‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ বিক্রিয়া সংশ্লিষ্টদের কাছে বেশ পরিচিত যার মাধ্যমে সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শক্তি উৎপাদন হচ্ছে। তবে ‘নিউক্লিয়ার ফিউশন’ তথা ‘পরমাণুর ফিউশন’ অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত, যা নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে গবেষণা চলছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি দেশে। এবার জাপান এই প্রযুক্তি গবেষণার চুল্লির জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় রিঅ্যাক্টর তৈরি করেছে।
জাপানের নাকা অঞ্চলে বিশ্বে বৃহত্তম ফিউশন রিঅ্যাক্টরটি স্থাপন করা হয়েছে। চুল্লিটির সম্পর্কে বিশদ বিবরণের আগে ফিশন এবং ফিউশনের পার্থক্য উপস্থাপন জরুরি। ফিশনে পরমাণুর একটি নিউক্লিয়াস ভেঙে বিভক্ত হওয়ার সময় বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপাদন হয় এবং প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে শিকলের মতো করে যাকে থামানো দুরূহ। সারা বিশ্বে শান্তিপূর্ণ ও সামরিক উদ্দেশ্যে যত কর্মকান্ড চলে তার ভিত্তি হচ্ছে ফিশন। অন্যদিকে ফিউশন হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার সাহায্যে অতি-উচ্চ তাপমাত্রায় ছোট ছোট নিউক্লিয়াসকে একত্র করে বড় নিউক্লিয়াসে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করা হয়। এই প্রক্রিয়া চলার সময় ফিশনের মতোই ব্যাপক শক্তি উৎপাদন হয়। তবে এই প্রক্রিয়ার সুবিধা হচ্ছে, ফিশন প্রক্রিয়া ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ফিউশন নিরাপদ। আবার ফিশনে বর্জ্য উৎপাদিত হয়, ফিউশনে হয় না। ফিশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ঠিকঠাক না হলে তা বিপদের কারণ, অথচ ফিউশনে বর্জ্য উৎপাদিত হয় না। আবার ফিউশন প্রক্রিয়ায় শক্তির পরিমাণও বিপুল হওয়ারই কথা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফিউশন বিক্রিয়ার সফল ব্যবহার বর্তমান বিশ্বের জলবায়ু সংকটের অন্যতম বড় এক সমাধান হতে পারে।
জাপানের স্থাপন করা রিঅ্যাক্টরটির নাম হচ্ছে ‘জেটি-৬০এসএ’। রাজধানী টোকিওর দক্ষিণে নাকা এলাকায় ছয়তলা ভবনের সমান এই যন্ত্র। ফিউশন গবেষণাকর্মে ব্যবহৃত এই ‘টোকামাক’ ব্যবস্থাটি দেখতে বিশালাকৃতির গোলাকার চৌবাচ্চার মতো। এ ব্যবস্থায় ‘প্লাজমাকে’ ২০ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, প্লাজমা হচ্ছে পদার্থের কঠিন, তরল আর বায়বীয় পরিস্থিতির পরের চতুর্থ একটি অবস্থা, যা অতি উচ্চ তাপমাত্রায় পাওয়া যায়। ফিউশন বিক্রিয়ায় এটি অত্যাবশ্যকীয় পদক্ষেপ।
প্রকল্পটির উপপ্রধান স্যাম ডেভিস বলেন, এই রিঅ্যাক্টরের মাধ্যমে আমরা ফিউশন প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদনের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারব।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে জাপান এ প্রকল্পটি শুরু করেছে। ফিউশন গবেষণা প্রসারে ফ্রান্সভিত্তিক ‘আন্তর্জাতিক থার্মোনিউক্লিয়ার গবেষণামূলক রিঅ্যাক্টর (ইটার)’ উদ্যোগের জন্য একে অগ্রবর্তী কাজ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র এই গবেষণায় কিছুদিন আগে ‘বেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির’ খবর দিয়েছে। তবে জাপান ও ফ্রান্সের গবেষণাপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকা-ের কিছু তফাত রয়েছে।
ফ্রান্সের মতো জাপানে পরিচালিত ফিউশন গবেষণায় সেই প্রক্রিয়াই অনুসরণ করার চেষ্টা হচ্ছে, যা সূর্যে ঘটে থাকে। ফিউশন চুল্লির রিঅ্যাক্টরের লক্ষ্য হচ্ছে হাইড্রোজেন নিউক্লিয়াসকে যুক্ত করে অপেক্ষাকৃত ভারী হিলিয়ামে রূপান্তর করা, যার সাহায্যে তাপ কিংবা আলোরূপে বিপুল শক্তি নির্গমন করা সম্ভব হয়।
