হচ্ছে অসাধারণ ধৈর্য আর অবিশ্বাস্য কৃতিত্ব।
তিনি বলছেন, পুরো ঘটনার জন্য ওই কিশোর বা তাদের কোচকে কেউ দোষ দেয়নি, আসলে তাদের ভাগ্যটাই খারাপ ছিল।
